প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত হওয়ার দাবি করে নতুন করে তিন হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়ে। তবে যাচাই-বাছাইয়ে দেখা গেছে, প্রায় ২০০টি আবেদন সম্পূর্ণ ভুয়া। আরও প্রায় ৬০০ আবেদনে তথ্যগত অসংগতি পাওয়া গেছে এবং একই ব্যক্তির একাধিক আবেদন ও শহীদের নামে আহত হিসেবে পুনরায় আবেদনসহ নানা অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানানো হয়।
দৈনিক সমকালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মোট ২,৩৮৮টি আবেদন পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করে। তদন্ত শেষে ১,৫৯০ জনের তথ্য সঠিক পাওয়া গেছে এবং তাদের গেজেটভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। বর্তমানে তিনটি ক্যাটেগরিতে গেজেটভুক্ত জুলাইযোদ্ধার সংখ্যা ১৪,৩৭০। নতুন ১,৫৯০ জন যুক্ত হলে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১৫,৯৬০।
এদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এখনও অনেকে আবেদন করছেন। যাচাই শেষে যদি তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায় তবে তারা জুলাইযোদ্ধা হিসেবে নথিভুক্ত হবেন। তবে যদি কেউ অসত্য তথ্য প্রদান করেন এবং গেজেটভুক্ত হন, তাহলে তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এর পূর্বে গেজেট প্রকাশের সময় তালিকায় কিছু নাম নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। ১৩ জন শহীদ ও ২১৯ জন আহত ‘জুলাইযোদ্ধার’ নাম গেজেট থেকে বাতিল করা হয়েছে। নতুন করে বিতর্ক এড়াতে আবেদনকারীদের তথ্য গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত বছরের শুরুর দিকে ‘জুলাই শহীদ ও আহত জুলাইযোদ্ধা’দের গেজেট প্রকাশের পর অনেকেই আহত ‘জুলাইযোদ্ধা’ দাবি করে আবেদন করেন। বিভিন্ন জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরে আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ২,৩৮৮ জনের আবেদনের তথ্য মাঠ পর্যায়ে যাচাই করেছে এসবি ও পিবিআই। গত বছরের অক্টোবরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জুলাইযোদ্ধাদের তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য তদন্তের অনুরোধ জানায়। নভেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গোয়েন্দা সংস্থা দুটিকে তদন্ত গঠন করে প্রতিবেদন প্রদান করতে নির্দেশ দেয়। এই বছরের জুন মাসে এসব সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানানো হয়েছে, গেজেট প্রকাশের পর আরও ৩,৩১৬ জন আবেদন করেন। এর মধ্যে ২,৩৮৮ জনের আবেদন তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছিল, যাতে ১,৫৯০ জনের তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ৭৮৯ জনকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে (এমআইএস) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ২৭৬ জনের এমআইএসভুক্তির কাজ চলছে। নির্বাচন করার পরও ২১০ জনের যাচাই শেষ হয়েছে। সত্যতা পাওয়া অন্যান্য আবেদনগুলো যাচাই করা হচ্ছে।
তবে তদন্তে উঠে এসেছে, প্রায় ২০০ জনের আবেদন সরাসরি ভুয়া। বাকি প্রায় ৬০০ আবেদনের মধ্যে দুটি তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে অমিল পাওয়া গেছে, একাধিক আবেদন একই ব্যক্তির এবং শহীদ হওয়ার পরও আহত হিসেবে আবেদন করেছেন এমন তথ্য পাওয়া গেছে। এসব আবেদনের মধ্যে আরো একশ’র বেশি আবেদনের সত্যতা মিলতে পারে বলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাইযোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, গণঅভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের হামলায় নিহতরা ‘শহীদ’ এবং আহতরা ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন। যদি কাউকে জালিয়াতির মাধ্যমে শহীদ বা জুলাইযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়, তবে তাদের সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা বা তার বেশি অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিশাখার যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ ফারুক হোসেন বলেন, আবেদনকারীরা সত্যিই জুলাই গণঅভ্যুত्थানে আহত হয়েছেন কিনা তা নিশ্চিত করতে তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশ্যে আসলে যেন কোনো ‘ভুয়া জুলাইযোদ্ধা’ গেজেটভুক্ত না হন, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা হচ্ছে।
যেসব কারণে অনেকের আবেদন আটকে গেল, তার মধ্যে গত বছর ১৭ এপ্রিল জুলাইযোদ্ধা হিসেবে আবেদন করেন মো. নাছির উদ্দিন (৩৮)। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ২২ জুলাই উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরের হাউস বিল্ডিং এলাকায় বাঁ হাতের কনুইয়ে টিয়ারশেল ও লাঠির আঘাতে আহত হন, তবে তিনি উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি হননি। তিনি আবেদনপত্রের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করেছেন। কিন্তু কেন তিনি এখনও গেজেটভুক্ত হননি, তা তিনি জানেন না।
তবে পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনে নাছিরের সম্পৃক্ততার কোনো ছবি বা ভিডিও নেই। তিনি ৫ আগস্ট জাতীয় পতাকা হাতে একটি ছবি দেখিয়েছেন। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নাছির ওই হাসপাতালে সহকারী প্লাম্বার হিসেবে কাজ করছেন এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসাসেবায় তিনি সহযোগিতা করেন। কিন্তু তিনি দাবি করেছেন, তাকে আন্দোলনে অংশ নিয়ে আহত হবে সে বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ নেই। এছাড়া হাসপাতালের রেকর্ডেও তার নাম পাওয়া যায়নি।
আহত জুলাইযোদ্ধা হিসেবে মো. রিফাত ইসলাম নামে একজন আবেদন করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে, আহত হওয়ার ঘটনায় তার কোনো মামলা হয়নি। রিফাত যে ছবিতে বাঁ হাতে আঘাতের কথা বলেছেন, সেটিতে তার মুখাবয়ব স্পষ্ট নয় এবং দালিলিক প্রমাণ নেই। আহত হওয়ার পর তিনি কোনো হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নেননি এবং আঘাত পাওয়ার ৮ থেকে ৯ দিন পরে কিছু চিকিৎসার জন্য ফার্মেসিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ফার্মেসিরও কোনো পরিচয় পাওয়া যায়নি। প্রায় এক বছর পরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার কথা জানা যায়। রিফাতের বিরুদ্ধে একটি মামলায় সাজা ভোগের তথ্যও আছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিফাত দাবির প্রেক্ষিতে জানিয়েছেন যে তিনি ছাত্র আন্দোলনে আহত হয়েছেন। কিন্তু কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। ডিসক্লোজারের হিসাবে রিফাত অন্য কারণে আহত হতে পারেন।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রালয়ের সূত্র জানান, জুলাই আন্দোলনে শহীদ মো. আরাফাত হুসাইন। গত বছর ১৫ জানুয়ারি জারি করা গেজেটের মধ্যে তার নাম ৮২৬ নম্বরে রয়েছে। কিন্তু নগরের আহত ব্যক্তির তালিকা সংযোজনের জন্য তিনি আবারও আবেদন করেন। তদন্তে দেখা গেছে, এ কারণে তার আবেদন বাতিল করা হয়েছে।
আবেদন যাচাই করতে গিয়ে রাজনৈতিক চাপ ও সামাজিক চাপ সহকারে নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে কর্মকর্তারা, তাই এসবি ও পিবিআই দিয়ে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তদন্তে অংশ নেওয়া একটি গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, নতুন আবেদনগুলোর মধ্যে সংখ্যা বেশি ঢাকা বিভাগ থেকে এসেছে। ঢাকা বিভাগ থেকে ৫৮২টি আবেদনের মধ্যে ঢাকা জেলা থেকে ৩৩৯টি করা হয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে সবচেয়ে কম আবেদন ৫টি করা হয়েছে।
তদন্তের সাথে যুক্ত কর্মকর্তারা যাচাইয়ের সময় আবেদনকারীর পরিচয়, ঠিকানা, পেশা, এনআইডি/জন্মনিবন্ধন, গেজেটভুক্ত হওয়ার পূর্বের তথ্য, আহত বা শহীদ দাবির ক্ষেত্রে মামলা ও তার অবস্থান, সাক্ষী, ছবি-ভিডিও, খবর ও অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন। পাশাপাশি চিকিৎসার সময়, চিকিৎসাপত্র, চিকিৎসকের বক্তব্য এবং ঘটনার ভিডিও, অডিও, ছবি বা সামাজিক মাধ্যমে থাকা আলোচনা যাচাই করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে যে তালিকা পাওয়া গেছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। যাদের আবেদনপত্রের তথ্যে অসংগতি পাওয়া গেছে, সেগুলো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে এবং মন্ত্রণালয় সেগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত সোমবার অবধি জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ৮৪৩ জন শহীদ এবং গুরুতর আহত (ক শ্রেণি) ৯৯০ জন, গুরুতর আহত (খ শ্রেণি) ১,৪১৭ জন ও আহত (গ শ্রেণি) ১১,৯৬৩ জন জুলাইযোদ্ধার গেজেট প্রকাশ হয়েছে। স্বীকৃত আহতদের মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি এবং ময়মনসিংহে সবচেয়ে কম।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রত্যেক শহীদ পরিবারকে ৩০ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে এককালীন দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ১০ লাখ টাকা ইতিমধ্যে দেয়া হয়েছে এবং আরো ২০ লাখ টাকার অব্যহতি চলছে। এছাড়া প্রতিমাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন শহীদের পরিবার। ঢাকায় তাদের জন্য ফ্ল্যাট দেওয়ার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। আহতদের জন্য ক শ্রেণির জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা এককালীন, খ শ্রেণির জন্য তিন লাখ টাকা এককালীন এবং গ শ্রেণির জন্য এক লাখ টাকা এককালীন সহায়তা করে মাসিক দশ হাজার টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের জন্য প্রশিক্ষণের সুযোগও রয়েছে।
এদিকে, জুলাইযোদ্ধার তালিকা নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে যে, ৫ আগস্টের আগের সড়ক দুর্ঘটনায় বা পরে মারা যাওয়া ব্যক্তিও তালিকায় নথিভুক্ত হয়েছেন। নতুন আবেদনকারীদের চাপের কারণে পুরো আবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, সুবিধা পাওয়ার আশায় অনেকেই অন্য কারণে আহত হয়ে তালিকাভুক্তের চেষ্টা করছেন। তবে, এখনও অনেক প্রকৃত জুলাইযোদ্ধা তালিকার বাইরে রয়েছেন। তদন্তে দেখা গেছে, ভুয়া আবেদনকারীদের পাশাপাশি প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের শনাক্ত করার কাজ সহজ হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন জানান, নতুন আবেদনকারীদের তথ্য যাচাই-বাছাই করে গেজেটভুক্ত করা হবে। গেজেট প্রকাশের পর যেন কোনো বিতর্ক না ওঠে, প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদেরকেই গেজেটভুক্ত হতে হবে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন