প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বরগুনায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির অর্থায়নে নির্মিত এক কোটি ৪০ লাখ টাকার বেড়িবাঁধ দুই মাসের মাথায় ধসে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তদারকির অভাবের কারণে এই ধসের ঘটনা ঘটেছে। তবে স্থানীয় অধিবাসী ও সংশ্লিষ্টরা বাস্তবায়ন সহযোগী বেসরকারি সংস্থা জাগো নারীকে দায়ী করছেন।
জাগো নারী অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ঠিকাদারদের দাবি, নকশায় ত্রুটি থাকার কারণে এই ঘটনা ঘটেছে। উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের খাকদোন নদী তীরবর্তী পোটকাখালী আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমনে নির্মিত হয় এই রিং বেড়িবাঁধ। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির অর্থায়নে এ কাজে ব্যয় হয় এক কোটি ৪০ লাখ টাকা। স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা জাগো নারী এই কাজের বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেছে। স্থানীয়দের দাবি, যথাযথ তদারকির অভাবে বেড়িবাঁধ ও গাইড ওয়াল ধসে পড়েছে।
এছাড়াও, বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য ৪০ শতাংশ মাটি দূর থেকে আনার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। স্থানীয়রা জানান, বাঁধের পাশের খাল খনন করে বেড়িবাঁধে মাটি দেয়া হয়েছে, যার ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে বাঁধ ও গাইড ওয়াল খালে ধসে পড়েছে। ৬৫০ মিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের কথা থাকলেও পরবর্তীতে ৬২৮ মিটার নির্মাণ করা হয়েছে। এর জন্য এলাকাবাসী জাগো নারীকে দুষছেন।
পোটকাখালী আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা আল-আমিন বলেন, “গাইড ওয়াল পুরোটা যদি ভালোভাবে করত তাহলে ধসে পড়তো না। বেড়িবাঁধ খুব নরমালভাবে করা হয়েছে, তাই পুরোটাই ধসে গেছে। নরম মাটি বেড়িবাঁধে দেয়া হয়েছে। নরম মাটির পরিবর্তে যদি শক্ত মাটি দিতো তাহলে বেড়িবাঁধ টেকসই হতো।”
মো. নান্নু নামে আরেক বাসিন্দা মন্তব্য করেন, “বেড়িবাঁধের কাজে যদি কর্তৃপক্ষ শক্তভাবে চেক দিত তাহলে কাজ ভালো হতো। এ কাজ করিয়েছে জাগো নারী। কাজ সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদারকে জাগো নারীর চেক দেয়ার কথা, কিন্তু তা দেয়নি। জাগো নারী চেক দেয়নি বলে বাঁধের কাজ খারাপ হয়েছে, তাই ভেঙে গেছে।”
মো. বাবুল খান নামে অপর আরেক বাসিন্দা বলেন, “বেড়িবাঁধের মাটি খাল থেকে ভেকু দিয়ে তোলা হয়েছে। খালে গর্ত করার কথা ছিল না। দূর থেকে মাটি এনে বেড়িবাঁধে দেয়ার কথা ছিল। খাল থেকে গর্ত করে মাটি উঠানোর কারণে সাপোর্ট না পেয়ে গাইড ওয়াল এবং বেড়িবাঁধ ভেঙে খালে পড়েছে।”
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা নাসিমা বলেন, “ভাটায় যখন খাল শুকিয়ে গেছে, তখন খালের মুখে বাঁধ দিয়ে খাল থেকে ভেকু দিয়ে মাটি তুলে বেড়িবাঁধে দেয়া হয়েছে। এভাবে বেড়িবাঁধ নির্মাণের কারণে আমরা যারা বেড়িবাঁধের পাশে বসবাস করছি, তাদের ঘর বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যায়। পানি যাওয়ার এখন আর কোনো জায়গা নেই। দেড় কোটি টাকার কাজ হয়েছে। কিন্তু পানি নামার কোনো পথ রাখা হয়নি। এখানে ড্রেন নির্মাণ করার দরকার ছিল। ড্রেন করা হলে পানি ড্রেন দিয়ে নেমে যেত।”
ঢলুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মো. মনিরুজ্জামান বাবুল মোল্লা বলেন, “বেড়িবাঁধ নির্মাণ নিয়ে জাগো নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। বেড়িবাঁধ নির্মাণে যে টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, তা দিয়ে ওইরকম বেড়িবাঁধ তিনটা করা যায়। মূলত সমস্ত টাকা ব্যয় না করে তিন ভাগের দুই ভাগ আত্মসাৎ করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে জাগো নারীর প্রধান নির্বাহী হোসেন-আরা হাসি বলেন, “বিশ্বাস খাদ্য কর্মসূচি (ডাব্লিউএফপি) আমাদের মাধ্যমে অর্থ প্রাপ্তির চ্যানেল করে দিয়েছে। কাজটি ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে হবে। টাকা সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদে দেয়া হয়েছে। কাজটির জন্য একটি টিম করা ছিল। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এই কমিটির সভাপতি ছিলেন। তার সঙ্গে এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ছিল। কাজ তারা বাস্তবায়ন করেছে। তারা কাজের মান দেখে রিপোর্ট দিয়েছে তারপর ইউনিয়ন পরিষদ টাকা দিয়েছে।”
তবে কাজের মানের প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “আমিতো ইঞ্জিনিয়ার না। এটা ইঞ্জিনিয়াররা চেক করবে। এগুলোর সব দায়িত্ব উপজেলা পরিষদ এবং ইঞ্জিনিয়ারদের। তবে কাজের মান অবশ্যই ভালো ছিল।”
কাজে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদার মোস্তফা জামান মিল্টন বলেন, “ডিজাইনে বেড়িবাঁধের শ্লোপ ১:৩ না দিয়ে ১:২ দেয়া হয়েছে। এজন্য বৃষ্টির পানি ফাঁকে ঢুকে কিছু অংশ খালে নেমে গেছে। বর্ষা মৌসুম শেষ হলে ভাঙা অংশ মেরামত করে দেয়া হবে।”
বরগুনা সদর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, “জাগো নারী আমাদের জানিয়েছে, এই কাজটি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বাস্তবায়ন হবে। আমি তাদের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেছি। কিন্তু কাজের গুণগত মান কিংবা প্লান অনুযায়ী কাজ হয়েছে কিনা এ সম্পর্কে জানি না। সাইনবোর্ডে বাস্তবায়নে আমাদের দফতরের নাম ব্যবহার করা হলেও, এ সম্পর্কে আমি আদৌ জানি না।”
তিনি আরও বলেন, “প্রকল্পটি ভিজিট করার জন্য আমাকে কখনো নেয়া হয়নি। এ সম্পর্কে আমার আদৌ ধারণা ছিল না। আর যেহেতু জাগো নারী কাজটা করেছে, এর দায়ভার তাদের ওপর বর্তায়। এটা তো কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজ না যে সরকার এটার দায়ভার নেবে।”
এ বিষয়ে এলজিইডির বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান বলেন, “রিং বেড়িবাঁধের বিষয়টি আমার নলেজে এসেছে। শুধুমাত্র প্রাক্কলন তৈরির সঙ্গে সদর উপজেলা প্রকৌশলী এবং তার দফতরের লোকজন জড়িত। এ ছাড়া কাজ বাস্তবায়নের কোনো পর্যায়েই এলজিইডির কোনো কর্মকর্তা জড়িত ছিল না।”
তিনি বলেন, “কাগজে-কলমে দফতরের নাম যে কেউ লিখতে পারেন। তবে কাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমাদের দফতরের কোনো লোকজন ডাকা হয়নি এবং আমাদের কাছ থেকে কোনো ক্লিয়ারেন্স নেয়া হয়নি। কোনো ধাপেই আমরা জড়িত ছিলাম না।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল হান্নান প্রধান বলেন, “পোটকাখালীতে আমাদের বেড়িবাঁধের বাইরে কিছু বসতি রয়েছে। সেখানকার মানুষদের সুরক্ষার জন্য একটি বেসরকারি সংস্থা কাজ করেছে বলে আমরা জেনেছি। আসলে আমাদের কাছে যদি কোন টেকনিক্যাল সাপোর্ট চাওয়া হতো, তা দিতাম এবং এখনও দিতে রাজি আছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের কাছ থেকে কোন সাপোর্ট কেউ ওইখানে নেয়নি। তাই এ বিষয়ে সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত বলতেও পারছি না।
ঢলুয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নং ওয়ার্ডের সদস্য ও ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য মো. জিয়া মোল্লা বলেন, “বেড়িবাঁধের সব জাগো নারী করছে। পরিষদ কিছু জানে না। টোটালি পরিষদ জানে না। কিন্তু পরিষদের মাধ্যমে টাকা লেনদেন হয়েছে। সব জানে জাগো নারী।”
ঢলুয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, “সার্বিক তত্ত্বাবধানে জাগো নারী ছিল। এখন জাগো নারী যদি বলে- তারা কিছুই জানে না, তা হবে না। জাগো নারী তত্ত্বাবধানে ছিল, জাগো নারী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ছিল। জাগো নারী বিল ছাড় করার সময় আসছে। জাগো নারী সবসময় ছিল। এখন যদি তারা বলে- কিছুই জানি না, এটা ঠিক হয় না। আমার কাছে সবসময় জাগো নারী এসেছে। ঠিকাদার কখনোই আসেনি। জাগো নারীর মাধ্যমে এখানে সব কাজ হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ শুধু বিল ছাড় করেছে।”
বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “একটি বেড়িবাঁধ ভেঙে যাচ্ছে, সেটা অবশ্যই মেরামত যোগ্য। এটা মেরামত করবে বলেও আমরা জেনেছি। এর বাইরে কাজে অনিয়মের যে অভিযোগগুলো আপনার কাছে শুনলাম, এগুলো উপজেলা প্রশাসনের কাছে আসেনি।”
তিনি আরও বলেন, “বেড়িবাঁধ ভেঙেছে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা এসে পরিদর্শন করেছেন। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের কমিটি জানিয়েছে, ঠিকাদারের জামানতের মাধ্যমে এটা সংস্কার করা হবে। এ বিষয়ে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন