প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মনি রোডে মাদক কারবার, ব্ল্যাকমেইল ও সম্পত্তি দখলের অভিযোগ-তদন্তের দাবি এলাকাবাসীর
ঢাকার কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মনি রোড এলাকাকে ঘিরে মাদক কারবার ও বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র এলাকায় মাদক কেনাবেচা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্ল্যাকমেইল এবং জমি-সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে আসছে। এই অভিযোগগুলোর কেন্দ্রে স্থানীয়ভাবে বজলুর রহমানের ছেলে মিঠুন নামে এক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ তাকে ‘বড় ডিলার মিঠুন’ নামে উল্লেখ করেন। তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ও নথিভুক্ত মামলার তথ্য যাচাই জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন:
স্থানীয় পর্যায়ে মিঠুনের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, তিনি নিজেকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। একই সঙ্গে তাকে ঘিরে মাদক কারবারসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে বলে দাবি অভিযোগকারীদের।
তবে রাজনৈতিক দলের কোনো পদে তিনি বর্তমানে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন কি না, কিংবা সংশ্লিষ্ট কমিটিতে তার নাম রয়েছে কি না—এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সাংগঠনিক নথি ও দলীয় সূত্রের বক্তব্য এই প্রতিবেদনের প্রস্তুতিকালে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, তাকে ‘মাদক ব্যবসায়ী’ হিসেবে উল্লেখ করার ক্ষেত্রেও অভিযোগের সঙ্গে মামলার এজাহার, চার্জশিট, আদালতের নথি কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলে সেটি যেমন তদন্তের বিষয়, তেমনি অভিযোগটি মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা জরুরি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন-কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় কি মাদক কারবার কিংবা অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগের তদন্তকে প্রভাবিত করছে? নাকি এসব অভিযোগের পেছনে স্থানীয় বিরোধ ও ব্যক্তিগত স্বার্থ কাজ করছে? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠন এবং আদালতের নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে।
মিঠুনের রাজনৈতিক পরিচয়, কথিত মাদক কারবার এবং তার বিরুদ্ধে থাকা সম্ভাব্য মামলার তথ্য—এই তিনটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করাই এখন অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কেরানীগঞ্জে মাদক কারবারের বাস্তব চিত্র মিঠুনকে ঘিরে স্থানীয় অভিযোগের বাইরে কেরানীগঞ্জে মাদক কারবারের বিস্তার নিয়ে অতীতেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রথম আলো জানিয়েছিল, কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মাদক বিক্রির একাধিক স্পট ছিল এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে বিপুলসংখ্যক মামলা ও গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়েও কেরানীগঞ্জে বড় পরিসরে মাদকবিরোধী অভিযান হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে র্যাব-১০ কেরানীগঞ্জে একটি কথিত ইয়াবা তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ৯৬৮টি ইয়াবা, উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল ও সরঞ্জামসহ চারজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায়। র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা প্রায় দুই বছর ধরে ইয়াবা উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছিলেন।
এর কয়েক দিন পর আরেক অভিযানে কেরানীগঞ্জের দুটি ইয়াবা উৎপাদন ইউনিটের সন্ধান পাওয়ার কথা জানায় র্যাব। ওই অভিযানে ৩১ হাজারের বেশি ইয়াবা, উৎপাদনযন্ত্র ও ১৭ কেজি কাঁচামাল উদ্ধারের তথ্য প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকায় পৃথক অভিযানে ১৫ হাজার এবং অন্য ঘটনায় ১৯ হাজার ২০০ ইয়াবা উদ্ধারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
মিঠুনকে ঘিরে স্থানীয়দের অভিযোগ কী? স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, হাসনাবাদের মনি রোড এলাকায় মিঠুনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, মাদক কারবারের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তিকে ভয়ভীতি দেখানো, বিরোধে জড়ানো এবং অর্থ আদায়ের মতো ঘটনাতেও তার নাম আলোচনায় এসেছে। কয়েকজন অভিযোগকারী দাবি করেন, সামাজিকভাবে প্রভাবশালী বা বিত্তবান ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের চাপের মধ্যে ফেলার চেষ্টা করা হতো। কারও কারও ভাষ্য, নারীকে ব্যবহার করে পরিচয় তৈরি, গোপন ছবি বা ভিডিও ধারণ এবং পরে তা প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে আদালতের নথি, জিডি, মামলা, অডিও-ভিডিও বা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের স্বাধীন যাচাই এই প্রতিবেদনের প্রস্তুতিকালে সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলো তদন্ত করে সত্যতা নিরূপণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সম্পত্তি ও দলিল নিয়ে অভিযোগ: মিঠুনকে ঘিরে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ হলো জমি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং দলিল হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, আর্থিক লেনদেন বা ঋণসংক্রান্ত বিরোধের সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যক্তির ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেন, ভয়ভীতি বা চাপের কারণে জমি, দোকান কিংবা অন্যান্য সম্পত্তির কাগজপত্র হস্তান্তরের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল।
তবে ‘এক ডজনের বেশি পরিবার নিঃস্ব হয়েছে’ বা ‘জোরপূর্বক দলিল লিখে নেওয়া হয়েছে’-এ ধরনের নির্দিষ্ট দাবির পক্ষে নথিভুক্ত দলিল, ভুক্তভোগীর নাম, মামলা নম্বর এবং আদালতের রেকর্ড প্রকাশ করা জরুরি। এসব তথ্য যাচাই না করে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে প্রকাশ করা সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিবাদকারীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ: এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, মাদক কারবারের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো বা মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করা হতে পারে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, নিরীহ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখানো হয়েছে। আবার স্থানীয় পর্যায়ে এমন অভিযোগও রয়েছে যে, বিরোধের জেরে কারও কাছে মাদক রেখে পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে খবর দেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে মাদক দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ সত্য প্রমাণ করতে হলে মামলার এজাহার, জব্দ তালিকা, সাক্ষ্য, তদন্ত প্রতিবেদন এবং আদালতের নথি যাচাই প্রয়োজন। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন: মাদক কারবারের মতো অপরাধ দীর্ঘদিন চলতে থাকলে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। তবে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা প্রশাসনের সদস্য মাদক চক্রকে সহযোগিতা করেছেন-এমন অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নাম, দায়িত্বকাল, নির্দিষ্ট ঘটনা এবং প্রমাণসহ অভিযোগ উপস্থাপন করা প্রয়োজন কেরানীগঞ্জে সাম্প্রতিক বড় বড় মাদকবিরোধী অভিযান থেকে বোঝা যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাদক উৎপাদন ও সরবরাহের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পৃথক তদন্ত প্রয়োজন।
মিঠুনের বিরুদ্ধে আসলে কত মামলা? মিঠুনকে নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা অভিযোগ থাকলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-তার বিরুদ্ধে কোন কোন থানায় কতটি মামলা রয়েছে, মামলাগুলোর ধারাগুলো কী, কোন মামলায় তিনি জামিনে আছেন, কোনো মামলায় সাজা হয়েছে কি না এবং বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন কি না। এসব তথ্য নিশ্চিত করতে পুলিশের মামলা রেকর্ড, আদালতের কজলিস্ট ও সংশ্লিষ্ট থানার তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু স্থানীয় মানুষের বক্তব্যের ভিত্তিতে কাউকে ‘মাদক সম্রাট’, ‘সিন্ডিকেটের মূলহোতা’ বা ‘কুখ্যাত অপরাধী’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার বদলে মামলার নথি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য যুক্ত করলে প্রতিবেদনটি আরও শক্তিশালী হবে।
অনুসন্ধানে যেসব নথি গুরুত্বপূর্ণ, মিঠুনকে ঘিরে অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো যাচাই করা যেতে পারে- তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলার সংখ্যা ও মামলা নম্বর; মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলা আছে কি না; মামলার এজাহার ও চার্জশিটে তার ভূমিকা কীভাবে উল্লেখ করা হয়েছে; গ্রেপ্তারের সময় কী কী মাদক বা অন্যান্য আলামত উদ্ধার হয়েছে, ভুক্তভোগীদের জিডি, মামলা ও লিখিত অভিযোগ, কথিত ব্ল্যাকমেইলের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রমাণ, মাদক কারবারের সঙ্গে কথিত সহযোগীদের পরিচয় ও ভূমিকা,স্থানীয় পুলিশ, ডিএনসি ও সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার বক্তব্য।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তদন্তের দাবি, স্থানীয়দের দাবি, হাসনাবাদ ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মনি রোড এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা হোক। একই সঙ্গে মাদক কারবারের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগের আড়ালে কোনো নিরীহ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হয়ে থাকলে সেটিও তদন্ত করা হোক। বিশেষ করে মিঠুনকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে তার কথিত সহযোগী, আর্থিক লেনদেন, সম্পত্তি, মাদক মামলার নথি ও যোগাযোগের তথ্য আইনগতভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
কেরানীগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযানের ধারাবাহিকতা,২০২৬ সালে কেরানীগঞ্জে একাধিক বড় মাদকবিরোধী অভিযান এবং ইয়াবা উৎপাদনকারী চক্র শনাক্তের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে হাসনাবাদসহ কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মাদক সরবরাহের উৎস, উৎপাদন, পরিবহন ও খুচরা বিক্রির পুরো নেটওয়ার্ক খুঁজে বের করা এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মিঠুনকে ঘিরে স্থানীয় অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটুকু—তা নির্ধারণ করবে তদন্ত, মামলার নথি ও আদালতের রেকর্ড। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে নির্দোষ ব্যক্তির হয়রানি বন্ধ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চলবে......................
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন