প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকা, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ : মেক্সিকোতে চলমান সহিংসতা ও মাদক চোরাচালান চক্রগুলোর আধিপত্যের কারণে হাজার হাজার শিশু নিখোঁজ হয়ে গেছে। নিখোঁজ এসব সন্তানের খোঁজে অসংখ্য মা-বাবা বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করছেন। এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) তাদের স্বজনদের খুঁজে পেতে সহায়তা করতে পারে।
মেক্সিকোয় নিখোঁজ ১ লাখ ৩৪ হাজারের বেশি মানুষের সন্ধানে সহায়তা করার লক্ষ্যে এআইভিত্তিক দুটি নতুন প্রযুক্তি তৈরি করা হচ্ছে।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ১৬ বছর বয়সে নিখোঁজ হয় রোসাসের ছেলে দিয়েগো। মধ্য মেক্সিকোর একাতেপেক শহরে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
রাজ্যের কৌঁসুলির অফিস জানায়, একটি অপরাধী চক্র দিয়েগোকে অপহরণ করেছিল। তবে কোন চক্র তাকে অপহরণ করেছে, কেন করেছে কিংবা সে এখনও বেঁচে আছে কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি।
দীর্ঘ ১১ বছর ধরে ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে হতাশ ভেরোনিকা রোসাস। বর্তমানে তার বয়স ৫২ বছর। মেক্সিকো সিটিতে নিয়মিত অনুষ্ঠিত বিচার দাবির এক বিক্ষোভে এএফপিকে তিনি বলেন, "১১ বছর পেরিয়ে গেছে, অথচ দিয়েগো কোথায় আছে, তা এখনো জানি না। আমার ছেলের কী হয়েছিল, তা জানার জন্য কোনো কার্যকর তদন্তের পথও আমাদের সামনে নেই।"
দিয়েগোর মতো অসংখ্য নিখোঁজ ব্যক্তির ঘটনা দুটি বিশ্ববিদ্যালয়কে এআইভিত্তিক প্রযুক্তি তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এসব প্রযুক্তি নিখোঁজ ব্যক্তিদের ভাগ্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে সক্ষম হবে।
মেক্সিকোর প্রধান সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটি অব মেক্সিকো (ইউএনএএম) তৈরি করেছে ‘রেগ্রেসা’ নামের একটি প্রযুক্তি। স্প্যানিশ ভাষায় ‘রেগ্রেসা’ শব্দের অর্থ ‘ফিরে আসো’।
প্রযুক্তিটি নৃতাত্ত্বিক শারীরিক পরিমাপবিদ্যা বা অ্যানথ্রোপোমেট্রির সহায়তায় নিখোঁজ শিশুদের বর্তমান বয়সে চেহারা কেমন হতে পারে, তার একটি সম্ভাব্য ছবি তৈরি করে। নিখোঁজের সময় শিশুদের যে ছবি পোস্টারে প্রকাশ করা হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তাদের চেহারায় সম্ভাব্য পরিবর্তন সেই ছবিতে ফুটিয়ে তোলাই এর উদ্দেশ্য।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকায় তাদের বর্তমান বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছবি তৈরির দাবি জানিয়ে আসছেন পরিবারের সদস্যরা।
যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোতে অপহৃত শিশুদের খুঁজতে আগে থেকেই মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে চেহারার পরিবর্তন অনুমান করার সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে।
মেক্সিকোর কয়েকটি কৌঁসুলি কার্যালয়েও এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। তবে অধিকাংশ সফটওয়্যার উন্মুক্ত উৎসের ছবির তথ্যভান্ডারের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে মেক্সিকানদের সাধারণ শারীরিক বৈশিষ্ট্য যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।
রেগ্রেসার উদ্ভাবকেরা এ ক্ষেত্রে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন।
তারা ৭৫ জন মেক্সিকান স্বেচ্ছাসেবীর শত শত ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করে নিজস্ব একটি ছবির তথ্যভান্ডার তৈরি করেছেন। এর মাধ্যমে মেক্সিকানদের সাধারণ শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছবি তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রকল্পটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নৃতত্ত্ববিদ আনা হুয়ারেস এএফপিকে বলেন, শিশুদের বয়স বাড়ার প্রক্রিয়া নির্ধারণেও রেগ্রেসা ভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
তিনি এএফপিকে বলেন, "অনেক সফটওয়্যার শুধু মুখমণ্ডলের আকৃতি ও ত্বকের গঠন নিয়ে কাজ করে, কিংবা বলিরেখার মতো পরিবর্তন দেখাতে বিভিন্ন ফিল্টার ব্যবহার করে। আমরা এমন একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি উদ্ভাবনের চেষ্টা করছি, যার মাধ্যমে বয়স বাড়ার সঙ্গে একজন মানুষের মাথার খুলি ও মুখমণ্ডলের গঠনে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, তা তুলে ধরা যাবে।"
মেক্সিকোয় দীর্ঘদিন ধরে কর্তৃপক্ষের নিষ্কিয়তার কারণে অনেক পরিবার নিজেরাই নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে তদন্ত চালাতে বাধ্য হচ্ছে।
এ ধরনের অনুসন্ধানে সহায়তা করতে বেসরকারি ইবেরো-আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নৃতত্ত্ববিদও এআই ব্যবহার করছেন।
এমিলিয়ানো জোল্লা নিখোঁজ ব্যক্তিদের লিঙ্গ, বয়স এবং নিখোঁজ হওয়ার পরিস্থিতি অনুযায়ী তথ্য সাজিয়ে একটি মানচিত্র তৈরি করছেন। তার আশা, এ তথ্যের মাধ্যমে পরিবারগুলো আরও নির্দিষ্টভাবে অনুসন্ধান চালাতে পারবে।
মেক্সিকোর সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য স্টেট অব মেক্সিকোর নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি দেখেছেন, নিখোঁজদের অনেকেই তরুণী। তাদের অনেকে স্কুল, কলেজ বা কর্মস্থলে যাওয়ার পথে কিংবা সেখান থেকে ফেরার সময় নিখোঁজ হন।
এএফপির কাছ থেকে রেগ্রেসা প্রযুক্তির বিষয়ে জানার পর ভেরোনিকা রোসাস বলেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে এআই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
তিনি বলেন, "এই উদ্যোগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যাদের তখন অপহরণ করা হয়েছিল, তারা এখন আর ছোট্ট শিশু নেই; বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাদের চেহারাও বদলে গেছে।"
নিখোঁজ ছেলে দিয়েগোর খোঁজ পেতে মেক্সিকো সিটির প্রধান সড়কে একটি অস্থায়ী ডাকবাক্স স্থাপন করেছেন রোসাস। সেখানে দিয়েগোর ১৬ বছর বয়সের একটি ছবি লাগানো হয়েছে। কেউ তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য জানলে তা জানাতে পারবেন। এ ছাড়া দিয়েগোর জন্মদিনে তার জন্য শুভেচ্ছাবার্তাও সেখানে রেখে যেতে পারবেন।
২০২৫ সালে নিজের ১৯ বছর বয়সী ছেলে যিশুয়া সিসনেরোস নিখোঁজ হওয়ার পর কার্লা লেচুগাও একটি অনুসন্ধানী সংগঠন গড়ে তোলেন।
লেচুগার মতো বিভিন্ন সংগঠন দেশটির বিভিন্ন গির্জায় তথ্য সংগ্রহের জন্য কয়েক ডজন ‘পিস বক্স’ বা ‘শান্তির ডাকবাক্স’ স্থাপন করেছে।
এ ছাড়া জনসমাগমস্থলে নিখোঁজ স্বজনদের ছবি টাঙিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অপরাধী চক্রগুলোর কাছেও পরিচয় গোপন রেখে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
লেচুগা বলেন, "আমরা কয়েকজনকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পেয়েছি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অন্যদের আর জীবিত পাওয়া যায়নি।"
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন