প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশের প্রধান পর্যটন শহর কক্সবাজারে যানজট ও জনদুর্ভোগ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহরের প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি—সবখানেই বেড়েছে ব্যাটারিচালিত টমটম ও মিশুকের সংখ্যা। স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরে সাড়ে তিন হাজার টমটমের লাইসেন্স থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে চলাচল করছে ১০ হাজারের বেশি। এছাড়া, লাইসেন্স ও বৈধ অনুমোদন ছাড়াই দুই হাজারের বেশি মিশুক চলাচল করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে চার লাখের বেশি শহরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং পর্যটকদেরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
কক্সবাজার শহরের সড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ বাড়লেও সড়কের ধারণক্ষমতা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ নগরবাসীর। বিশেষ করে শহরের ব্যস্ততম সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে টমটম-মিশুকের অবাধ চলাচল, যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা এবং যানবাহনের জটলা যানজটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী, পথচারী ও পর্যটকদের সময় নষ্ট হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরে সাড়ে তিন হাজার টমটমের অনুমোদন থাকার পরও বর্তমানে চলাচলকারী টমটমের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ অনুমোদিত সংখ্যার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি যানবাহন সড়কে নামায় যানজট নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। অনুমোদিত ও বাস্তবে চলাচলকারী যানবাহনের সঠিক সংখ্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নেই বলে জানা গেছে।
এছাড়া, ব্যাটারিচালিত মিশুকের অনিয়ন্ত্রিত সংখ্যা যুক্ত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দুই হাজারের বেশি মিশুক বৈধ লাইসেন্স বা অনুমোদন ছাড়াই শহরের সড়কে চলাচল করছে। এসব যানবাহনের নিবন্ধন, চলাচলের অনুমতি এবং চালকদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নগরবাসীর আশঙ্কা, যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পর্যটন মৌসুমে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। এতে পর্যটন শহরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন চলাচল আরও দুর্বিষহ হয়ে পড়তে পারে।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—অনুমোদনহীন মিশুকের গায়ে নম্বরসংবলিত স্টিকার ব্যবহার। স্থানীয়দের প্রশ্ন, বৈধ অনুমোদন না থাকলে এসব যানবাহন কীভাবে নম্বরযুক্ত স্টিকার পাচ্ছে? কারা এসব স্টিকার সরবরাহ করছে এবং কোন কর্তৃত্বে তা ব্যবহার করা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। একটি লোভিচক্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ম্যনেজ করে এই কাজ করছে।
কয়েকজন মিশুকচালকের দাবি, মালিক সমিতির পক্ষ থেকে এক হাজার টাকার বিনিময়ে তাঁদের এসব স্টিকার দেওয়া হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, গাড়িতে নম্বরসংবলিত স্টিকার থাকলে পুলিশ আর আটকায় না বলে তাঁদের জানানো হয়েছে।
এক মিশুকচালক বলেন, “মালিক সমিতির পক্ষ থেকে আমাদের স্টিকার দেওয়া হয়েছে। এই নম্বর থাকলে পুলিশ ধরে না বলে আমাদের জানানো হয়েছে।”
তবে স্টিকার সরবরাহ, অর্থ আদায় কিংবা স্টিকার ব্যবহারের কারণে পুলিশি বাধা এড়ানোর এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। স্টিকার থাকলেই কোনো যানবাহন বৈধ হয়ে যায় কি না, সেটিও স্পষ্ট করা জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
এরই মধ্যে শহরে নতুন করে আরও দুই হাজার মিশুকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগের খবর ছড়িয়ে পড়ায় জনমনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিদ্যমান যানবাহনের সংখ্যা, সড়কের ধারণক্ষমতা এবং যানজটের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা না করে নতুন করে অনুমোদন দেওয়া হলে সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নগরবাসী।
তাঁদের মতে, নতুন অনুমোদনের আগে বর্তমানে চলাচলকারী টমটম ও মিশুকের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ, বিদ্যমান লাইসেন্স ও অনুমোদনের তালিকা যাচাই এবং অবৈধ যানবাহন শনাক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নতুন করে লাইসেন্স দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়ে থাকলে তার নীতিমালা, যৌক্তিকতা ও সম্ভাব্য প্রভাব জনসমক্ষে পরিষ্কার করা উচিত।
অবৈধ মিশুক চলাচলকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, চাঁদমিয়া নামের এক ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি চক্র এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, পৌরসভা কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিত উদ্যোগ নিলে পর্যটন শহরে অবৈধ যান চলাচল কিভাবে সম্ভব?
টমটম-মিশুকের আধিক্যে শুধু যানজটই বাড়ছে না, পথচারীদের চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে যানবাহনের জটলা, অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং যাত্রী ওঠানামার কারণে রাস্তা পার হতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। ব্যস্ত সড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে।
এক পথচারী বলেন, “রাস্তায় টমটম ও মিশুকের সংখ্যা অনেক বেশি। আমরা ঠিকমতো চলাচল করতে পারি না, রাস্তা পার হতেও ভোগান্তিতে পড়তে হয়। শহরের সড়কগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি।”
স্থানীয়দের মতে, কক্সবাজারের মতো পর্যটননির্ভর শহরে সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। পর্যটকেরা শহরে প্রবেশের পর বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র, হোটেল-মোটেল ও বিপণিবিতানে যাতায়াত করেন। কিন্তু যানজটের কারণে তাঁদের সময় নষ্ট হলে পর্যটনসেবার মান নিয়েও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে জেলা ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবজ্যোতি মজুমদার জানান, টমটম ও মিশুকের বিরুদ্ধে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তি পর্যায়ে কিংবা সংঘবদ্ধভাবে যেভাবেই এসব যানবাহন চলাচল করুক না কেন, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে বলে তিনি জানান।
তবে নগরবাসীর প্রশ্ন, নিয়মিত অভিযান ও আইন প্রয়োগের পরও যদি অনুমোদনহীন যানবাহনের সংখ্যা বাড়তে থাকে, তাহলে সেগুলো নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও স্থায়ী পদক্ষেপ কোথায়? শুধু সড়কে অভিযান চালানো নয়, অবৈধ যানবাহনের উৎস, স্টিকার সরবরাহের প্রক্রিয়া এবং অনুমোদন ব্যবস্থার স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
কক্সবাজারকে যানজটমুক্ত, পর্যটনবান্ধব ও বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে টমটম-মিশুকের সংখ্যা নির্ধারণ, বৈধ যানবাহনের তালিকা প্রকাশ, অনুমোদনহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান এবং অবৈধ স্টিকার সরবরাহের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।
একই সঙ্গে যানবাহন চলাচলের নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা বন্ধ এবং নতুন লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
তাঁদের মতে, যানজট নিরসনে শুধু চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না; যানবাহনের অনুমোদন, মালিকানা, চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির পুরো ব্যবস্থাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
প্রশ্ন উঠেছে—পর্যটন শহর কক্সবাজারের সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে কবে? অনুমোদিত যানবাহনের সংখ্যা ও বাস্তবে চলাচলকারী গাড়ির মধ্যে এত বড় ব্যবধানের অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে কীভাবে? অবৈধ যানবাহনের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে জনদুর্ভোগ কমাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেয় কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছেন শহরবাসী।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন