প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন বা সিডিসি’র তথ্য অনুসারে, বিশ্বের প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে বসবাস করছে। বাংলাদেশে ডেঙ্গুজ্বরের প্রাদুর্ভাব দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান। প্রতি বছর ডেঙ্গুজ্বরের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে ২০০০ সালে, রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গুজ্বর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা এবং অনেক মৃত্যুর কারণে সাধারণ জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। ডেঙ্গুজ্বরকে অনেকেই নিশ্চিত মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত করতে শুরু করে। এর ফলে রক্ত ও প্ল্যাটিলেট দেওয়া এবং অ্যান্টিবডি পরীক্ষার জন্য হিড়িক পড়ে যায়।
বর্তমান বছরে বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে এডিস মশা বাহিত ডেঙ্গু রোগের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রাজধানীসহ সারা দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টির ধরন পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল এবং প্রাইভেট ক্লিনিকে অসংখ্য রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন, এমনকি অনেক রোগী ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ডেঙ্গুর সংক্রমণ সারা বছর ধরে চলমান এবং নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে ডেঙ্গু নতুন কোনো রোগ নয়, ২০০০ সাল থেকে আমরা এর বিরুদ্ধে লড়াই করছি। তবে ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এর প্রকোপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।
বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হচ্ছে টিকা বা ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করা। ডেঙ্গুজ্বরের জন্য কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, এবং অ্যান্টিভাইরাল ওষুধও নেই। টিকা বা ভ্যাকসিন ডেঙ্গু প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকরী উপায়। অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, করোনা মহামারি শুরুর এক বছরের মধ্যে আমরা টিকা পেয়েছি। সারা বিশ্বের মানুষ করোনা টিকার আওতায় এসেছে। কিন্তু ডেঙ্গু এত বছর ধরে বিভিন্ন দেশে প্রকোপ ছড়ালেও কেন এখনো এর টিকা সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া অনেকে জানতে চান, আমাদের দেশে ডেঙ্গুর কোনো টিকা দেওয়া হয় কি না বা অতি দ্রুত সময়ে টিকা দেওয়া হবে কিনা।
আসলে ডেঙ্গুর টিকা একেবারে নেই তা নয়। ডেঙ্গু ভাইরাসের চার ধরনের সেরোটাইপ রয়েছে, ডেন ১, ২, ৩ ও ৪। পূর্বে এমন কোনো কার্যকরী টিকা বা ভ্যাকসিন তৈরি হয়নি যা এই চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধে কাজ করবে। যদিও ডেঙ্গুর টিকা তৈরি করার জন্য অনেক বছর ধরে চেষ্টা চলছে, তবে দুটি টিকা ইতিমধ্যে বের হয়েছে, ডেংভ্যাক্সিয়া এবং কিউডেঙ্গা ভ্যাকসিন।
ডেংভ্যাক্সিয়া: এই টিকাটি ফ্রান্সের একটি ওষুধ কোম্পানি তৈরি করেছে। টিকাটির প্রয়োগে শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, কিন্তু সেল মেডিয়েটেড ইমিউনিটি তৈরি হয় না। ফলে, এই টিকা নেওয়ার পর ডেঙ্গু ভাইরাসে সংক্রমিত হলে কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গু মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এর কারণ পরিষ্কার নয়, তবে এ ধরনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াকে এন্টিবডি ডিপেন্ডেন্ট এনহান্সমেন্ট বলা হয়।
এই টিকার তিনটি ডোজ দিতে হয় ছয় মাস পরপর। টিকাটির ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সাধারণত ৯ থেকে ১৬ বছরের বাচ্চাদের দেওয়া হয়, অর্থাৎ ৯ বছরের নিচে এবং ১৬ বছরের ওপরে কেউ এই টিকা নিতে পারবেন না। এছাড়া, যাদের একবারও ডেঙ্গু হয়নি, তাদের এই টিকা দেওয়া যাবে না। যাদের রক্ত পরীক্ষায় ডেঙ্গু পজিটিভ অ্যান্টিবডি পাওয়া যায় বা যারা আগে কখনো ডেঙ্গু হয়েছিল, তাদের টিকাটি দেওয়া যায়। পূর্বে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হলে এবং ভুলক্রমে তাকে এই টিকা দেওয়া হলে মারাত্মক জটিলতার সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই যারা পূর্বে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়নি, তাদের জন্য এই টিকাটি নিরাপদ নয়। কম বয়সী শিশু এবং যাদের পূর্বে ডেঙ্গু হয়নি, তাদের এই টিকা দিলে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গু মারাত্মক হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহের কথা শোনা যায়। কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কারণে জনমনে শঙ্কা রয়েছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এবং জনগণের মাঝে সংখ্যার কারণে এই টিকাটি আপাতত আর তৈরি হচ্ছে না।
কিউডেঙ্গা: এই টিকাটি জাপানের একটি কোম্পানি তৈরি করেছে। টিকাটির একটি বৈশিষ্ট্য হলো, আগে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে থাকুক বা না থাকুক, উভয় ক্ষেত্রেই এটি দেওয়া যায়। টিকা দেওয়ার আগে ডেঙ্গু সংক্রমণের পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের কিউডেঙ্গা টিকা দেওয়া যায়। অনেকের মতে, ৪ বছর বয়সী শিশু থেকে ৬০ বছরের প্রাপ্তবয়স্ক যে কেউ এই টিকাটি নিতে পারবে। পৃথিবীর অনেক দেশে ইতিমধ্যে টিকাটির ব্যবহার শুরু হয়েছে। দুটি ডোজ দিতে হয় তিন মাস পরপর। এই টিকা ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধে কার্যকরী বলে প্রমাণিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, কিউডেঙ্গার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া খুবই কম। পৃথিবীর প্রায় ২০টি দেশে টিকাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়াতে কিউডেঙ্গা টিকাটি প্রচুর পরিমাণে দেওয়া হচ্ছে। কিউডেঙ্গা টিকাটি চার বছর পর্যন্ত সুরক্ষা দেয় প্রায় ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই। এই টিকা ৭০ ভাগ কার্যকরী এবং যারা এটি একবার গ্রহণ করে, তাদের ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে ৯০ ভাগ রোগীকে হাসপাতালে যেতে হয় না।
ডেংভ্যাক্সিয়া এখনও স্বীকৃতি পায়নি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার, তবে কিউডেঙ্গার অনুমোদন দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
বাংলাদেশে অনেকেই কিউডেঙ্গা টিকা ব্যবহারের পক্ষপাতী, বিশেষ করে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের একটি বড় অংশ শিশু ও কিশোর। তাই ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের ডেঙ্গুর সংক্রমণ থেকে বাঁচানোর জন্য টিকা দেওয়া উচিত বলে অনেকের মত। তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। অনেক দেশে টিকাটি ব্যবহৃত হচ্ছে, যদি ফলাফল ইতিবাচক, কার্যকরী ও ভালো হয়, তাহলে ভবিষ্যতে হয়তো আমাদের দেশে এই টিকা দেওয়ার বিষয়টি চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে।
সম্প্রতি একটি খবরে জানা গেছে, ডেঙ্গু মোকাবেলায় নতুন একটি ঢাল পেতে যাচ্ছে ভারত। কিউডেঙ্গা ভারতে বাজারজাত ও বিতরণের জন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করেছে ডক্টর রেড্ডিস ল্যাবরেটরী। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ডেঙ্গুর নিশ্চিত সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকাটি কার্যকারিতা দেখিয়েছে। দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার এক বছর পর নিশ্চিত ডেঙ্গু সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকারিতা ছিল ৮০.২ শতাংশ, আর ১৮ মাস পর ডেঙ্গুর কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা ৯০.৪ শতাংশ। ভারতের ঔষধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা চলতি বছরের জুলাইয়ে কিউডেঙ্গার অনুমোদন দিয়েছে। তবে বাজারে আসার আগে আরো কিছু নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
ডেঙ্গুর আরেকটি টিকা আছে ‘টেট্রাভালেন’ নামের, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের আবিষ্কার করা ডেঙ্গু টিকার দ্বিতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল চালিয়েছিল আই.সি.ডি.ডি.আর.বি'র গবেষকরা। ওই টিকার নাম টিভি০০৫। যেটার পরীক্ষা প্রথম দুই ধাপ শেষ হয়েছে এবং সফলতা পেয়েছে। পরবর্তী ধাপগুলোর পরীক্ষা চালানোর চেষ্টা চলছে। এই টিকার সুবিধা হলো একটি ডোজ নিলেই ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধে কার্যকরী হবে। শিশুসহ যেকোনো বয়সের মানুষের জন্যই টিকাটি কার্যকরী। ভারতেও এই টিকার পরীক্ষা চলছে।
মনে রাখতে হবে যতদিন কার্যকরী টিকা আমরা না পাই, ততদিন ডেঙ্গু থেকে নিরাপদে থাকতে আমাদের প্রতিকার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করাটাই আমাদের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। বাস্তবতা হলো, ডেঙ্গু শুধু শহরকেন্দ্রিক রোগ নয়, সারা দেশে গ্রামেগঞ্জে বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। তাই আমাদের সবাইকে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি টেকসই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জনসাধারণকেও এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ডেঙ্গু সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান হতে পারে।
লেখক: একুশে পদকপ্রাপ্ত চিকিৎসক।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন