প্রিন্ট এর তারিখঃ ২৮শে অক্টোবর, ২০২৬ইং; ০৭:০৯ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ইং; ০২:২৭ এম
সম্প্রতি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মুহুর্মুহু আক্রমণে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সৌদি সমর্থিত জোট কোণঠাসা হয়ে পড়েছে, শুধু তারাই নয়, সৌদি আরব নিজেও ভয়ংকর ভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে হুতিদের হামলায়। এমন প্রেক্ষাপটে ইয়েমেনের হুতি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড সামরিক শক্তি দিয়ে লড়াই করতে এবং হামলা করতে সৌদি আরবের সমর্থনে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি, এবং গ্রিস অন্যদিকে মক্কা জোটের সমর্থনে দুই মুসলিম শক্তিধর রাষ্ট্র পাকিস্তান ও তুরস্ক এবং মিশর ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম নামধারী রাষ্ট্র আরব আমিরাত ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও লজিকস্টিক সাপোর্ট নিয়ে সৌদি আরবের নয়টি রাষ্ট্রের যৌথ জোটের হামলা হতে যাচ্ছে হুতিদের বিরুদ্ধে। অথচ যেখানে এর আগে ২০১৪ সালে হুতিদের বিরুদ্ধে বা ইয়েমেনিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব নাক গলানো শুরু করলে একক শক্তিতে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে না পারায় সৌদি আরব ৩০ টি রাষ্ট্র মিলে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেও ব্যর্থ হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হামলা করতে এসেও যুদ্ধ করে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছে।
এখানে মনে রাখা উচিত কেন বার বার তাদের বিরুদ্ধে বড় বড় পরাশক্তি যুদ্ধ করে ব্যর্থ হচ্ছে? শুধু যুদ্ধের ড্রোন ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ এয়ার ডিফেন্স কিংবা সর্বাধুনিক ফাইটার জেট দিয়ে কোন একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোন একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জয়লাভ করা যায় না যদি যেত তাহলে ইরান এতদিনে ধ্বংস হয়ে যেত। কিন্তু হুতিদের তো ইরানের মত সামরিক শক্তি নেই তারপরও কেন তারা বারবার যুদ্ধে টিকে আছে? এখানেই আসে যুদ্ধের সামরিক হিসাব নয় হিসাবটি অন্য স্থানে আর তা হচ্ছে ধর্মতত্ত্ব বা হুতিদের বিশ্বাস এবং ইসলাম ধর্মের প্রতি এবং আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ভরসা করে তাদের সেই সময়ের মতো, যে সময়ে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ নবী হিসেবে প্রায় ৬৪ টি যুদ্ধ করেছিলেন যেগুলো ছিল অসম যুদ্ধ যার ২৭ টি তিনি নিজে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ওই সব অসম যুদ্ধেও অল্পসংখ্যক সাহাবী এবং অল্প সংখ্যক যুদ্ধাস্ত্র নিয়েও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিংবা তার পাঠানো সেনাপতিরা যুদ্ধে জয় লাভ করে ফিরে আসতো, তেমন বিশ্বাস নিয়ে তারা যুদ্ধ করছে যাদের প্রতি আবার ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করে গেছেন এই ইয়েমেন ও শামবাসীদের জন্য যা সহীহ বুখারী, তিরমিজি শরীফ এর কয়েকটি হাদিস বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে এবং রেওয়ায়াতকারীরা অত্যন্ত শক্তিশালী যেমন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এবং আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকেই হাদিস গুলো বর্ণিত।
ইয়েমেনের পাহাড়ে শুধু অস্ত্রের শক্তি নয়, ইতিহাস, বিশ্বাস ও প্রতিরোধেরও পরীক্ষা চলছে। কিন্তু মহানবী (সা.)-এর দোয়াকে সামরিক অপরাজেয়তার নিশ্চয়তা মনে করার আগে বুঝতে হবে, এই যুদ্ধের প্রকৃত শক্তি কোথায়।
বিশ্বের পরাশক্তিগুলো যখন নিজেদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারে মত্ত, তখন আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়েমেন যেন এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে—আধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক আর সামরিক জোটই কি যুদ্ধের শেষ কথা? নাকি যুদ্ধের ময়দানে এমন কিছু উপাদানও কাজ করে, যা কেবল অস্ত্রের পাল্লা কিংবা বোমার বিধ্বংসী ক্ষমতা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না?
হুতিদের বিরুদ্ধে শুধু ৯টি দেশ নয়, গোটা বিশ্ব এক হলেও পারবে না—এমন বক্তব্যের পেছনে রয়েছে একটি গভীর বিশ্বাস: ইয়েমেনের জন্য মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) দোয়া করেছিলেন অথচ বর্তমান রিয়াদ বা সৌদি বাসীরা বারবার তখন "নাজদ" বা বর্তমান রিয়াদ তথা সৌদির জন্য দোয়া করতে বললেও রাসূল কিন্তু তা করেননি। তিনি উত্তরে বলেছিলেন যে, সেখান থেকে শয়তানের শিং বের হবে, সেখানে ফিতনা তৈরি হবে এবং ভূমিকম্প হবে।
এই বিশ্বাসের ধর্মীয় তাৎপর্যকে বুঝতে হবে ইতিহাস, বাস্তবতা ও বিবেকের আলোকে। কারণ কোনো জনগোষ্ঠীর জন্য নবীজির দোয়া থাকলেই তারা সামরিকভাবে কখনো পরাজিত হবে না—এমন নিশ্চয়তা আধুনিক যুদ্ধের যুদ্ধ বিশারদরা তুরি মেরে উড়িয়ে দিবেন। কিন্তু ইয়েমেনের মর্যাদা, ঐতিহাসিক পরিচয় এবং দেশটির মানুষের প্রতি নবীজির স্নেহের বিষয়টি নিঃসন্দেহে মুসলমানদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে যা আজও দীর্ঘকাল যুদ্ধের পরও হুতি বিদ্রোহীদেরকে টিকিয়ে রেখেছে।
ইয়েমেনের জন্য নবীজির দোয়া: বিশ্বাসের গভীরতা কোথায়?
সহীহ বুখারীর বর্ণিত একাধিক হাদিস ছাড়াও জামে আত-তিরমিজির ৩৯৫৩ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী (সা.) শাম ও ইয়েমেনের জন্য বরকতের দোয়া করেছিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় ইয়েমেনের মানুষের হৃদয় ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হওয়ার জন্যও তিনি দোয়া করেন। অর্থাৎ ইয়েমেনের সঙ্গে নবীজির সম্পর্ক কেবল ভৌগোলিক ছিল না; ইসলামের ইতিহাসে দেশটির একটি স্বতন্ত্র অবস্থানও রয়েছে।এই দোয়া ইয়েমেনের মানুষের কাছে আশার উৎস হতে পারে, মুসলমানদের কাছে হতে পারে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বিষয়। কিন্তু এখানেই একটি কথা গুরুত্বপূর্ণ —আল্লাহর কাছে বরকতের দোয়া আর কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামরিক শক্তির চিরস্থায়ী বিজয়ের নিশ্চয়তা এক বিষয় নয় বলেই বর্তমান অবিশ্বাসী যুদ্ধ বিশারদরা মনে করবেন।
ইসলামের ইতিহাসে বিশ্বাসীরা বহু কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন। সুতরাং ধর্মীয় আবেগকে বাস্তবতার বিকল্প না বানিয়ে ন্যায়, ধৈর্য, মানবিকতা ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করাই অধিক যুক্তিসংগত।
ইয়েমেন: এক দেশের ভেতর বহু যুদ্ধ
ইয়েমেনের সংকটকে শুধু সৌদি আরব বনাম হুতি হিসেবে দেখলে প্রকৃত চিত্র আড়ালেই থেকে যাবে। আরব বসন্ত যখন চলছিল তখন ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা সহ ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল গুলো প্রায় দখল করার পর দেশটিতে সৌদি সমর্থিত গ্রুপের কারণে রাজনৈতিক সংকট পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারকে সমর্থন দিয়ে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে আগ বাড়িয়ে হস্তক্ষেপ করে।
এরপর বছরের পর বছর বিমান হামলা, স্থলযুদ্ধ, অবরোধ, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিপর্যস্ত হয়েছে ইয়েমেন। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির ফলে সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান আসেনি।
হুতিরা দেশের উত্তরাঞ্চল ও রাজধানী সানাসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। অন্যদিকে সৌদি আরব সমর্থিত ইয়েমেনে বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও তার মিত্রদের প্রভাব রয়েছে দেশের সামান্য অংশে। দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ইরান-সৌদি আরবের ভূরাজনৈতিক হিসাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
অর্থাৎ ইয়েমেনের যুদ্ধ কেবল একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে পরাজিত করার সামরিক অভিযান নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতা, আঞ্চলিক আধিপত্য, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক বৈধতার বহুমাত্রিক সংঘাত।
সৌদি আরবের সঙ্গে নতুন সংঘাত: আগুন আবার জ্বলছে
২০২৬ সালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকাকালীন সৌদি আরবের উস্কানিতে ইয়েমেনের সংঘাত নতুন করে বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। অক্টোবরের প্রথমার্ধে প্রকাশিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে হুতিদের সঙ্গে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর লড়াই তীব্র হওয়া, সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং পাল্টা বিমান হামলার খবর উঠে এসেছে।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির ৫ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি থেকে হুতি-সৌদি সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়েছে। লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই বেড়েছে। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় বাব আল-মান্দেব প্রণালি—যার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ চলাচল করে যা হুথি যোদ্ধারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
৯ অক্টোবর জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূতও নিরাপত্তা পরিষদকে জানান, দেশটি আবার ব্যাপক সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং একাধিক যুদ্ধফ্রন্টে লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হুতিদের হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা ও পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করেছে সৌদি আরবের বর্তমান পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যাতে মুহাম্মদ বিন সালমান এখন বাঙ্কারে বাঙ্কারে লুকিয়ে বেড়াচ্ছেন।
১৫ অক্টোবর রয়টার্সের প্রতিবেদনে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় এডেন শহরে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রাসাদ কমপ্লেক্সে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই নিরাপত্তারক্ষী নিহত হওয়ার খবর আসে। একই প্রতিবেদনে সৌদি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুতিদের হামলা এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের পাল্টা অভিযানের বিবরণও উঠে আসে।
২০ অক্টোবর রয়টার্স জানায়, শাবওয়া প্রদেশে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৭৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। আহত হয়েছেন দুই শতাধিক মানুষ। এসব ঘটনা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ইয়েমেনের যুদ্ধ আর কোনো স্থবির সংঘাত নয়; এটি আবারও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি: হুতিদের প্রতিরোধক্ষমতা বাস্তব হলেও তাদের সামরিক সাফল্যকে অলৌকিক অপরাজেয়তা মনে করা যেতে পারে। যুদ্ধের ফল যদিও নির্ভর করে সামরিক সক্ষমতা, কৌশল, গোয়েন্দা তথ্য, রসদ, রাজনৈতিক ঐক্য এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর কিন্তু ইয়েমেনের ক্ষেত্রে এটি কোনভাবে মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। অর্থাৎ যাদের সামরিক পোশাক পর্যন্ত নেই লুঙ্গি পরে যে যার পোশাক পরে যুদ্ধ করে পায়ের প্যান্ডেল নেই কোন কোন যোদ্ধার, অথচ তারা বিশাল বিশাল সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে দশকের পর তোষক বিভিন্ন অত্যাধুনিক সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে এখনো টিকে আছে।
এত শক্তির বিরুদ্ধে হুতিরা টিকে থাকে কীভাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ইয়েমেনের ভূপ্রকৃতি, দীর্ঘ সংঘাতের অভিজ্ঞতা এবং হুতিদের সামরিক কৌশল বিবেচনায় নিতে হবে। পাহাড়ি অঞ্চল, দুর্গম পথ, স্থানীয় নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা যেকোনো বাহিনীর জন্য সামরিক অভিযানকে জটিল করে তুলতে পারে।
এ ছাড়া হুতিরা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। তাদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে ইরানের সহায়তার মাত্রা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য ও মূল্যায়নে পার্থক্য রয়েছে।
অন্যদিকে সৌদি আরবের হাতে রয়েছে আধুনিক বিমানবাহিনী, উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা। যারা বিগত ২৫ সালের ৮৩ বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র ক্রয় করেছে এবং ২৬ সালের এখন পর্যন্ত ৬৪ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করেছে তবুও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব সব সময় রাজনৈতিক বিজয় নিশ্চিত করে না। আফগানিস্তান থেকে ইরাক—আধুনিক ইতিহাসে বহু সংঘাত দেখিয়েছে, শক্তিশালী বাহিনী প্রতিপক্ষকে ব্যাপক ক্ষতি করেও কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে।
এই বাস্তবতাই হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে জটিল করে তুলেছে। তাদের সম্পূর্ণ পরাজিত করা সম্ভব কি না, তার চূড়ান্ত উত্তর দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—শুধু বোমাবর্ষণ দিয়ে ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
বিজয়ের নামে কার মৃত্যু হচ্ছে?
যুদ্ধের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো, ক্ষমতার হিসাব করে যারা সংঘাত শুরু করে, তার সবচেয়ে বড় মূল্য প্রায়ই দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। সৌদি আরব একটি মুসলিম নামধারী রাষ্ট্র হলেও তাদের বাহিনী কর্তৃক ইয়েমেনের বিমানবন্দর নৌবন্দর অবরোধের কারণে ইয়েমেনের মুসলিম জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে খাদ্যসংকট, চিকিৎসাসেবার অভাব, বাস্তুচ্যুতি, দারিদ্র্য এবং অবকাঠামোগত বিপর্যয়ের শিকার। বর্তমানে তাইজসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অবরোধ ও তীব্র লড়াই মানবিক পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলেছে। হাসপাতাল, পানির সরবরাহ, খাদ্য পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচল যুদ্ধের চাপে বিপর্যস্ত হচ্ছে।
হুতি হোক, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হোক কিংবা অন্য কোনো সশস্ত্র পক্ষ—বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা, নির্বিচার হত্যাকাণ্ড এবং মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করার কোনো নৈতিক বৈধতা নেই।
যে পক্ষই ধর্ম, জাতীয়তাবাদ কিংবা নিরাপত্তার নামে সাধারণ মানুষের জীবনকে তুচ্ছ করে, তাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো জরুরি। কারণ কোনো পক্ষের পতাকা কিংবা স্লোগান ক্ষুধার্ত শিশুর পেট ভরায় না; কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বস্ত হাসপাতালকে আবার জীবিত করে না।
তাহলে কি গোটা বিশ্ব এক হলেও হুতিদের হারাতে পারবে না?
এখানেই শিরোনামের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য। ইয়েমেনের জন্য মহানবী (সা.)-এর দোয়া মুসলমানদের কাছে ভালোবাসা, বরকত ও আধ্যাত্মিক আশার প্রতীক। সেই বিশ্বাসকে সম্মান করেই বলা যায়, ইয়েমেনকে কেবল সামরিক শক্তির পরীক্ষাগার হিসেবে দেখার মানসিকতা ভুল। একটি দেশের ইতিহাস, জনগণের আত্মপরিচয়, স্থানীয় বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে স্থায়ী বিজয় অর্জন করা কঠিন।
তবে হুতিদের সমর্থন করা আর ইয়েমেনের মানুষের প্রতি ভালোবাসা দেখানো এক বিষয় নয়। হুতিরা ইয়েমেনের সব মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে—এমন দাবি কিছুদিন আগে না করা গেলেও এখন দেশটির বেশিরভাগ মানুষ সৌদি সমর্থিত সরকারের প্রতি বিরক্তি এবং ঘৃণা পোষণ করছে এবং হুতিদের পক্ষে কিংবা সমর্থনে এগিয়ে আসছে, কারণ সৌদি সমর্থিত সরকার ইয়েমেন বাসীদের কে না খাইয়ে মারছে, মারণাস্ত্র দিয়েও মারছে। দেশটির ভেতরেও রাজনৈতিক মতপার্থক্য, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রয়েছে।
অতএব, হুতিদের বিরুদ্ধে বিশ্বশক্তির সামরিক সাফল্য অসম্ভব—এমন চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া বর্তমান বিশ্ব সমরাস্ত্র বিদদের পক্ষে বিশ্বাস না করা গেলেও অধিক যুক্তিসংগত বক্তব্য হলো: ইয়েমেনের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে উপেক্ষা করে কোনো সামরিক জোটের পক্ষেই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে না।
আর ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকৃত শক্তি যদি কোথাও প্রকাশ পায়, তবে তা শুধু যুদ্ধজয়ের দাবিতে নয়; অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান, নিরপরাধ মানুষের জীবন রক্ষা এবং নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেও প্রকাশিত হওয়া উচিত।
শেষ কথা: ইয়েমেনকে বোমা দিয়ে নয়, ন্যায় দিয়ে বুঝতে হবে
ইয়েমেনের যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে না শুধু সৌদি আরবের যুদ্ধবিমান কিংবা হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে। নির্ধারিত হবে, দেশটির জনগণ কতটা রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পায়, সংঘাতরত পক্ষগুলো কতটা সমঝোতায় আসে এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারে কি না, তার ওপর।
মহানবী (সা.) ইয়েমেনের জন্য দোয়া করেছিলেন—এই বিশ্বাস মুসলমানদের হৃদয়ে বিশেষ মর্যাদা রাখে। সেই দোয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে ইয়েমেনের মানুষের জন্য শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণ কামনা করা। এর অর্থ সৌদি আরব সহ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে বোঝা উচিত তাদের মধ্যে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলার জন্য আলোচনা করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং তার পরিবর্তে কোনো গোষ্ঠীর প্রতিটি কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নাতীত সমর্থন দেওয়া কিংবা পক্ষ নেওয়া উচিত নয়।
হুতিদের সামরিক শক্তিকে অবমূল্যায়ন করা যেমন ভুল, তেমনি তাদের অপরাজেয় বলে ঘোষণা করাও বাস্তবতাকে অতিরঞ্জিত করা বলে মনে হবে কিন্তু ধর্ম বিশ্বাসীদের জন্য এটাই সত্য। কিন্তু ইয়েমেনের ইতিহাস যে শিক্ষা দেয়, তা আরও গভীর: অস্ত্র দিয়ে ভূখণ্ড দখল করা যায়, আকাশ থেকে ধ্বংস নামানো যায়; কিন্তু মানুষের বিশ্বাস, পরিচয় ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে চিরদিন বোমার নিচে চাপা রাখা যায় না।
বিশ্ব যদি সত্যিই ইয়েমেনের সংকটের সমাধান চায়, তবে আরও বড় যুদ্ধজোট গড়ার আগে তাকে গড়তে হবে ন্যায়ভিত্তিক শান্তির পথ। কারণ ইয়েমেনের মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন কোনো বিজয়ীর উত্থান নয়—একটি নিরাপদ, স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ যা শুধুমাত্র ইয়েমেন বাসীদের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য কে শুধু ঘুচাবে না বরং মুসলিম বিশ্বের প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষণ করবেন এবং তার বিপক্ষে গেলে এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গেলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অভিশাপে হয়তো এক সময় এই মুসলিম রাষ্ট্র সহ যেসব রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছে তারা ধ্বংস হলেও হতে পারে এমন কথা আজকের দিনে বলা মনে হয় অমূলক নয় কারণ বিশ্ব এসব কারণে মহাপ্রলয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন