প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মুসলিম সমাজে যুগ যুগ ধরে আশুরার রোজা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তবে এই রোজা একদিন রাখা যথেষ্ট, নাকি দুইদিন রাখা আবশ্যক, এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা দেখা যায়।
এবং যদি আমরা হাদিস, ফিকহ, মুজতাহিদ ইমামদের ব্যাখ্যা এবং সমকালীন ফতোয়া বোর্ডগুলোর সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করি, তাহলে এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান পাওয়া যায়।
আশুরার রোজার ভিত্তি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় এসে উপস্থিত হন, তখন তিনি দেখতে পান যে, ইহুদিরা ১০ মহররমে রোজা পালন করছে। যখন তিনি তাদের কারণে জিজ্ঞাসা করেন, তখন তারা জানায় যে, এ দিন আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা আ. ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউনকে ধ্বংস করেছিলেন।
এখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুসার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তোমাদের চেয়ে অধিক।’ এরপর তিনি নিজে আশুরার রোজা পালন করেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি: ২০০৪, সহিহ মুসলিম: ১১৩০)
এখন দেখা যাচ্ছে, এই হাদিসে ১০ মহররমের রোজা হিসেবে আশুরার মূল রোজা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে এ দিন রোজা রেখেছেন এবং এর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। পরে তিনি আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কেও বলেন, আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে। (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
অর্থাৎ, আশুরার দিনের রোজা নিজেই একটি স্বতন্ত্র সুন্নত এবং মহান ফজিলতের আমল।
তবে রাসূলুল্লাহ (সা.) জীবনের শেষ দিকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন। হজরত ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি যদি আগামী বছর জীবিত থাকি, তাহলে অবশ্যই নবম তারিখও রোজা রাখব। (সহিহ মুসলিম: ১১৩৪)
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিস ও ফকিহরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ১০ মহররমের রোজা বাদ দেওয়ার কথা বলেননি, বরং ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ তারিখ যুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
তার উদ্দেশ্য ছিল যে মুসলিম উম্মাহকে ইহুদিদের থেকে স্বতন্ত্র পরিচয় দেওয়া এবং ইবাদতে অতিরিক্ত গুরুত্বারোপ করা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.) এই ইচ্ছা প্রকাশ করার পরবর্তী মহররম আসার আগেই ইন্তেকাল করেন। ফলে তিনি বাস্তবে ৯ ও ১০ মহররম একত্রে রোজা পালন করতে পারেননি। কিন্তু তার এই ইচ্ছা ও নির্দেশনা থেকেই ফকিহগণ দুদিন রোজা রাখাকে অধিক উত্তম বলে উল্লেখ করেছেন।
চার মাজহাবের ইমামদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনো মাজহাবই শুধু ১০ মহররমের রোজাকে অগ্রহণযোগ্য বলেনি। হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি সব মাজহাবের আলেমরা একমত যে, শুধু ১০ মহররমের রোজা রাখলেও আশুরার সুন্নত আদায় হয়ে যায় এবং এর ফজিলত লাভ করা যায়। তবে ৯ ও ১০ মহররম একত্রে রোজা রাখা অধিক উত্তম এবং সুন্নতের অধিক পরিপূর্ণ অনুসরণ।
ইমাম নববী রহ. আশুরার রোজার স্তর বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, সর্বোত্তম হলো ৯, ১০ ও ১১ মহররম তিনদিন রোজা রাখা। এরপর ৯ ও ১০ মহররম। এরপর ১০ ও ১১ মহররম। আর শুধু ১০ মহররম রোজা রাখাও একটি সুন্নত ও ফজিলতপূর্ণ কাজ।
সমকালীন বিশ্বের প্রধান ফতোয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থানও একই। মিশরের দারুল ইফতা, সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি, দারুল উলুম দেওবন্দ, পাকিস্তানের মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি, শাইখ ইবনু বায, শাইখ ইবনু উসাইমীনসহ অসংখ্য আলেম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, শুধুমাত্র ১০ মহররমের রোজা রাখা বৈধ, সুন্নত এবং ফজিলতপূর্ণ। কিন্তু ৯ ও ১০ মহররম একত্রে রোজা রাখা অধিক উত্তম।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ইচ্ছা, সাহাবিদের আমল এবং ফকিহদের ব্যাখ্যার আলোকে ৯ ও ১০ মহররম একত্রে রোজা রাখা অধিক উত্তম, আরও পরিপূর্ণ এবং সুন্নতের পরিপন্থী নয়।
ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি মানুষের জন্য সহজতা ও ভারসাম্যের পথ উন্মুক্ত রাখে। যে ব্যক্তি দুইদিন রোজা রাখবেন, তিনি অতিরিক্ত সওয়াব ও সুন্নতের পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হবেন। আর যে ব্যক্তি শুধুমাত্র ১০ মহররম রোজা রাখবেন, তিনিও আশুরার সুন্নত থেকে বঞ্চিত হবেন না।
উভয় আমলই শরিয়তের স্বীকৃত পরিসরের অন্তর্ভুক্ত, তবে মর্যাদার দিকে থেকে দুইদিন রোজা রাখা অধিক উত্তম ও অধিক পরিপূর্ণ সুন্নত।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন