প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
আজারবাইজানে স্কুলের পোশাক সংক্রান্ত নতুন নীতিমালার অজুহাতে হিজাব পরা ছাত্রীদের ক্লাসে প্রবেশ করতে না দেওয়ার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হিজাব পরা ছাত্রীদের ক্লাসে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কয়েক দিন ধরে ক্লাস বর্জন করে স্কুলের ফটকে অবস্থান করছে। গত ১২ অক্টোবর বাকুতে চলা বিক্ষোভের সময় অন্তত ৩৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সরকার সমর্থক সংবাদমাধ্যমগুলো প্রায় ২০০ জনকে আটক করার খবর দিলেও সরকারিভাবে এই তথ্য স্বীকার করা হয়নি।
আজারবাইজানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটিই সবচেয়ে বড় জনবিক্ষোভ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর আজারবাইজানের মন্ত্রিপরিষদ স্কুলের পোশাক নীতিমালায় সংশোধন এনে এমন পোশাক নিষিদ্ধ করেছে, যা নির্ধারিত পোশাকবিধির পরিপন্থী কিংবা সাধারণ শিক্ষার ‘ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির’ সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। সংশোধিত আদেশে সরাসরি ‘হিজাব’ শব্দটির উল্লেখ ছিল না।
তবে ৯ অক্টোবর থেকে স্কুলে পরীক্ষা বা পরিদর্শন শুরু হলে মাথা ঢাকা ছাত্রীদের ক্লাসে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় এবং শিক্ষিকাদের মাথার স্কার্ফ বা হিজাব খুলে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। সুমগাইতের কয়েকজন শিক্ষিকা জানিয়েছেন, তাঁদের স্কুল থেকে হিজাব খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অথবা পদত্যাগপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে।
বাকুর একটি স্কুল সূত্র বিবিসি-কে জানিয়েছে, ডিক্রিতে কোনো দাড়ি সংক্রান্ত নির্দেশনা না থাকলেও বয়সে বড় ছাত্রদের দাড়ি কেটে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের উদ্দেশ্য শিক্ষার পরিবেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাখা এবং সমান পোশাকনীতি বজায় রাখা। উল্লেখ্য, আজারবাইজানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯৬ শতাংশই মুসলিম।
হিজাব নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে প্রথম ভিডিওটি দক্ষিণের জালিলাবাদ অঞ্চল থেকে সামনে আসে। এরপর প্রতিবাদটি বাকু, এর আশপাশের গ্রাম এবং সুমগাইত শহরে ছড়িয়ে পড়ে। সংহতি জানিয়ে কয়েকটি স্কুলের ছাত্ররাও ক্লাস বর্জন করে। সাবুঞ্চু এলাকার শিক্ষার্থীরা "হিজাব শিক্ষায় কোনো বাধা নয়" লেখা ব্যানার নিয়ে প্রতিবাদ জানায়। খোখমেলি এলাকায় ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা তাঁদের ছেলেদের স্কুল থেকে তুলে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
এদিকে আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে কর্তৃপক্ষ একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে। আটককৃতদের নাম কিংবা বয়স প্রকাশ করেনি দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত মঙ্গলবার একটি স্কুলে আগুন দেওয়ার চেষ্টার সন্দেহে ৬ জন অপ্রাপ্তবয়স্ককে আটক করা হয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ ব্যবহারকারীরা ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক ব্যবহারে বিভ্রাটের কথা জানালেও কর্তৃপক্ষ তা ব্লক করার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
পোশাক নীতির বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নেরও জবাব দেয়নি। এর আগে গত ২ অক্টোবর দেশটির প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ তাঁর দলীয় কংগ্রেসে বলেছিলেন যে, আজারবাইজানকে মতাদর্শগত উস্কানি থেকে রক্ষা করতে হবে, এবং তা শুরু করতে হবে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, আলিয়েভের এই মন্তব্যটি মূলত ইরানকে উদ্দেশ্য করে করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান স্কুলে হিজাব নিষেধাজ্ঞাকে "অগ্রহণযোগ্য" বলে অভিহিত করেছেন। প্রেসিডেন্ট আলিয়েভের ক্ষমতাসীন দল পরবর্তীতে তুরস্কের গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ তোলে। নির্বাসিত সমালোচক আফগান মুখতারলি দাবি করেছেন, ক্ষমতায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করতেই আলিয়েভ সরকার কাল্পনিক ‘উগ্র ইসলামপন্থী’ জুজু ব্যবহার করছে।
ধর্মীয় বিধিনিষেধের দীর্ঘ ইতিহাস
আজারবাইজানে ধর্মপ্রাণ নাগরিকদের ওপর সরকারের কড়াকড়ির ঘটনা এটাই প্রথম নয়। ২০০৮ সালে এক বোমা হামলার পর ঐতিহ্যবাহী আবু-বকর মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০০৯ সালে আজারবাইজান এমন কিছু আইন পাশ করে, যা ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সংগঠন তৈরি ও ধর্মীয় বইপুস্তক বিতরণের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। ২০০৯ সাল থেকে যেসব মসজিদ বন্ধ বা ভেঙে ফেলা হয়েছে, তার বেশিরভাগই ছিল সুন্নিদের।
২০০৯ সালের সংশোধনীতে ধর্মীয় রীতি-নীতি পরিচালনার অধিকার কেবল আজারবাইজানে শিক্ষিত নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয় এবং রাষ্ট্র সমর্থিত ককেশাস মুসলিম বোর্ডকে নামাজের ইমাম নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়। স্কুলছাত্রীদের ওপর হিজাবের এই অনানুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা এতদিন পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের ছবির জন্য ছবি তুলতে পারছিল না। ২০১১ সালের ৬ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে পুলিশ হিজাবপন্থীদের একটি বিক্ষোভে লাঠিচার্জ করে ভেঙে দেয় এবং নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। এতে বিশিষ্ট সমাজকর্মী আবগুল সুলেমানভকে ১১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যদিও তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। সুলেমানভের পরিবারের দাবি, হিজাব নিয়ে পোস্ট দেওয়ার কারণেই চলতি সেপ্টেম্বরে তাঁকে নতুন করে ৩০ দিনের জন্য আটক করা হয়েছে।
২০১৫ সালের শেষের দিকে একটি গ্রামে অভিযান চালিয়ে দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ সাতজনকে হত্যা করা হয় এবং অধিকার রক্ষা কর্মীদের মতে সেসময় ৮৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে একটি আদালত মুসলিম ইউনিটি মুভমেন্টের নেতা তালেহ বাগিরজাদে এবং তাঁর সহযোগী আব্বাস হুসাইনবকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়। পরবর্তীতে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত এই মামলার দুই আসামির ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে দেওয়া রায় লঙ্ঘন হয়েছে বলে জানিয়েছিল।
২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে বিদেশ থেকে পড়াশোনা করে আসা কোনো নাগরিক সেখানে ধর্মীয় রীতিনীতি পরিচালনায় নেতৃত্ব দিতে পারেন না। ২০১৮ সালে রাষ্ট্র পরিচালিত বাকু ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। এছাড়া ২০২২ সালের একটি বিলের মাধ্যমে মসজিদের ইমাম নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি একটি সরকারি কমিটির হাতে তুলে দেওয়া হয়। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে বাকুর ঐতিহ্যবাহী হাজী জাভাদ মসজিদটিও ভেঙে ফেলে কর্তৃপক্ষ।
বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক নজরদারি তালিকায় আজারবাইজানের নাম রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন