প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিনটি দেশের হাজারো শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের জন্য এক ভিন্ন ধরনের আবেগ, উৎকণ্ঠা এবং প্রত্যাশার দিন। কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জিত হলে পরিবারে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। তবে এর বিপরীত চিত্রও কম নয়।
যখন প্রত্যাশার চেয়ে ফল খারাপ হয় বা কাঙ্ক্ষিত জিপিএ না আসে, তখন মুহূর্তের মধ্যে পুরো পরিবারে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। অনেক সময় এই পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে অভিভাবকরাও দিশেহারা হয়ে পড়েন।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় এইচএসসি ফলাফলকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি এবং ভবিষ্যতের ক্যারিয়ারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সিঁড়ি হিসেবে দেখা হয়। ফল খারাপ হলে সামাজিক চাপ ও লজ্জার ভয়ে অনেক অভিভাবক অতিরিক্ত কঠোর হয়ে ওঠেন। অথচ এই সংকটময় মুহূর্তে বকাঝকা বা দোষারোপ না করে, সন্তানের জন্য পরিবারের মানসিক সমর্থন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
এইচএসসির ফল প্রকাশের পর যদি তা আশানুরূপ না হয়, তাহলে একজন অভিভাবক কীভাবে ইতিবাচকভাবে সন্তানের পাশে দাঁড়াতে পারেন, তা নিয়ে আজকের আলোচনা।
১. বকাঝকা ও নেতিবাচক মন্তব্য থেকে বিরত থাকুন
আমাদের সমাজে অনেক সময় রাগের মাথায় সন্তানকে বলা হয়—‘এত টাকা খরচ করে পড়ানোর ফল কী হলো!’ অথবা ‘তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না’। ফলাফল প্রত্যাশামতো না হলে সন্তান ইতিমধ্যেই এক ধরনের অপরাধবোধ ও মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। এর উপর এই ধরনের কটূক্তি বা অপমান তার আত্মবিশ্বাসকে সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দিতে পারে। মনে রাখতে হবে, ফল যা হওয়ার তা হয়ে গেছে; এখন বকাঝকা করলে ফলাফল পরিবর্তন হবে না, বরং সন্তান মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়বে।
২. অন্যের সন্তানের সঙ্গে তুলনা করা বন্ধ করুন
‘পাশের বাসার আন্টির ছেলে কত জিপিএ পেয়েছে, আর তুমি কী করলে!’—এই ধরনের তুলনা বাংলাদেশের পরিবারগুলোতে খুব পরিচিত। কিন্তু এই তুলনা সন্তানের মনে তীব্র হীনম্মন্যতা ও জেদ তৈরি করে, যা অনেক সময় মারাত্মক পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। প্রতিটি শিশুর মানসিক গঠন ও সামর্থ্য আলাদা। অন্যদের সঙ্গে তুলনা না করে বরং তার নিজের আগের ফলাফল বা ছোটখাটো ইতিবাচক দিকগুলোর প্রশংসা করুন।
৩. সন্তানের কথা মন দিয়ে শুনুন
সন্তান কেন খারাপ ফল করেছে, তার পেছনের কারণগুলো জানার চেষ্টা করুন। হতে পারে পরীক্ষার সময়ে সে অসুস্থ ছিল, পারিবারিক কোনো চাপ ছিল, কিংবা নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল। বিচার না করে তার কথা মন দিয়ে শুনুন। সে কী বলতে চাইছে, তা বোঝার চেষ্টা করুন। এতে সন্তানের ভেতরের জমে থাকা কষ্ট ও চাপ অনেকটা কমে আসবে।
৪. মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি কড়া নজর রাখুন
ফল প্রকাশের পর অনেক শিক্ষার্থী হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যায়, সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয় বা ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়গুলোকে অনেক সময় স্রেফ ‘অভিমান’ ভেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সন্তান একা থাকতে চাইছে মানেই তাকে একা ছেড়ে দেওয়া নয়; তার পাশে থাকুন, তাকে বোঝান যে জীবন কেবল একটি পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করে না। পরিস্থিতি বেশি জটিল মনে হলে প্রফেশনাল কাউন্সেলর বা চিকিৎসকের সাহায্য নিতে দ্বিধা করবেন না।
৫. বাস্তবসম্মত ও বিকল্প পরিকল্পনা করুন
সামনে কী করা যায়, তা নিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভাবুন। আমাদের দেশে জিপিএ-৫ বা কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলেই সব শেষ—এমন একটি ভ্রান্ত ধারণা সমাজজুড়ে বিদ্যমান। অথচ উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন বিকল্প পথ, অনার্সের নানা সাবজেক্ট, প্রফেশনাল কোর্স বা ডিগ্রি কলেজ—সব মিলিয়ে সুযোগের অভাব নেই। সন্তানের আগ্রহ ও সামর্থ্য অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপের রূপরেখা তৈরি করুন। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ শিক্ষক বা সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ নিন।
পরিশেষে, এইচএসসির ফলাফল জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ মাত্র, এটি পুরো জীবন নয়। ভালো ফল যেমন সামনে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা তৈরি করে, তেমনি আশানুরূপ ফল না পাওয়া মানে জীবন থেমে যাওয়া নয়। বরং এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে সন্তানের সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল হতে হবে তার পরিবারকে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন