প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
প্রাচীন যুগ থেকে সাপে কাটা রোগীদের সারিয়ে তুলতে বিভিন্ন উপায় অবলম্বনের গল্প শোনা যায়।
সর্বাধিক প্রচলিত যে পদ্ধতি নিয়ে জানা যায়, তা হলো কবিরাজ বা ওঝার মাধ্যমে ওঝাগিরি করা। কিন্তু ইনডিজিনাস নলেজ (কোনো জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে বিকশিত ও সংরক্ষিত জ্ঞান, দক্ষতা বা দর্শন) ব্যবহার করে অনেক অঞ্চলে ‘সফল’ চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ এখনও চলছে। যেমন শেরপুরে রয়েছে সাপে কাটার চিকিৎসায় ‘পাথর রহস্য’, যা প্রায় আট দশক ধরে চলমান আছে।
এই পদ্ধতির যাত্রা শুরু হয়েছিল দেশভাগের আগে, ১৯৪৬ সালে একজন খ্রিষ্টান ধর্মীয় ব্রতধারী নারীর মাধ্যমে। সিস্টার ইম্মানুয়েল নামক ওই নারী শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায় গড়ে তোলেন ‘আওয়ার লেডি অব লর্ডস ডিসপেনসারি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান।
দাতব্য চিকিৎসালয়টি ভারতের মেঘালয় রাজ্যঘেঁষা সীমান্তবর্তী পাহাড়ি বারোমারী এলাকায় অবস্থিত। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখানে সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসায় একটি বিশেষ কালো পাথর ব্যবহারের দাবি করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে যে, এই পাথর দিয়ে সাপে কাটা রোগীর শরীরের বিষ শুষে নেওয়া হয়।
ডিসপেনসারির ইনচার্জ সিস্টার বাপ্তিস্তা রেমা জানান, পাথরটি কোথা থেকে আনা হয়েছে সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য তাদের কাছে নেই। ধারণা করা হচ্ছে, বেলজিয়াম বা ফ্রান্স থেকে এই বিশেষ পাথরটি আনা হয়েছিল।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, একটি পাথরকে বিশেষ কৌশলে ছোট অংশে ভাগ করে বিশেষ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সম্প্রতি সাপে কাটা অবস্থায় এখানে চিকিৎসা নেন রফিকুল ইসলাম নামের একজন রোগী। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমার পায়ে সাপে কামড় দিছিল। পাথর দেওয়ার কিছুক্ষণ পর দেখি ব্যথা, শরীর খারাপ একটু একটু করে কমে গেছে। পরে আমি আস্তে আস্তে ভালো হয়ে যাই। এখন আমি একদম সুস্থ আছি।’
আরেক রোগীর স্বজন মর্জিনা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে সাপে কামড় দেয়। আমরা খুব ভয় পাইছিলাম। পরে খোঁজখবর নিয়ে এখানে আনার পর চিকিৎসার পর ধীরে ধীরে সে ভালো হইছে। মূলত আমার ছেলেকে একটা পাথর লাগায় রাখছিল, কিছুক্ষণ পর সেই পাথরটা নিজে নিজেই পড়ে যায় আর আমার ছেলে সুস্থ হয়ে যায়।’
দাতব্য চিকিৎসালয়টির কর্তৃপক্ষ জানায়, সাপে কাটা রোগীর ক্ষতস্থানে বিশেষ কালো রংয়ের পাথরটি রাখা হলে তা শরীরে বিষ থাকা অবস্থায় ক্ষতস্থানে আটকে থাকে। বিষ শোষিত হয়ে গেলে নিজে থেকেই পড়ে যায়। তারা বলেন, আগে বিনামূল্যে সেবা দেওয়া হলেও বর্তমানে প্রতিটি রোগীর কাছ থেকে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, এভাবে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন।
এ পদ্ধতিতে এখন পর্যন্ত কোনো রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। গত কয়েক বছরে শত শত রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। গত সাত বছরে এ পদ্ধতিতে ১ হাজার ৮৫ জন সাপে কাটা রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করা হয়েছে। ওই এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এইটা অনেক বছর ধরেই চলতাছে। কেউ বলে পাথরে ভালো হয়, আবার কেউ বলে এইটা ঠিক না।’
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায়, সাধারণ সাপে কামড় দিলে এখানে আনলে মানুষ ভালোও হয়। কিন্তু বিষাক্ত সাপ হলে আবার অবস্থা একেক রকম থাকে, সবাই একভাবে সেরে উঠে না। তাই এইটা নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না।’ স্থানীয় বাসিন্দা খালেদা আক্তার বলেন, ‘এটা অনেক পুরান একটা বিশ্বাস। কেউ বিশ্বাস করে, কেউ আবার বলে হাসপাতালে নেওয়া ভালো। কিন্তু অনেক বছর ধরেই মানুষ এখানে আইসা-যাইতাছে।’ এ বিষয়ে শেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ শাহীন বলেন, ‘এ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি কোনোভাবেই বিজ্ঞানসম্মত নয়। সাপে কাটলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করাই একমাত্র কার্যকর চিকিৎসা। যদি তা না করা হয়, তাহলে রোগীর বড় ধরনের জীবনঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন