প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
খুলনার উপকূলীয় কয়রা অঞ্চলের প্রান্তিক জনগণের জন্য স্বাস্থ্যসেবায় আশার আলো দেখা দিয়েছে, যদিও নানা সংকট বিদ্যমান। তীব্র জনবল সংকট এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পুনরায় অপারেশন থিয়েটার চালু হওয়া এবং বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহের ফলে অবহেলিত এলাকার বাসিন্দারা নতুনভাবে আশার আলো দেখছেন।সুবিধাভোগীরা জানিয়েছেন, হাসপাতালটিতে দীর্ঘদিন অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, অপ্রতুল বেড সংখ্যা, জলাবদ্ধতা এবং বিশুদ্ধ পানির অভাব ছিল। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর অপারেশন থিয়েটার (ওটি) পুনরায় চালু হয়েছে। গাইনি, সার্জারি এবং এ্যানেস্থেশিয়া ডাক্তার পোস্টিং না থাকলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অন্য উপজেলা থেকে নির্দিষ্ট দিনে নিয়মিত সিজার, মহিলাদের জরায়ু অপারেশনের মতো জটিল অস্ত্রোপচার করছে। রোগীদের জন্য ওষুধও সরবরাহ করা হচ্ছে।ফলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুলনার উপকূলীয় কয়রা অঞ্চলের প্রায় ৩ লাখ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসা হচ্ছে উপজেলার ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এ হাসপাতাল। যেখানে ৪২ জন চিকিৎসকের অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত মাত্র ১৫ জন চিকিৎসক। তাদের মধ্যে ডেপুটেশন ও ছুটিসহ বিভিন্ন কারণে নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন মাত্র ১২ জন চিকিৎসক।এছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট এবং অন্যান্য জনবলও কম রয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল সংকট থাকা সত্ত্বেও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ রেজাউল করিম এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের উদ্যোগে এখানকার চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সমন্বয় করে দক্ষতার সঙ্গে নানা সংকট মোকাবেলা করা হচ্ছে।হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন এবং অন্তর্বিভাগে ৩৫ থেকে ৫০ জন রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছেন, যা বিগত কয়েক বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। হাসপাতালে এনসিডি কর্নার নামে একটি নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে, যেখানে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং হাঁপানি রোগীদের বিশেষ সেবা দেওয়া হচ্ছে।ছোট বাচ্চাদের জন্য দুগ্ধ পান করার ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার এবং শিশুদের খেলার জন্য কিডস কর্নারও রয়েছে। এছাড়া বহির্বিভাগে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা সেবা চালু আছে। বিনামূল্যে বিভিন্ন রোগের ঔষধ প্রদান করা হচ্ছে। রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতের জন্য সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। পুরো হাসপাতালের আন্তঃবিভাগ, জরুরি বিভাগ, নার্সেস ডিউটি রুমে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আইপিএস সেট করায় লোডশেডিং কমছে।
হাসপাতাল প্রাঙ্গণে আধুনিকায়ন, দৃষ্টিনন্দন জামে মসজিদ সংস্কার, মোটরসাইকেল পার্কিং শেড এবং পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে। তবে হাসপাতালের মূল ভবন নির্মাণাধীন থাকায় এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম এবং প্যাথলজি সেবা ব্যহত হচ্ছে। প্যাথলজি না থাকলেও কর্তৃপক্ষের নিজস্ব উদ্যোগে সবসময়ই ইসিজি, ডায়াবেটিস পরীক্ষার স্ট্রিপ, প্রেগনেন্সি টেস্ট কীট, হার্ট অ্যাটাক পরীক্ষার জন্য কার্ডিয়াক ট্রপোনিন আই ডিভাইস, ডেঙ্গু পরীক্ষা কীট, গর্ভের বাচ্চার কন্ডিশন বুঝতে ফিটাল ডপলার মেশিনের ব্যবস্থা রয়েছে, যা রোগীদের সেবায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এছাড়া সাপে কাটা রোগীর জন্য জীবন রক্ষাকারী এন্টিভেনম পর্যাপ্ত আছে। এ্যান্টি র্যাবিস ভ্যাক্সিনও রয়েছে এবং দরিদ্র রোগীদের জন্য সমাজ সেবা দপ্তরের মাধ্যমে বিনামূল্যে ঔষধ পাওয়ার সুবিধা রয়েছে।
দক্ষিণ বেদকাশী থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আনজুমারা বেগম বলেন, ‘এক সময় নিয়মিত চিকিৎসক ও ওষুধ পাওয়া যেত না। হাসপাতালে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। এখন হাসপাতালে আসলেই চিকিৎসকের দেখা মেলে। আমরাও আন্তরিকতার সঙ্গে আধুনিক ও উন্নত সেবা পাচ্ছি। বিনামূল্যে ওষুধও দিচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।’
উপজেলার সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে রিয়াদ শেখের গ্রাম। হাসপাতালে মাকে ভর্তি করেছিলেন তিনি। হাসপাতালের সেবা নিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানকার চিকিৎসক ও নার্সরা অনেক আন্তরিক। হাসপাতাল থেকে ওষুধ খাবার দেওয়াসহ নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছে। হাসপাতালের ভেতরের পরিবেশটাও এখন অনেক সুন্দর। দুই বছর আগে একবার এসেছিলাম, তখন আর এখন অনেক পরিবর্তন।’
কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল করিম বলেন, ‘হাসপাতালটিতে সেবার মান বাড়াতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু কাজ ইতিমধ্যে শেষ করেছি। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকসহ শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ এবং চলমান উন্নয়নকাজ শেষ করা জরুরি।’
তিনি আরো বলেন, বর্তমান জনবল দিয়ে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে সেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত হলে হাসপাতালের সেবার পরিধি ও মান আরো অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে। হাসপাতালের চলমান নতুন ভবনের কাজটি শেষ হলে ভোগান্তি আরো লাঘব হবে।
তবে স্বাস্থ্য সেবা উন্নতকরণে স্থায়ীভাবে গাইনি, সার্জারি, এ্যানেস্থেশিয়া ডাক্তার এবং এ্যম্বুলেন্সের জন্য একজন সরকারি ড্রাইভার ও প্যাথলজির জন্য একজন ল্যাব টেকনিশিয়ান পদায়ন জরুরি বলেও তিনি জানান।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন