প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন অলিগলিতে সীমানাপ্রাচীর ও ভবনের দেয়ালে কালো ও লাল রঙে বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে ‘ডিপিজি’, ‘ডিএনজি’, ‘রেড ৯৯৯’, ‘ডিবিকে’, ‘সিবিকে’, ‘ডিবিএক্স’ ও ‘কেজিএস’ ‘রতন গপ্ররুপ’, ‘কিং স্কোয়াড’ ক্রাইম সেটআপ, ফ্লাইং বার্ড, জেআর।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই নামগুলো জেলার বিভিন্ন কিশোর গ্যাংয়ের। স্থানীয়দের মতে, জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামপর্যায়ে অন্তত ৪০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শহর থেকে গ্রামগঞ্জের পাড়া-মহল্লায় দেয়ালজুড়ে লেখা নাম ও সংকেত কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার চিহ্ন। এসব গ্রুপ আধিপত্য বিস্তার, মারামারি, অস্ত্রের মহড়া, দলবদ্ধ মোটরসাইকেল মহড়া ও সংঘর্ষসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে উঠতি বয়সী কিশোররা।
সম্প্রতি ১৩ বছরের স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার হত্যাকাণ্ড কুমিল্লার কিশোর অপরাধের ভয়াবহ চিত্রকে নতুন করে সামনে এনেছে। ওই হত্যাকাণ্ডের পর জেলার ১৮টি থানায় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে একযোগে অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। অভিযানের তিন দফায় এখন পর্যন্ত এক হাজার ২৮৪ জনকে আটক করা হয়েছে।
এর আগে, ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর রাতে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় কুমিল্লা নগরীর অশোকতলায় নিহত হন সজীব হোসেন। তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। একই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ এবং ২০২৫ সালে অস্ত্রের মহড়ায় রতন গ্রুপ ও ঈগল গ্রুপের নাম উঠে আসে।
পরে গত ২৫ এপ্রিল কুমিল্লার রানীর দীঘিরপাড়, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়ায় মহড়া দেয় তারা। ২০২৩ সালের ২৮ মে কুমিল্লা জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাহিদের হাত ও পায়ের রগ কেটে আহত করে ‘আরজিএস’ নামের কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। একই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর অটোরিকশা ছিনতাই করতে গিয়ে দাউদকান্দি উপজেলার শাহপুর গ্রামের আশরাফুল আমিন নামের এক স্কুলছাত্রকে হত্যা করে কিশোর গ্যাং সদস্যরা।
ওই ঘটনায় ২৯ সেপ্টেম্বর কিশোর গ্যাংয়ের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল দাউদকান্দির ইলিয়টগঞ্জ দক্ষিণ ইউনিয়নের বাশরা গ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের রাহেজুল আমিন বাঁধনকে কুপিয়ে হত্যা করে স্থানীয়রা। স্থানীয়রা জানান, এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ে জড়িত থাকায় অতিষ্ঠ হয়ে তাকে হত্যা করা হয়।
২ এপ্রিল ধর্মসাগর পাড়ে বেড়াতে এসে পুলিশের এক নারী কনস্টেবলকে তিন কিশোর গ্যাং সদস্য অশালীন মন্তব্য করে। তার স্বামী প্রতিবাদ করলে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। ওই ঘটনায় রিফাত ও সিয়াম নামের দুই কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে, গত শুক্রবার কুমিল্লা নগরীতে মহানগর ছাত্রদলের ব্যাপারে একটি মিছিল বের করা হয়। ওই মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া মহানগর ছাত্রদলের সহসভাপতি মো. মহসিনের পেছনে দেখা যায় কিশোর গ্যাংয়ের ইমরান হোসেন রতনকে। ছবিটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়। বিষয়টি নগরীতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর অপরাধীরা মূলত অনলাইন বা টিকটক ও রিলসভিত্তিক অ্যাপসের মাধ্যমে একে অপরের মধ্যে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। দেয়ালে লেখা এসব নাম তাদের সাংকেতিক চিহ্ন, যা অপরাধ জগতে নিজেদের শক্তিশালী গ্রুপ হিসেবে তুলে ধরতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, দেশে কিশোর অপরাধীদের জন্য লঘুশাস্তির বিধান রয়েছে। এ কারণে তারা সহজেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো অপরিহার্য।
কুমিল্লা জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১৮টি থানার যেসব স্থানে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে, সেসব স্থান চিহ্নিত করে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানে আটকদের জিজ্ঞাসাবাদে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথম দফায় অভিযানে ৬১৫ জন কিশোরকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ৪৫১ জনকে মুচলেকায় অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। বাকি ১৭৩ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
২৬ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফায় অভিযানে ২৫৪ জনকে আটক করা হয়। এর মধ্যে কুমিল্লা নগরের আলোচিত ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াড’-এর সক্রিয় চার সদস্যও রয়েছে। তাদের মধ্যে আনিসুর রহমান ওরফে আনিক একটি গ্রুপের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’। ২৭ সেপ্টেম্বর তৃতীয় দফা অভিযানে আরো ৪১৫ জনকে আটক করা হয়। বর্তমানে আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তিন দফার সাঁড়াশি অভিযানে জেলায় মোট এক হাজার ২৮৪ জনকে আটক করা হয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খান কালের কণ্ঠকে বলেন, কিশোর অপরাধীরা এক-দুই দিনে অপরাধে জড়ায় না, তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। এসব নেতার উচিত দল ভারি করার জন্য কিশোরদের ব্যবহার না করা। কিন্তু সম্প্রতি কুমিল্লাসহ সারা দেশে কিশোর অপরাধ ভয়াবহ ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। কুমিল্লার বিভিন্ন দেয়ালে কিশোর গ্যাংয়ের ভয়ঙ্কর নাম। তারা অস্ত্র উঁচিয়ে ভয়ঙ্কর কথাবার্তা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও পোস্ট করছে।
কুমিল্লা জেলায় এমন অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং রয়েছে; প্রত্যেক এলাকায় রয়েছে চার-পাঁচটি করে, যার বলি হয়েছে ১৩ বছরের স্কুল শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার। এই ব্যাধি নির্মূল করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তৎপর হতে হবে, তেমনি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে।
কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান বলেন, নগরীর দেয়ালে বিভিন্ন কিশোর গ্যাং গ্রুপের মূলে যারা রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রতন গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমাণ্ড আনিসুর রহমান ওরফে আনিকসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, এরই মধ্যে জেলা পুলিশের তিন দফার অভিযানে মোট এক হাজার ২৮৪ জনকে আটক করা হয়েছে। কিশোর অপরাধীদের ধরতে নিয়মিত অভিযান চলবে। কিশোর অপরাধ দমনে অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন