প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (এইচএসআইএ) এর তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য বিশ্বের পাঁচটি শীর্ষস্থানীয় বিমানবন্দর সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে, যা বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে মনে করা হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের লক্ষ্যের প্রতি ক্রমবর্ধমান বৈশিক আস্থারই প্রতিফলন।
স্বাধীনতার পর এই প্রথম বারের মতো বিশ্বখ্যাত বিমানবন্দর সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং খাতে প্রবেশ করার জন্য আগ্রহ দেখাচ্ছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) যখন তৃতীয় টার্মিনালে যাত্রী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য দ্বিতীয় অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে যায়, ঠিক তখন থেকেই এই আগ্রহ প্রকাশ হতে শুরু করে।
আলোচনার সাথে যুক্ত বেবিচকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, যাত্রীসেবা সংশ্লিষ্ট গ্রাউন্ড সার্ভিসের জন্য একজন দ্বিতীয় অপারেটর নিয়োগ করা হবে। তবে নতুন টার্মিনালের কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাছে থাকবে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, 'দ্বিতীয় হ্যান্ডলারের কাজ শুধুমাত্র যাত্রী ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব এককভাবে বিমানই পালন করবে।'
খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এই অগ্রগতিকে বাংলাদেশের সম্প্রসারণশীল এভিয়েশন শিল্পের জন্য একটি শক্তিশালী স্বীকৃতি হিসেবে দেখতে পাচ্ছেন। ক্রমাগত যাত্রী বৃদ্ধি, বড় ধরনের অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এই খাতের মূল চালিকাশক্তি বলে উল্লেখ করেছেন তারা।
আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের মেনজিস এভিয়েশন, সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট, তুরস্কের চেলেবি এভিয়েশন হোল্ডিং, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) এমিরেটস গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ডনাতা এবং সিঙ্গাপুরের স্যাটস অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই সবগুলো প্রতিষ্ঠানই বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত বিমানবন্দর সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অবসরপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ মাফিদুর রহমান বলেন, একসাথে এতগুলো আন্তর্জাতিক এভিয়েশন কোম্পানির আগ্রহ দেখানোর বিষয়টি বাংলাদেশে বিরল। এটি দক্ষিণ এশিয়ার এভিয়েশন খাতে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বকে প্রমাণ করে।
কূটনৈতিক তৎপরতায় আস্থার প্রতিফলন
সম্প্রতি মাসগুলোতে যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূতরা বাংলাদেশের এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করেছেন। সেখানে তারা নিজ নিজ দেশের কোম্পানির আগ্রহের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন।
মাফিদুর রহমান বলেন, 'এই কূটনৈতিক তৎপরতা প্রমাণ করে, বাংলাদেশের সম্প্রসারণশীল এভিয়েশন বাজারকে বিশ্ব কতটা বাণিজ্যিক গুরুত্ব দিচ্ছে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার ওপর আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কতটা আস্থা রয়েছে।'
তৃতীয় টার্মিনালের এই সিদ্ধান্তটি একটি বড় পরিবর্তনকে নির্দেশ করছে। কারণ, গত কয়েক দশক ধরে যাত্রী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের একক দায়িত্ব ছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের। বর্তমানে সেখানে প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের মধ্যে উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, লাগেজ ব্যবস্থাপনা, যাত্রী চেক-ইন, র্যাম্প অপারেশন এবং উড়োজাহাজ অবতরণের পর পুনরায় ওড়ার উপযোগী করার প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব সেবা সরাসরি বিমানবন্দরের পরিচালন দক্ষতা এবং যাত্রী সেবার মানের ওপর প্রভাব ফেলে।
বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এই খাতে আরো বেশি প্রতিযোগিতার দাবি জানিয়ে আসছিল। তাদের মতে, এর ফলে সেবার মান উন্নত হবে, উড়োজাহাজ প্রস্তুত করার সময় কমবে এবং বাংলাদেশের বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানের সমপর্যায়ে পৌঁছাবে।
নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এয়ারলাইন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ছেন।
তিনি বলেন, 'আমি মনে করি, বিষয়টি আরও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা দরকার, এমনকি এটি পরের ধাপে করা হলেও চলতো। তবে আপাতত যাত্রী সেবা হ্যান্ডলিংয়ে অন্তত প্রতিযোগিতা শুরু হচ্ছে দেখে আমি আনন্দিত।'
বিশিষ্ট এভিয়েশন উদ্যোক্তা এবং টাস এভিয়েশন গ্রুপের চেয়ারম্যান কে এম মুজিবুল হকও এই বৈশ্বিক আগ্রহকে একটি ইতিবাচক দিক বলে মনে করছেন।
তিনি বলেন, 'কার্গো ভিলেজ এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং-উভয় কার্যক্রমই আন্তর্জাতিকভাবে অভিজ্ঞ অপারেটরদের দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত।'
তিনি আরও বলেন, 'মালিকানা সরকারের কাছেই থাকতে পারে, তবে পরিচালনার দায়িত্ব অভিজ্ঞ এবং দক্ষ বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত। পেশাদার অপারেটররা দক্ষতা, নিরাপত্তা, নিয়ম-কানুন মেনে চলা এবং সেবার মান বাড়াতে পারে। একইসাথে তারা স্থানীয় জনশক্তিকেও এ বিষয়ে দক্ষ করে তুলতে পারবে।'
যাত্রী হ্যান্ডলিংয়ে প্রতিযোগিতাকে স্বাগত জানালেও, তৃতীয় টার্মিনালের স্বয়ংক্রিয় কার্গো ভিলেজে বিমানকে একমাত্র কার্গো হ্যান্ডলার হিসেবে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
মফিজুর রহমান বলেন, 'বিমানের কার্গো হ্যান্ডলিং আন্তর্জাতিক মানের কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। এর সক্ষমতা এবং সততা-উভয় বিষয়েই গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে।'
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান মাফিদুর রহমানও মনে করেন, টার্মিনালের উন্নত কার্গো সিস্টেমের সর্বোচ্চ সুফল পেতে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেয়া যেতে পারে।
তিনি বলেন, 'যেসব যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছে তা অত্যন্ত আধুনিক এবং এগুলো পরিচালনার জন্য অভিজ্ঞ অপারেটরের প্রয়োজন।'
তিনি আরও বলেন, 'শুরুতেই বিমানের পাশাপাশি একজন অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক অপারেটর কাজ করলে ভালো হতো। এতে করে পুরোপুরি স্থানীয়ভাবে পরিচালনার আগে আমাদের জনবল কাজগুলো শিখে নিতে পারতো।'
তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, 'হতাশ হওয়ার কিছু নেই। দক্ষ পেশাদারদের সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে এভিয়েশন খাত নতুন গতি পাবে।'
বিমানের আত্মবিশ্বাস
বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম জানান, বিমান ইতোমধ্যেই প্রয়োজনীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করেছে এবং তৃতীয় টার্মিনালের জন্য আরও এক হাজারের বেশি অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ করেছে।
তিনি বলেন, 'আমরা তৃতীয় টার্মিনালে যাত্রী ও কার্গো হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।'
তিনি আরও জানান, বিমান কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থার বিষয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে কাজ করছে। তবে দ্বিতীয় যাত্রী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার নিয়োগের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি তারা পাননি।
চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পর জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, নিপ্পন কোয়েই এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট কর্পোরেশন সমন্বয়ে গঠিত একটি জাপানি কনসোর্টিয়াম হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন