প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সন্ধ্যার পর গড়াই নদীর স্নিগ্ধ হাওয়া খেতে একসময় মানুষের ঢল নামত কুষ্টিয়ার কুমারখালী-যদুবয়রা সেতুতে। দিনের ক্লান্তি শেষে একটু প্রশান্তির খোঁজে আসা মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত চারপাশ। কিন্তু সেই চিরচেনা রূপ এখন আর নেই।
৮৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৬৫০ মিটার দীর্ঘ এই বিশাল সেতুটি এখন গিলে খাচ্ছে ঘুটঘুটে অন্ধকার। বছর খানেক আগে চুরি হয়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক ক্যাবল আর পুনস্থাপন না হওয়ায়, সেতুর ৩৬টি সড়কবাতি এখন শুধুই দাঁড়িয়ে থাকা শোভাবর্ধক পোল। বিশাল এই সেতুর বুকে মাত্র চারটি সোলার প্যানেলের নিভু নিভু আলো যেন কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার প্রতীক হয়ে জ্বলছে।
সেতু এলাকার ঝালমুড়ি বিক্রেতা আলী হোসেনের কণ্ঠে এখন কেবলই হতাশা। একসময় এই সেতুটি ছিল তার উপার্জনের দারুণ এক জায়গা। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, সেতুটি একটি শান্তির জায়গা। দোকানপাট বন্ধ করে রাত ৮টার পর মানুষ এখানে ঘুরতে আসত। সেতু চালুর সময় দিনের মতো লাইট জ্বলত, তখন হাজার-বারোশ টাকা বিক্রি হতো। এখন লাইট নেই বলে ৮টা বাজলেই মানুষ ভয়ে চলে যায়, বিক্রি অর্ধেকও হয় না।
আলী হোসেনের মতো ভ্যানচালক রেজাউল ইসলামও থাকেন আতঙ্কে। অন্ধকারে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা, আর এই সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারী চক্র। রেজাউল বলেন, রাতে সেতুর ওপর ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকে। এই সুযোগে প্রায়ই ভ্যান-রিকশা ছিনতাই হচ্ছে। সেতু চালুর প্রথম ছয়-সাত মাস আলো ছিল, মানুষ গভীর রাত পর্যন্ত ঘুরত। এখন অন্ধকারে ভয়ে কেউ আসতেই চায় না।
কোটি টাকার সেতুতে এমন ভুতুড়ে পরিবেশ মেনে নিতে পারছেন না স্থানীয়রা। জোতমোড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এটি আক্ষরিক অর্থেই 'প্রদীপের নিচে অন্ধকার'। রাত ১০টা বাজলেই এই অন্ধকারে বসে মাদকসেবীদের আসর। ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা প্রশ্ন তোলেন, কোটি টাকার সেতুতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকার পরও চোরদের কেন ধরা গেল না? চোরেরা তো আর মঙ্গলগ্রহ থেকে আসেনি!
অথচ ২০২৩ সালে সেতুটি যখন উন্মুক্ত করা হয়, তখন প্রতিটি বাতি স্থাপনে খুঁটি, তার ও বাল্ব বাবদ খরচ হয়েছিল প্রায় ৬০ হাজার টাকা। এখন অযত্নে আর অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে এসব দামি যন্ত্রাংশ। শুধু আলো না থাকার কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনের ঝুঁকিও বাড়ছে।
২০২৩ সালের ২৮ জুন সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া স্বপ্নের এই সেতুটি নির্মাণ করেছিল নেশনটেক কমিউনিকেশন ও রানা বিল্ডার্স। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কাজ শেষে হস্তান্তরের পর তাদের এক বছরের মেরামতের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এখন এর পুরো দায়ভার এলজিইডির।
কুমারখালী উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী নাজমুল হক জানান, বকেয়া বিলের কারণে কিছুদিন সংযোগ বন্ধ থাকায় অনেক বাতি নষ্ট হয়। পরে বকেয়া পরিশোধ করে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৭টি বাতি মেরামত করা হয়েছিল। কিন্তু ওই বছর জুলাই মাসে চার লাখ টাকা মূল্যের ৬৫০ মিটার দামি ক্যাবল চুরি হয়ে যাওয়ায় আবারও পুরো সেতু অন্ধকারে তলিয়ে যায়। তিনি জানান, নতুন করে ক্যাবল কেনা ও বাতি জ্বালানোর জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
আপাতত সাময়িক সমাধানের একটি চেষ্টা চোখে পড়ে। কুমারখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার জানান, জনস্বার্থে ইতিমধ্যে চারটি সোলার বাতি স্থাপন করা হয়েছে। নতুন অর্থবছরের বরাদ্দ পেলে পুনরায় সব বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা করা হবে।
তবে কবে সেই বরাদ্দ আসবে, আর কবে গড়াই নদীর বুকের এই সেতুটি আবারও আলোয় ঝলমল করে কাটবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন কুমারখালীবাসী। হেডলাইটের আলোয় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করা যানবাহন আর অন্ধকার হাতড়ে চলা পথচারীদের আপাতত এই ভুতুড়ে পরিবেশেই অভ্যস্ত হতে হচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন