প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দাম্পত্য কলহ, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের অভিযোগ পরিবারের; ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ঘিরে তদন্তের অপেক্ষা
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে ফারহানা ইয়াসমিন শিলা (৪৫) নামের এক গৃহবধূর অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁকে হত্যার পর মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলেছেন নিহতের স্বজনেরা। এ ঘটনায় তাঁর স্বামী ও রাঙ্গাবালী উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রাসেল মাহমুদের (৪৮) বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাহেরচর বাজার এলাকায় নিজেদের বাসায় এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাথমিক সুরতহাল শেষে বেলা ১১টার দিকে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পটুয়াখালী মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় রাঙ্গাবালী থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। প্রাথমিক সুরতহালে আত্মহত্যার বিষয়টি উঠে এসেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দাম্পত্য কলহ ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের অভিযোগ
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, প্রায় দেড় বছর আগে রাসেল মাহমুদের সঙ্গে দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শিলা। বিয়ের পর থেকেই তাঁদের দাম্পত্য জীবনে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধ চলছিল। সামান্য বিষয়েও প্রায়ই কথা-কাটাকাটি হতো। একাধিকবার রাতে শিলাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেছেন স্বজনেরা।
পরিবারের আরও অভিযোগ, শিলার পৈতৃক সম্পত্তি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য তাঁকে চাপ দেওয়া হতো। পৈতৃক জমি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ স্বামীর হাতে তুলে দিতেন শিলা। স্বজনদের দাবি, সেই অর্থ দিয়ে রাসেল তাঁর প্রথম স্ত্রীর সংসার পরিচালনা করতেন। প্রথম স্ত্রীকে কেন্দ্র করেও তাঁদের মধ্যে বিরোধ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া শিলার বাবার দোকান রাসেল দখলে রেখেছেন বলেও অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্যরা।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মেয়ের বক্তব্যে উঠে এসেছে পারিবারিক অশান্তির চিত্র
নিহত শিলার ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে লাবিবা আক্তারের ভাষ্য, গত এক বছর ধরে রাসেল তাঁর মাকে নিজের সঙ্গে ঘুমাতে দিতেন না। তাঁর মা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় ঘুমাতেন। রাতে মা-বাবার মধ্যে ঝগড়ার শব্দ শুনলেও ভয়ে নিচে যেতেন না বলে জানায় সে। তার দাবি, প্রায়ই রাতে তাঁর মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হতো।
লাবিবা জানায়, ঘটনার আগের রাতে সে ঘুমিয়ে ছিল। কী ঘটেছিল, তা সে দেখেনি। সকালে কেয়া খালামনি তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। পরে সে দেখতে পায়, তার মাকে বিছানায় শুইয়ে রাখা হয়েছে।
প্রতিবেশীর বক্তব্যে উঠে এসেছে মরদেহ উদ্ধারের বিবরণ
প্রতিবেশী কেয়া বেগমের ভাষ্য, শুক্রবার সকালে শিলার স্বামী রাসেল তাঁকে ডেকে নেন। ঘরে গিয়ে তিনি শিলাকে ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় ঝুলতে দেখেন। পরে তিনি জানতে পারেন, রাতে স্বামী-স্ত্রী একই বিছানায় ঘুমিয়েছিলেন। রাসেল মরদেহটি নামিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, নিহতের বড় ভাই রাশেদুল ইসলাম সজল বলেন, লোকমুখে বোনের মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি বাড়িতে যান। সেখানে বোনের গলায় ফাঁসের দাগ দেখতে পান বলে দাবি করেন তিনি। পরে তাঁর ছোট ভাই কমল পুলিশকে খবর দেন। তাঁর অভিযোগ, বোনের মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা থাকতে পারে।
ঘটনার পর স্বামীর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ঘটনার পর থেকে রাসেল মাহমুদ আত্মগোপনে রয়েছেন। এ ছাড়া ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে উপজেলা বিএনপি ও যুবদলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের পক্ষ থেকে তদবির চালানোর অভিযোগও উঠেছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে রাসেল মাহমুদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “যা বলার, জানাজা নামাজের সময়ে বলবো।”
পুলিশের বক্তব্য
রাঙ্গাবালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) ইলিয়াস হোসেন মুন্সি বলেন, মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা নেওয়া হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের অপেক্ষা
একজন গৃহবধূর অস্বাভাবিক মৃত্যুকে ঘিরে একদিকে পরিবারের অভিযোগ, অন্যদিকে পুলিশের প্রাথমিক সুরতহাল ও চলমান আইনি প্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে শিলার মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং পুলিশের তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটিত হবে কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন নিহতের স্বজনেরা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন