প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাইয়ে গ্রেফতার বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মতি দিয়েছে দুবাই পুলিশ।
তবে তাঁকে কোন আইনি প্রক্রিয়ায় হস্তান্তর করা হবে, সে সম্পর্কিত চারটি বিষয়ে দুবাই পুলিশ ব্যাখ্যা চেয়ে বাংলাদেশ সরকারকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে চিঠি দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দুবাই পুলিশের পক্ষ থেকে এটি ইতিবাচক অগ্রগতি। বর্তমানে তারা (দুবাই পুলিশ) মূলত প্রত্যর্পণের আইনি ও কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইছে।
দুবাই পুলিশের ওই চিঠি পাঁচ দিন আগে বাংলাদেশে পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক সূত্র। সূত্রগুলো জানিয়েছে, বর্তমানে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টারপোল শাখার সহযোগিতায় ওই চিঠির জবাব তৈরির কাজ করছে দুদক।
বেনজীর আহমেদের মামলার তদন্ত ও প্রত্যর্পণের নথিপত্রের বিষয়টি সমন্বয় করছেন দুদকের উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম। জানতে চাইলে রবিবার সন্ধ্যায় তিনি বলেন, 'দুবাই পুলিশের চিঠি পাওয়ার পর থেকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছি। আশা করছি, দ্রুত জবাব পাঠানো যাবে এবং তাঁকে (বেনজীর) দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হব।'
বেনজীর আহমেদের দুবাই পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টি গত ১৪ জুন প্রথম জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে পাঠানো এক ই-মেইলে বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয় যে, দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে আটক করা হয়েছে।
এরপর বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বেনজীরের প্রত্যর্পণ চায়। দুদকের প্রস্তুত করা প্রায় ১৪৪ পৃষ্ঠার নথি আরবি ভাষায় অনুবাদ করে কূটনৈতিক মাধ্যমে দুবাইয়ে পাঠানো হয়। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে দেশে গ্রেফতারি পরোয়ানা, মামলার তথ্য এবং প্রত্যর্পণের প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংযুক্ত করা হয়। প্রায় এক মাস পর সেই আবেদনের জবাব দিয়েছে দুবাই পুলিশ। বর্তমানে বেনজীর দুবাইয়ের কারাগারে আটক আছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, দুবাই পুলিশের চিঠিতে মূলত চারটি বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ কোন আইনের আওতায় এবং কী প্রক্রিয়ায় বেনজীর আহমেদকে ফেরত নিতে চায়। কারণ, বাংলাদেশ এবং ইউএইর মধ্যে বন্দী প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত কোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নেই। ইত্যাদির মধ্যে রয়েছে আদালতের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানার আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি কী, পরোয়ানার কার্যকারিতা কতটুকু এবং পুরো প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন কাজ করছে—এগুলোও জানতে চেয়েছে দুবাই কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব প্রশ্ন আন্তর্জাতিক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ। প্রয়োজনীয় আইনি ব্যাখ্যা ও নথিপত্র প্রস্তুত করে খুব দ্রুত জবাব পাঠানো হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাঁদের মতে, দুবাই পুলিশের চিঠির ভাষা থেকে স্পষ্ট, তারা বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে হস্তান্তরের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বেনজীর আহমেদ ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং পরে আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০২৪ সালে তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে তদন্ত শুরু করে দুদক। পরে আদালতের আদেশে তাঁর এবং পরিবারের সদস্যদের বিপুল সম্পদ জব্দ করা হয়। তদন্ত চলাকালে জানা যায় যে, ২০২৪ সালের ৪ মে তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যান।
পরবর্তী সময়ে বেনজীরের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয় এবং আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোল তাঁর বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার, জালিয়াতিসহ ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।
দেশ ছাড়ার পর থেকে বেনজীর আহমেদের অবস্থান সম্পর্কে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো তথ্য ছিল না। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছেও নির্ভরযোগ্য তথ্য ছিল না।
বেনজীরকে গ্রেফতারের বিষয়ে দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানাচ্ছে যে, দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতারের পেছনে তাঁর কয়েকজন সাবেক সহযোগীর তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ব্যবসায়িক ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে বিরোধের কারণে তাঁরা দুবাই পুলিশকে তথ্য দেন। একটি শপিং মল থেকে বেনজীরকে আটক করা হয়। এ ক্ষেত্রে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও দুবাই পুলিশের বিবেচনায় ছিল।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন