প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সমাজসেবক এবং সর্বজনশ্রদ্ধেয় সালিশ ব্যক্তিত্ব আব্দুল আহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি প্রায় আট মাস আগে ঘটেছিল। তবে, এই হত্যাকাণ্ডের মামলায় অধিকাংশ এজাহারভুক্ত আসামি এখনও অধরা রয়ে গেছেন। ঘটনার দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় নিহতের পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর একাংশের মধ্যে চরম উদ্বেগ, ক্ষোভ এবং নিরাপত্তার হীনমন্যতা বিরাজ করছে। নিহতের পরিবারের সদস্যরা প্রভাবশালী চক্রের অব্যাহত হুমকি এবং বিচারহীনতার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
হত্যাকাণ্ডটির নেপথ্য এবং নৃশংসতার বিবরণ তুলে ধরতে গেলে জানা যায়, নিহত আব্দুল আহাদ এলাকায় একজন সফল ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী সালিশ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় হাট-বাজার, নদী ইজারা এবং বালু-পাথারের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। পরিবারের দাবি, সীমান্ত এলাকায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন অনিয়ম, অবৈধ কালোবাজারি ও চোরাচালানের প্রতিবাদ করায় তিনি স্থানীয় এক প্রভাবশালী চক্রের তীব্র রোষানলে পড়েন।
মামলার এজাহার সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে কয়েকজন ব্যক্তি কৌশলে আব্দুল আহাদকে তার বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর আর তিনি জীবিত ফিরে আসেননি। পরদিন (১৫ ডিসেম্বর) ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ইস্ট খাসি হিলস জেলার চেল্লা থানার আওতাধীন একটি নির্জন এলাকা থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দেশে নিয়ে এসে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।
পরিবারের তথ্যমতে, আব্দুল আহাদের মাথা, বুক, গলা, কোমর এবং হাঁটুসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে নৃশংস আঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলে পুলিশ রক্তমাখা টি-শার্ট, স্যান্ডেল, গ্যাস লাইট এবং ধস্তাধস্তির আলামত উদ্ধার করে। এছাড়া, ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর ১ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি আব্দুল আজিজের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপের অডিও বাদীপক্ষের কাছে পৌঁছায়। পরিবারের দাবি, যদি অডিওটির পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক বিশ্লেষণ করা হয়, তবে হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উন্মোচিত হবে।
হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আসামিদের পরিচয় অনুসন্ধানে নেমে স্থানীয়দের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রাপ্ত হয়েছে। ১ নম্বর আসামি আব্দুল আজিজ গং এলাকায় ভারতীয় গরু-মহিষের বিশাল সীমান্ত চোরাচালান এবং 'কালো স্মাগলিং' রাজত্ব পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ উঠছে। প্রতিবেদকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে আলাপকালে এজাহারভুক্ত আসামি আব্দুল আজিজ প্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে, তিনি ভারত থেকে গরু-মহিষ বাংলাদেশে এনে ব্যবসা করেন। রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে দাম্ভিকতার সঙ্গে তিনি বলেন, "সরকারের রাজস্ব দেওয়ার মতো কোনো জায়গা পাই না, তাই রাজস্বও দিই না।"
একজন হত্যামামলার আসামির এমন খোলামেলা চোরাচালান এবং কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে সুশীল সমাজ ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
মামলায় মোট ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। পরিচিত ১০ জন এজাহারভুক্ত আসামি হলেন: ১. আব্দুল আজিজ (৫৫), পিতা: মৃত আব্দুল গফুর, গ্রাম: বিরেন্দ্রনগর। ২. ইয়াকুব আলী (৪০), পিতা: মৃত মমশ্বর আলী, গ্রাম: শ্রীপুর। ৩. কদ্দুছ আলী (৫০), পিতা: মৃত মমশ্বর আলী, গ্রাম: শ্রীপুর। ৪. ফয়ছল আহমদ (৩৫), পিতা: আব্দুল আজিজ, গ্রাম: বিরেন্দ্রনগর। ৫. (তথ্য সংগৃহীত হচ্ছে)। ৬. নজরুল ইসলাম (৫০), পিতা: মৃত আতাউর রহমান, গ্রাম: দ্বীনেরটুক। ৭. আরিফুল ইসলাম (৩৫), পিতা: মৃত আমিনুল ইসলাম শাহা, গ্রাম: শ্রীপুর। ৮. ফখরুল আলম বাবলু (৩৫), পিতা: মৃত মুক্তার আলী, গ্রাম: শ্রীপুর। ৯. আব্দুল আলী (৪৫), পিতা: মৃত ছাদ উল্লা, গ্রাম: তেরাপুর (হাতিরভাঙ্গা)। ১০. আরমান আলী (৩৫), পিতা: কদ্দুছ আলী, গ্রাম: শ্রীপুর।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, মামলায় অভিযুক্তদের কয়েকজন উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বাইরে এসে মামলা তুলে নিতে অণবরত চাপ সৃষ্টি করছে। প্রতিনিয়ত নিহতের পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এই বিষয়ে নিরাপত্তার স্বার্থে স্থানীয় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। আসামিদের ভয়ে এলাকার সাধারণ মানুষও প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।
উচ্চপর্যায়ে অভিযোগ ও সিআইডির প্রতি পরিবারের আকুতি: তদন্তের শ্লথগতি দেখে নিহতের ভাই মো. আ. কাইয়ুম ফারুক সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি ও সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন উচ্চপদস্থ দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। তিনি আকুল কণ্ঠে জানান, "আমরা কোনো বৈষম্য বা অন্যায় চাই না, কেবল আমার ভাই হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত এবং ন্যায়বিচার চাই। প্রকাশ্যে ঘুরতে থাকা আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আমাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।"
বর্তমানে বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলার তদন্তভার সিআইডি (CID)-এর ওপর ন্যস্ত রয়েছে। সিআইডি মহাপরিচালক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিচার বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সচেতন মহল দাবি জানিয়েছেন: * দ্রুত পদক্ষেপ: পলাতক এবং চিহ্নিত আসামিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার এবং আইনের আওতায় আনা। * স্বচ্ছ তদন্ত: ফরেনসিক প্রমাণাদিসহ নিরপেক্ষ তদন্ত দ্রুত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিল। * নিরাপত্তা প্রদান: মামলার বাদী, সাক্ষী এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। * দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: বিচারে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করে সমাজে আইনের শাসনের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। সীমান্তবর্তী অঞ্চলের এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের দ্রুত এবং নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি না হলে বিচার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন