প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
করাচির উপকূলের একটি অঞ্চলে পেরেক ঠোকার সুরেলা শব্দ এবং করাতের ঘর্ষণের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সেখানে গ্রীষ্মের ফ্যাকাশে আকাশের নিচে বিশাল মাছ ধরার কাঠের নৌকার কাঠামোর ওপর ছোট ছোট মানুষের অবয়ব দেখা যাচ্ছে। তারা নৌকা নির্মাণের কাজে ব্যস্ত রয়েছে।
বন্দরনগরীর উপকণ্ঠের সামুদ্রিক জনপদ ইবরাহিম হায়দারি, যা কয়েক শতাব্দী পুরোনো বলে মনে করা হয়, ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার নৌকা নির্মাণের জন্য পরিচিত।
করাচি থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এই তথ্য জানায়।
স্থানীয় জেলেদের অধিকার নিয়ে কাজ করা পাকিস্তান ফিশারফোক ফোরামের মেহরান আলী শাহ মন্তব্য করেন, ‘এই এলাকাই করাচির জন্ম দিয়েছে। করাচির মৎস্য খাতও এখান থেকেই গড়ে উঠেছে।’
যদিও শিল্পভিত্তিক জাহাজ নির্মাণের প্রসার ঘটেছে, তবে কাঠের টুকরো জোড়া দিয়ে হাতে নৌকা তৈরির এই ঐতিহ্য এখনও টিকে রয়েছে।
নৌকা নির্মাতা ২২ বছর বয়সী মুহাম্মদ আসিফ কিশোর বয়সে বাবার কাছ থেকে এই কাজ শেখেন। এখন তিনি নিজেই নৌকা তৈরি করতে সক্ষম হওয়ায় গর্বিত।
মুখে এবং রোদে বিবর্ণ চুলে কাঠের গুঁড়ো লেগে থাকা অবস্থায় আসিফ এএফপিকে বলেন, ‘এই কাজের প্রতি আমার আগ্রহ ছিল। তাই আমি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি সবসময়ই আমার আগ্রহের বিষয় ছিল। তাই আমি এই পেশা বেছে নিয়েছি।’
অন্য শ্রমিকদের মতো আসিফও প্রতিদিন সকাল ৭টায় কাজে আসেন এবং রাত ৭টার দিকে রাতের খাবারের জন্য বাড়ি ফেরেন।
দুপুরে দুই ঘণ্টার খাবারের বিরতি ছাড়া তিনি কাজের সরঞ্জাম হাতছাড়া করেন না।
সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করে তিনি দিনে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ পাকিস্তানি রুপি (৯ ডলার) আয় করেন।
সারা বছরই শ্রমিকদের প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করতে হয়। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্রতার পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমের প্রবল বৃষ্টিও তাদের সহ্য করতে হয়।
একজন জেলে প্রথমে নৌকার নকশা বেছে নেন। এরপর একজন দক্ষ কারিগর নকশার ছাঁচ তৈরি করেন। সেখান থেকে শ্রমিকরা কাজ শুরু করেন। বছরের পর বছর অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তারা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে এই নৌকা তৈরি করেন।
কারিগররা বিভিন্ন ধরনের কাঠ বেছে নেন, যার মধ্যে স্থানীয় ইউক্যালিপটাস কাঠ রয়েছে। সমুদ্রের পানির ক্ষয় প্রতিরোধে আফ্রিকান সেগুন কাঠও ব্যবহার করা হয়।
ভারী কাঠের টুকরোগুলো পুরোনো উল্লম্ব করাতসহ বিভিন্ন করাত দিয়ে হাতে আঁকা পেন্সিলের দাগ অনুসরণ করে সতর্কতার সঙ্গে কাটা হয়।
এরপর মাটি থেকে ধাপে ধাপে নৌকা তৈরি করা হয়। কাঠের টুকরো ও পেরেক একটির পর একটি বসিয়ে নৌকার কাঠামো দাঁড় করানো হয়। কাঠামো যত উঁচু হয়, শ্রমিকরা ততই নড়বড়ে মই বেয়ে ওপরে ওঠেন।
আসিফ বলেন, এই সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ায় কয়েক মিটার দীর্ঘ একটি ছোট নৌকাও তৈরি করতে তিন মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। খরচ হতে পারে ১০ লাখ পাকিস্তানি রুপি (৩ হাজার ৬০০ ডলার)।
নির্মাণকাজ শেষ হলে আঙিনাজুড়ে থাকা নৌকাগুলোতে রঙের ছোঁয়া দেন চিত্রশিল্পী মুহাম্মদ ইসমাইল।
৩৮ বছর বয়সী ইসমাইলের হাতে ও নখে নীল রঙের দাগ রয়েছে। রোদ-বৃষ্টিতে ক্ষয়প্রাপ্ত নৌকার কাঠামোয় তিনি ফুলের পাপড়ি আঁকছিলেন।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি এমন বহু নৌকায় কাজ করেছেন।
এএফপিকে তিনি বলেন, ‘আমাদের অধিকাংশ জেলে মাছের নকশার চেয়ে ফুলের নকশাই বেশি পছন্দ করেন।’
নৌকার মালিক তার আঁকা নকশার প্রশংসা করলে তিনি ‘খুবই তৃপ্তি’ পান বলেও জানান।
ইসমাইল আরও বলেন, ‘কেউ কেউ আমাকে নিজের ধারণা অনুযায়ী নকশা করতে বলেন। আবার কেউ কেউ ঠিক কী চান— তা আমাকে বলে দেন।’
কাছের একটি বন্দরে জেলে কাদির বক্স একটি ছোট নৌকায় বসে মাছ ধরার জাল মেরামত করছিলেন। নৌকাটি অন্তত দুই দশক ধরে তাদের পরিবারের মালিকানায় রয়েছে।
শিগগিরই কাঠের নৌকাটির সংস্কার করার আশা করছেন তিনি।
ইসমাইল বলেন, ‘এটি খুব মূল্যবান কোনো কিছুর যত্ন নেওয়ার মতো। এমনকি নিজের সন্তানের যত্ন নেওয়ার মতোও।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন