প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বর্তমান সরকারের সাড়ে ছয় মাসের মাথায় জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য রাজপথে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। সংবিধান সংস্কার, জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পাশাপাশি জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলনে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই জোট।
আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডমার্চের মাধ্যমে দাবি জোরদার করার লক্ষ্যে তারা কাজ করবে। এটি বর্তমান সরকারের সময় বিরোধী দলের সবচেয়ে বড় ও প্রথম কর্মসূচি হবে। পর্যায়ক্রমে আরো ৩ বিভাগে রোডমার্চ শেষে ঢাকায় মহাসমাবেশের আয়োজন করা হবে। সেখান থেকে সরকারের কাছে দাবি আদায়ের চূড়ান্ত বার্তা দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
জোটনেতাদের মতে, সংসদের পাশাপাশি গত প্রায় ৫ মাস ধরে দেশজুড়ে সভা-সমাবেশ ও বক্তব্য-বিবৃতির মাধ্যমে সংস্কারের দাবি আদায়ে কোনো সাড়া না পেয়ে তারা এই কর্মসূচিতে নামতে বাধ্য হয়েছেন। বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটের সমাধানসহ জনগুরুত্বপূর্ণ কিছু দাবি তাদের আন্দোলনের অংশ হিসেবে যুক্ত হয়েছে। তবে দাবি আদায় না হলে পরবর্তীতে আরো কঠোর আন্দোলনের আভাসও দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা জোরদার করার কথাও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, "আমরা সংসদের ভেতরে জনগণের গণরায় বাস্তবায়নের বিষয়ে সোচ্চার ছিলাম।" তিনি জানান, সভা-সমাবেশের মাধ্যমে সরকারের কাছে গণরায় দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু সরকার এতে কর্ণপাত না করায় তারা লংমার্চের মতো কর্মসূচি দিতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, "সরকারই আমাদের রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে।"
তিনি আরো বলেন, "আমরা সরকারকে বলেছিলাম যেসব বিষয়ে সংসদে আলোচনা ও ফয়সালা করা সম্ভব, সেসব বিষয় রাজপথে ঠেলে দেবেন না।" কিন্তু সরকার তা উপেক্ষা করে পরিস্থিতিকে রাজপথে নিয়ে এসেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের প্রতিবাদে লংমার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
সূত্রমতে, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ৬ আগস্ট রাজধানীর মুক্তাঙ্গনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে ১১ দলীয় ঐক্য। সেখান থেকে গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনের দাবিতে ঢাকায় মহাসমাবেশসহ ৪ বিভাগে লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। একই দিন সচিবালয় অভিমুখে পদযাত্রায় নেতৃত্ব দিয়ে রাজপথের কর্মসূচি জোরদারের ঘোষণা দেন তিনি।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম অভিমুখে প্রথম লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে। পরবর্তীতে ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর, ৩১ অক্টোবর খুলনা-কুষ্টিয়া এবং ২১ নভেম্বর ট্রেনযোগে সিলেট মহানগর অভিমুখে লংমার্চ পালিত হবে। সবশেষে ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে ঢাকায় মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, "সংস্কারের পক্ষে গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের দেওয়া রায় বাস্তবায়নের জন্য সংসদে বারবার বলা হলেও তাতে কোনো সাড়া দেয়নি সরকার।" তিনি জানান, "তাই জনগণের দাবি জনগণের কাছেই নেওয়া হচ্ছে।"
তিনি আরো বলেন, "এই লংমার্চের মধ্য দিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি হবে এবং দাবি-দাওয়ার বিষয়ে জনমত বাড়বে।" এতে ব্যাপক অংশগ্রহণের সাড়া পাওয়া গেছে। তিনি ঘোষণা দেন, "দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।"
এদিকে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রথম বড় কর্মসূচি ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ বাস্তবায়নের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। রাজধানীর ঐতিহাসিক শাপলা চত্বরে সকাল ৭টায় সমাবেশ শেষে লংমার্চ শুরু হবে। রাত ৯টায় চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে গিয়ে শেষ হবে। পথে বেশ কয়েকটি স্থানে বড় পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর ব্রিজ, কুমিল্লার পদুয়ারবাজার, ফেনীর মহিপাল ও চট্টগ্রামের মিরসরাই উল্লেখযোগ্য। এছাড়া আরো কিছু স্থানে ছোট ছোট পথসভা হবে। এসব সভায় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ ১১ দলের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেবেন।
জানা গেছে, লংমার্চ কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার জন্য পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সঙ্গে বৈঠক করেছেন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা। লংমার্চ রুট-সংশ্লিষ্ট এলাকার দলীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে জামায়াত। ১১ দলের শীর্ষ নেতারা দফায় দফায় বৈঠক করে কর্মসূচি বাস্তবায়নে নানা পরিকল্পনা করছেন। আজ ৩১ আগস্ট সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে বিস্তারিত প্রস্তুতি তুলে ধরবেন জোট নেতারা।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানিয়েছেন, ১১ দলীয় ঐক্যের সবচেয়ে বড় প্রথম কর্মসূচি হবে ৫ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ। তিনি বলেন, "গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ প্রধান ৬ দাবিতে দেওয়া এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।" তিনি সরকারি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও বন্ধু সংগঠনের কাছে সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করেছেন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যের ডাকে গণদাবি আদায়ের লক্ষ্যে আমরা জেলা, উপজেলা ও মহানগরীতে ৩ দফা কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ, গোলটেবিল আলোচনা সভা ও প্রচার সম্পন্ন করেছি। চতুর্থ রাউন্ডে এসে ১১ দলের পক্ষ থেকে লংমার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
তিনি বলেন, "আমরা লংমার্চের প্রধান ৬টি দাবি হিসেবে পোস্টার, লিফলেট ও প্রচারে স্থান দিয়েছি।" সেগুলো হলোÑগণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার; বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও দেশব্যাপী বিরাজমান সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করা, ভেঙে পড়া ও অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন করা এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে সংকীর্ণ দলীয়করণের প্রতিবাদ ও তা বন্ধ করা।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল জানান, এই লংমার্চে ৬-৭ পয়েন্টে শীর্ষ নেতারা পথসভা করবেন। এতে হাজারের বেশি গাড়ি সংযুক্ত থাকবে এবং পথে পথে স্বতঃস্ফূর্ত সাধারণ মানুষ ও যানবাহন যোগ দেবে। লংমার্চের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিতে বেশ কয়েকটি বিভাগ গঠন করা হয়েছে। অভ্যর্থনা, মেডিকেল, পরিবহন, প্রচার ও প্রকাশনা, আইটি, স্বেচ্ছাসেবক, সাংস্কৃতিক, নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক যোগাযোগ বিভাগের দায়িত্বশীলদের নিয়ে সমন্বয় সভা করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, "লংমার্চ চলাকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ডবল রোডের একটি পথ আমরা ব্যবহার করব এবং অপর পথটি সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য ফ্রি রাখব, যেন চলাচলে বিঘ্ন না ঘটে।" বিশাল গাড়িবহর ও পথসভার কারণে সাময়িক যে যানজট বা ভোগান্তি হতে পারে, তার জন্য জামায়াতের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে আগাম ক্ষমা চেয়েছেন তিনি।
লংমার্চের কারণ প্রসঙ্গে এই নেতা বলেন, "নির্বাচনে জয়লাভের পর গণভোটের গণরায়কে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার অস্বীকার করছে।" তিনি অভিযোগ করেন, "তারা একে সংবিধানবিরোধী এবং রাষ্ট্রপতির আদেশকে চ্যালেঞ্জ করছে।" তিনি বলেন, "সংবিধানের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছে এবং গণরায়কে এড়িয়ে যাচ্ছে।" সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও ১১ দলের এমপিরা নোটিস দিয়ে বারবার বিতর্ক করছেন; কিন্তু আলোচনা নিষ্ফল হচ্ছে। যতক্ষণ পার্লামেন্টে এর নিষ্পত্তি না হচ্ছে, ততক্ষণ ৭০ ভাগ জনগণের ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায়কে সমুন্নত রাখতে রাজপথে নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলক কর্মসূচি চালিয়ে যাব।
সংস্কারের জন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি জানান, ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে লংমার্চ শুরু হবে এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিভাগেও তা নেওয়া হবে। পরে ঢাকায় মহাসমাবেশ করা হবে।
জানা গেছে, লংমার্চে ঢাকা থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাদের গাড়িবহর ছাড়াও পথে পথে স্থানীয় নেতারাও যোগ দেবেন। জোটের প্রত্যেক দল থেকেই সর্বাধিকসংখ্যক নেতাকর্মীর অংশগ্রহণের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক আযাদ বলেন, "আমাদের নির্দেশনা ছাড়ও সব দল থেকেই ব্যাপক অংশগ্রহণের বিষয়ে আগ্রহ দেখা গেছে।" তিনি আশা প্রকাশ করেন, "সব মিলিয়ে এটি ঐতিহাসিক একটি লংমার্চ হবে এবং এতে ১১ দলের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও ঢল নামবে।" কারণ, "বিভিন্ন দুর্ভোগের কারণে জনগণের মাঝে ক্ষোভ আছে।"
এদিকে জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জাতীয় সংসদে আরো সোচ্চার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিরোধী দল। তারই অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার তৃতীয় অধিবেশনের শুরুর দিনেই সংসদ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রশ্নোত্তর চলাকালে বিরোধীদলীয় দুই এমপির তোলা প্রশ্নকে ‘শাহবাগ স্কয়ার’ ও ‘পল্টনের বক্তৃতা’র সঙ্গে তুলনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যের জেরে বিরোধী দলের কড়া প্রতিবাদে উত্তাপ ছড়ায়। এছাড়া গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল সংসদে তোলার আগে তাতে আপত্তি জানিয়ে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল।
পরে প্রেস ব্রিফিংয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, "স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে দুবার ওয়াকআউট পরিস্থিতি হলেও আমরা কন্টিনিউ করার চেষ্টা করেছি।" তবে তিনি জানান, "শেষদিকে সরকারি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিল পাসের চেষ্টা করলে আমরা তা প্রত্যাখ্যান এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ওয়াকআউট করেছি।" তিনি আরো বলেন, "এরপরও কোনো বিল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পাসের চেষ্টা করলে আমরা প্রতিবাদ করব।"
তিনি বলেন, "আমরা জাতির সঙ্গে বেঈমানি করব না।" তিনি জানান, "গণভোট বাস্তবায়নের জন্য সংসদে ও বাইরে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি।" তিনি উল্লেখ করেন, "আমাদের লংমার্চগুলোতে বিএনপির বিশ্বাসঘাতকতার বিষয়গুলো জনগণকে জানানো হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন