প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জরুরি ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত ৭৯তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশ সহ-আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভায় তিনি এই আহ্বান জানান। সভাটির প্রতিপাদ্য ছিল— ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: এ রিনিউড কল ফর এ ডিউরেবল সলিউশন ফ্রম প্রোট্র্যাক্টেড ডিসপ্লেসমেন্ট, উইথ জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টাবিলিটি"।
২০১৭ সালের ভয়াবহ গণ-বাস্তুচ্যুতির প্রায় এক দশক পার হতে চললেও, বাংলাদেশে এখনও ১২ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছেন। বিশ্বের সর্ববৃহৎ কক্সবাজার শরণার্থী শিবিরে প্রতি বছর ৩০ হাজারেরও বেশি শিশু জন্ম নিচ্ছে, যাদের কাছে এই দীর্ঘ স্থানচ্যুতিই একমাত্র বাস্তবতা।
বিশেষ দূত জুলি বিশপ বলেন, ‘‘২০১৭ সালে জন্ম নেওয়া একটি শিশুর জন্য তার পুরো শৈশবটাই এখন এক দীর্ঘ বাস্তুচ্যুতির নাম।’’
বিশাল সংখ্যক এই জনসংখ্যার আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে অনন্য ও অসাধারণ দায়িত্ব পালন করছে, সভায় তার ভূয়সী প্রশংসা করেন বিশপ। তিনি সতর্ক করেন যে, বৈশ্বিক মানবিক সহায়তার তহবিল কমে যাওয়ায় খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং নারীদের সুরক্ষার মতো জীবনরক্ষাকারী মূল পরিষেবাগুলো মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, কেবল মানবিক সহায়তা দিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
মিয়ানমারের সামরিক শাসক দল (নেপিডো) যখন ঢাকার সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে শরণার্থী প্রত্যাবাসনের দাবি করছে, তখন জুলি বিশপ সেখানে বাস্তবভিত্তিক ও জটিল প্রশ্ন তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, রাখাইন রাজ্যের (আরাকান) বেশিরভাগ অঞ্চলই এখন সশস্ত্র গোষ্ঠী 'আরাকান আর্মি'র (এএ) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রাখাইনের ১৭টি উপজেলার মধ্যে ১৪টি এবং প্রতিবেশী চিন রাজ্যের পালেতওয়া উপজেলা বর্তমানে তাদের দখলে।
চলমান এই সহিংস সংঘাতের পরিস্থিতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘মিয়ানমারের রাখাইন বা অন্য কোথাও রোহিঙ্গাদের জন্য স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।’’
তড়িঘড়ি করে প্রত্যাবাসন চেষ্টার বিষয়ে সতর্ক করে তিনি আরও বলেন, ‘‘যারা এখনই রোহিঙ্গাদের অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর কথা বলছেন, তারা মূলত বিদ্যমান ঝুঁকিগুলোকে উপেক্ষা করছেন। এতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। কোনো সম্প্রদায়কেই পুনরায় বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়।’’
জটিল এই অচলাবস্থার কারণে সৃষ্টি হওয়া ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি মানব পাচার, জোরপূর্বক সৈন্যে নিয়োগ এবং বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে বিপজ্জনক নৌ-যাত্রার বৃদ্ধির বিষয়টি উপস্থাপন করেন। শিবিরগুলোর করুণ চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘সম্প্রতি শরণার্থী শিবিরগুলোতে বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে আত্মহত্যা ও আত্মহত্যার চেষ্টার উচ্চ হার আমাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এক করুণ ও জরুরি সতর্কবার্তা।’’
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দ্য গাম্বিয়ার দায়ের করা গণহত্যা মামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, স্থায়ী সমাধানের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা অপরিহার্য। তিনি বলেন, "বিচারহীনতার সংস্কৃতির ওপর কখনোই টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।"
সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি রোডম্যাপ তুলে ধরেন জাতিসংঘের এই বিশেষ দূত। এর মধ্যে রয়েছে: বৈশ্বিক পর্যায়ে এই ইস্যুতে রাজনৈতিক দৃষ্টি বজায় রাখা, মানবিক তহবিলের ঘাটতি পূরণ করা এবং আসিয়ান-এর পাঁচ দফা সম্মতির ভিত্তিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা। উল্লেখ্য, এটি মিয়ানমার সম্পর্কিত আসিয়ান-এর একটি শান্তি পরিকল্পনা, যা ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরবর্তীতে তা বাস্তবায়ন করেননি।
সবশেষে বিশপ বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, "আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনীহা বা উদাসীনতার মাশুল রোহিঙ্গাদের দেওয়া উচিত নয়। কোনোভাবেই এটি যেন একটি 'ভুলে যাওয়া সংকটে' পরিণত না হয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন