প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সিরিয়ায় সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির বিষয়ে তুরস্কের পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ইয়েখিয়েল লেইটার জানায়, তুরস্ক সিরিয়ায় তাদের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে—এমন গোয়েন্দা তথ্য ইসরায়েলের হাতে এসেছে।
লেইটার দাবি করেছেন, তুরস্কের এই পদক্ষেপটি ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে একটি সমঝোতার ‘রেড লাইন’ বা সীমা অতিক্রম করেছে।
বৃহস্পতিবার দ্য জেরুজালেম পোস্টকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে লেইটার এসব কথা বলেন। তিনি জানান, ইসরায়েল তুরস্ক কিংবা সিরিয়ার সাথে উত্তেজনা বা যুদ্ধ চায় না। তবে তিনি জানান, তুরস্কের সামরিক তৎপরতা নিয়ে ইসরায়েল আগেই সতর্কবাণী দিয়েছিল।
লেইটারের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই সতর্কবার্তার কোনো সাড়া না পাওয়ার পর ইসরায়েল সিরিয়ায় হামলার সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়া, তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমরা তুরস্ক বা সিরিয়া, কারও সঙ্গে উত্তেজনা বা যুদ্ধ চাইছি না। কিন্তু একটি রেড লাইন অতিক্রম করা হয়েছে।’
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বুধবার বলেছেন, ‘ইসরায়েল বার্তাটি স্পষ্ট করে দিয়েছে: আর নয়।’ এর আগে, মঙ্গলবার সিরিয়ার আলেপ্পোর কাছে আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। সিরিয়ার কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিমানঘাঁটিতে অন্তত আটবার হামলা চালানো হয়েছে এবং পরে উপগ্রহের ছবিতে বিমানঘাঁটির রানওয়েতে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা যায়।
লেইটার দাবি করেন, তুরস্কের সামরিক পদক্ষেপটি ইসরায়েল ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার প্রশাসনের মধ্যে হওয়া একটি সমঝোতার বিরোধী। এই সমঝোতার মূল বিষয় ছিল সিরিয়ায় সামরিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রাখা। দ্য জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্যারিসে এক বৈঠকের মাধ্যমে এই সমঝোতা আবারও নিশ্চিত করা হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি, যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়া বিষয়ক দূত টম ব্যারাক, ইয়েখিয়েল লেইটার, তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান গিল রাইখ এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সামরিক সচিব রোমান গোফম্যান, যিনি বর্তমানে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের পরিচালক।
অন্যদিকে, লেইটার বলেন, ‘অপরিবর্তিত রাখা’ মানে হলো, তুরস্ক তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবে না এবং ইসরায়েলও তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবে না। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, তুরস্ক ইসরায়েলকে তাদের অবস্থান থেকে সরে যেতে বাধ্য করবে না। সিরিয়ায় ইসরায়েল ও তুরস্কের সামরিক উপস্থিতির মধ্যে বড় পার্থক্য তুলে ধরেছেন তিনি। ইসরায়েল মাত্র ৭৮ বর্গমাইল এলাকায় একটি নিরাপত্তা অঞ্চলের মধ্যে অবস্থান করছে, অপরদিকে, গত কয়েক বছরে তুরস্ক উত্তর সিরিয়ার প্রায় ৩ হাজার ৫০০ বর্গমাইল এলাকা ধীরে ধীরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
এছাড়া, লেইটারের মতে, তুরস্কের এই উপস্থিতি বাড়ানোর নতুন পরিকল্পনাই ইসরায়েলের উদ্বেগের মূল কারণ। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়া বিষয়ক দূত ও তুরস্কে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাক ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলার নিন্দা করেননি। লেইটার জানিয়েছেন, কারণ হচ্ছে, আগের সমঝোতার ভিত্তিতে সিরিয়ায় পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের নীতি। এ কারণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইসরায়েলি হামলার নিন্দা করেননি বলে মনে করেছেন তিনি।
লেইটার বলেন, তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়লেও সিরিয়া ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন সংঘাতে যেতে চায় না। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে এটা স্পষ্ট যে সিরীয়রা আমাদের সঙ্গে সংঘাতে যেতে চায় না।’ লেইটারের দাবি, তুরস্কের পরিকল্পিত কিছু পদক্ষেপ সিরিয়ার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। এখানে ইসরায়েল তুরস্ককে এমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে, যা নতুন সংঘাত তৈরি করতে পারে। হামলার পর তুরস্ক ও সিরিয়ার বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
তিনি জানান, সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি স্বীকার করেছেন যে ইসরায়েলি হামলার কয়েক দিন আগে তুরস্কের একটি প্রতিনিধিদল সিরিয়ায় গিয়েছিল, তবে তুরস্কের পক্ষ থেকে এ ধরনের সফরের বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে। লেইটার বলেন, এই বিষয়ে তুরস্ক ও সিরিয়ার নিজেদের মধ্যেই সমাধান করা উচিত।
উত্তেজনা বাড়লেও উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরি হলে সিরিয়ার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা আবার শুরু করতে ইসরায়েল প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন লেইটার। তিনি বলেন, আগে সিরিয়ার সঙ্গে যে সরাসরি আলোচনা হয়েছিল, ইসরায়েল তা আবার চালু করতে চায়। তার মতে, দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পথ খোলা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্কের সঙ্গেও আলোচনা করতে ইসরায়েল প্রস্তুত, তবে তিনি একই সঙ্গে তুর্কি শীর্ষ নেতাদের ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন। লেইটার বলেন, ইসরায়েল তুরস্কের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত। কিন্তু, তুরস্কের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে মেনে না নেওয়ার মনোভাব রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
লেইটার তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের বিভিন্ন ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্য এবং দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের ‘ইসরায়েল মানবতার জন্য একটি কলঙ্ক’ মন্তব্যের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি আরো অভিযোগ করেন, তুরস্ক হামাসের নেতাদের আশ্রয় দিচ্ছে এবং হিজবুল্লাহ ও হামাসকে অর্থ সহায়তা দিচ্ছে, যা ইসরায়েল মনে করে এই সংগঠনগুলো ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। লেইটারের মতে, এমন পরিস্থিতিতে লেবানন ও সিরিয়ায় তুরস্কের প্রভাব বাড়ানোকে ইসরায়েল ভালোভাবে দেখছে না। তিনি বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে এমন কোনো শক্তি হতে পারে না।
তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে, সম্পূর্ণভাবে দরজা বন্ধ করতে চান না লেইটার। তিনি বলেন, কয়েক দশক আগে ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে যে সম্পর্ক ছিল, তা আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে তিনি সেটি চান। তিনি জানান, অতীতে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের প্রভাবকে ইতিবাচকভাবে দেখত। কিন্তু যখন তুরস্ক ইসরায়েলের অভিযোগ অনুযায়ী হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিচ্ছে, তখন এই অঞ্চলে আঙ্কারার সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোকে ইসরায়েল যুক্তিসংগত মনে করছে না।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন