প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পাকিস্তানের ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনসিসিআইএ) একটি আন্তর্জাতিক শিশু পর্নোগ্রাফি চক্রের সন্ধান পেয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এই চক্রের সঙ্গে জড়িত একজন ব্যক্তি, যিনি নিজের নাবালক সন্তানদের আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করে বিক্রি করতেন।
রবিবার ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এনসিসিআইএ-এর অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ শোয়েব খান জানান, পাকিস্তানের ইতিহাসে এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা, যেখানে একজন বাবা তাঁর সন্তানদের বিরুদ্ধে এ ধরনের জঘন্য অপরাধে জড়িত ছিলেন।
তিনি বলেন, “অভিযুক্ত ব্যক্তি তাঁর চার ও পাঁচ বছর বয়সী সন্তানদের আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করে তা বিক্রি করছিলেন। ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে টেলিগ্রামের গোপন গ্রুপে এসব ভিডিও বেচাকেনা হতো।” শোয়েব খান আরও জানান, উদ্ধারকৃত ভিডিওগুলোতে পশুপাখির ওপর নৃশংসতার চিত্রও দেখা গেছে। গ্যাংটির মূল হোতা স্কার্দু এলাকার বাসিন্দা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তদন্ত চলাকালে ইসলামাবাদ, মুলতান ও দক্ষিণ পাঞ্জাব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ও প্রমাণ উদ্ধার করা হয়েছে। চক্রটির অন্যান্য সহযোগীদের গ্রেপ্তার করতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে বলে তিনি জানান। শোয়েব খান বলেন, “এ ধরনের জঘন্য অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।”
আরেকটি পৃথক ঘটনার কথা উল্লেখ করে শোয়েব খান জানান, এক শিশুর মোবাইল থেকে পাওয়া প্রায় ৬০টি ভিডিও তদন্ত করে শিশু পর্নোগ্রাফি চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি জানান, প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তি ইনস্টাগ্রামে ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলত, টাকার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করত এবং পরে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে তা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করত। তিনি উল্লেখ করেন, ইতিপূর্বে এই একই অপরাধে দুই চীনা নাগরিককেও দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
অন্য একটি মামলার বিবরণ দিয়ে অতিরিক্ত পরিচালক জানান, করাচির এক নাবালিকা ধারাবাহিক যৌন হয়রানির শিকার হয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। মেয়েটি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ভুক্তভোগী পরিবারের সহায়তায় এনসিসিআইএ টিম মাত্র ১৩ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান আসামিকে ইসলামাবাদ থেকে সনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে। অভিযুক্ত ব্যক্তি গত ২-৩ বছর ধরে ওই মেয়েটিকে ক্রমাগত ব্ল্যাকমেইল ও হয়রানি করছিল। তিনি বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ন্যায়বিচার এনে দেওয়াই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। নারী ও শিশুদের প্রতি হয়রানির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “কোনো সংবেদনশীল বা আপত্তিকর বিষয় পোস্ট করার আগে ভাবুন। আইন সক্রিয় রয়েছে, ভুল বিষয়বস্তু আপলোড করে কেউ পার পাবে না।” নাগরিকদের ওটিপি, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ বা ব্যক্তিগত তথ্য কারো সঙ্গে শেয়ার না করার আহ্বান জানান তিনি। ভুয়া ওয়েবসাইট ও ভুয়া নম্বরে যোগাযোগ করে প্রতারিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “আপনি যদি সাইবার অপরাধের শিকার হন, তবে চুপ থাকবেন না; এনসিসিআইএ আপনার পাশে আছে।” অভিযোগের জন্য ২৪ ঘণ্টা চালু থাকা হেল্পলাইন ১৭৯৯-এ যোগাযোগের আহ্বান জানান তিনি।
নারী ও শিশু হয়রানির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি
এনসিসিআইএ-এর এক বিবৃতিতে জানানো হয়, সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেল (ডিজি) সৈয়দ আলী নাসির রিজভী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নাগরিকদের, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের হয়রানিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
ডিজি একটি বৈঠকে এই নির্দেশ দেন, যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি পরিচালক আতিফ আব্বাস, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনচার্জ তাইয়্যেবা দৌলত এবং জনসংযোগ কর্মকর্তা মাহবুব এলাহী উপস্থিত ছিলেন। সেখানে সাইবার অপরাধ দমন, ভুয়া তথ্য রোধ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
ডিজি নির্দেশ দেন যে ভুয়া তথ্য ছড়ানো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো এবং জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী অ্যাকাউন্টগুলোর ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যহীন ব্যবস্থা নিতে হবে।
এর আগে গত ২৩ অক্টোবর, এনসিসিআইএ করাচি জোন তিন সংস্থা থেকে একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে। তারা আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের জন্য যৌন উদ্দীপক অ্যানিমেটেড কার্টুন, চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ মেটেরিয়াল (সিএসএএম) এবং অন্যান্য পর্নোগ্রাফিক ডিজিটাল সামগ্রী তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিল।
ইউনিসেফের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পাকিস্তানে এক বছরে আনুমানিক ১৫ লাখ শিশু অনলাইন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে নির্যাতনকারী ব্যক্তিরা ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের পূর্বপরিচিত ছিল। এছাড়া, ৭১ শতাংশ ভুক্তভোগী শিশু কাউকেই তাদের এই অভিজ্ঞতার কথা জানায়নি। জরিপে অংশ নেওয়া কোনো শিশুই পুলিশ, হেল্পলাইন বা সমাজকর্মীদের মতো প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমে অভিযোগ দায়ের করেনি।
অন্যদিকে, শিশু অধিকার সংস্থা 'সাহিল'-এর আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশজুড়ে অন্তত ১,৯১৪টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। জানুয়ারি থেকে জুন ২০২৬-এর মধ্যে ১,০১৫টি শিশু যৌন নির্যাতন, ৫৫৮টি অপহরণ, ১০১টি শিশু নিখোঁজ এবং ৩৫টি বাল্যবিয়ে সংক্রান্ত ঘটনা ঘটে। এছাড়া যৌন নির্যাতনের পর পর্নোগ্রাফি তৈরির ৯৮টি ঘটনাও রেকর্ড করা হয়।
সাহিলের এই প্রতিবেদনটি পাকিস্তানের চারটি প্রদেশসহ ইসলামাবাদ, আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর এবং গিলগিট-বালতিস্তানের বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকার সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৫৮ শতাংশই মেয়েশিশু এবং ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুরা এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন