প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
উত্তর কোরিয়ার কাছে ১০-০ গোলের পরাজয়কে কেবল একটি ম্যাচের ফল হিসেবে দেখা হলে ভুল হবে। এশিয়ান গেমসের মতো বিশাল মঞ্চে এই ব্যবধান বাংলাদেশের নারী ফুটবলের বাস্তব চিত্রকে উন্মোচন করেছে। তাই প্রশ্নটি কেবল কোচ কে, একাদশে কে খেলেছে বা কৌশল কী ছিল—এর চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা আসলে এই দলটিকে কিভাবে তৈরি করছি?
বাংলাদেশের নারী ফুটবলে একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা হলো—প্রতিযোগিতামূলক ঘরোয়া লিগের অভাব। প্রতিবছর যে লিগ অনুষ্ঠিত হয়, সেটি কার্যত নামকাওয়াস্তে। ফলে জাতীয় দলের প্রস্তুতি অনেকটাই নির্দিষ্ট একটি খেলোয়াড় গোষ্ঠী, ক্যাম্প এবং আন্তর্জাতিক ম্যাচের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার জন্য নিয়মিত প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হচ্ছে না। একজন খেলোয়াড়ের জায়গা নেওয়ার জন্য অন্য একজনকে যদি নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ না দেওয়া হয়, তাহলে জাতীয় দলের জায়গার জন্য লড়াই কিভাবে তৈরি হবে?
নতুন খেলোয়াড়দের আনার প্রধান পথ বর্তমানে অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-২০ দল। কিন্তু সেখান থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়দের সিনিয়র পর্যায়ে নিজেদের প্রমাণ করার জন্য নিয়মিত মঞ্চ নেই। তাই একই খেলোয়াড়দের ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে জাতীয় দলের আশপাশে রাখা অস্বাভাবিক নয়।
সমস্যা কেবল মাঠের নয়। খেলোয়াড়দের থাকা-খাওয়ার পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বাফুফে ভবনে সাত-আটজন খেলোয়াড়কে একটি কক্ষে গাদাগাদি করে থাকার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে। জীর্ণশীর্ণ ও অস্বস্তিকর পরিবেশে থেকে এশিয়ান কাপ বা এশিয়ান গেমসের মতো আসরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করার প্রত্যাশা কতটা বাস্তবসম্মত?
উচ্চ পর্যায়ের ফুটবলে অনুশীলনের পাশাপাশি প্রয়োজন পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, বিশ্রাম, পুনর্বাসন এবং চিকিৎসা-সহায়তা। একজন খেলোয়াড়ের উন্নয়নকে কেবল মাঠের অনুশীলন দিয়ে বিচার করা যায় না। সে কোথায় থাকছে, কী খাচ্ছে, কিভাবে বিশ্রাম নিচ্ছে—এসবও পারফরম্যান্সের অংশ।
এখানেই একটি কাঠামোবদ্ধ নারী লিগের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। ১০ দলের একটি প্রতিযোগিতামূলক লিগ হতে পারে সেই পথের সূচনা। প্রতিটি দলে জাতীয় দলের খেলোয়াড়ের সংখ্যা সীমিত রাখা গেলে ক্লাবগুলোকে তরুণ খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে। ফলে জায়গা পাওয়ার লড়াই বাড়বে। জাতীয় দলের কোচের হাতে তৈরি হবে বড় খেলোয়াড় পুল।
আর্মি, পুলিশ এবং বিকেএসপির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে নারী ফুটবলার তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এগুলোকে একটি সুসংগঠিত উন্নয়ন-ব্যবস্থার অংশ করা গেলে জাতীয় দলের জন্য নিয়মিত খেলোয়াড় তৈরি করা সম্ভব। একজন খেলোয়াড় জাতীয় দলের ক্যাম্পে আসার পর তাকে তৈরি করার চেয়ে ক্লাব পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা অনেক বেশি কার্যকর।
সমস্যা কেবল খেলোয়াড় তৈরিতেই নয়, কোচিং কাঠামোতেও প্রশ্ন রয়েছে। লাইসেন্স পাওয়ার পর একজন কোচ দীর্ঘদিন মাঠে কাজ না করেও একই অবস্থায় থাকবেন—এমন ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেটিও ভাবার সময় এসেছে। কোচদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স উন্নয়ন, মাঠে অনুশীলন পরিচালনা এবং ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা, নারী ফুটবলের উন্নয়ন কোনো এক ব্যক্তি, একটি বয়সভিত্তিক দল কিংবা শুধু জাতীয় দলের ক্যাম্পের ওপর নির্ভর করে হতে পারে না। দরকার একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন-ধারা—স্কুল ও একাডেমি থেকে খেলোয়াড় উঠে আসবে, অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-২০ পেরিয়ে সিনিয়র ক্লাব ফুটবলে খেলবে, সেখান থেকে জাতীয় দলে জায়গার জন্য লড়াই করবে।
উত্তর কোরিয়ার কাছে ১০-০ গোলের পরাজয় সেই কাঠামোর দুর্বলতাগুলো আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। কোচ বদলালে একাদশ বদলাবে, কৌশল বদলাবে। কিন্তু খেলোয়াড় তৈরির ব্যবস্থা, প্রতিযোগিতামূলক লিগ, কোচিং কাঠামো এবং খেলোয়াড়দের জীবনযাপনের মৌলিক পরিবেশ না বদলালে এশিয়ার শীর্ষ দলগুলোর সঙ্গে ব্যবধান কমানো কঠিন হবে।
বাংলাদেশ নারী ফুটবলকে তাই কেবল পরের ম্যাচের জন্য নয়, পরের প্রজন্মের জন্যও প্রস্তুত হতে হবে।
এবং সেই প্রস্তুতির প্রথম শর্ত হতে পারে—নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক নারী লিগ এবং খেলোয়াড়দের জন্য একটি সম্মানজনক জীবনযাপনের পরিবেশ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন