প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মহান আল্লাহর রহস্যময় সৃষ্টির মধ্যে একটি হলো কালি। যদিও শব্দটি শুনতে বা পড়তে সাধারণ তরল পদার্থের মতো মনে হয়, মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকে অসাধারণ ক্ষমতাবান করে গড়েছেন। কালি বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে এবং এর ব্যবহারও বহুবিধ। উদাহরণ হিসেবে কলমের ডগা থেকে বের হওয়া কালির কথা উল্লেখ করা যায়। এটি কখনো জ্ঞান সংরক্ষণের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, কখনো ইতিহাসের সাক্ষী, কখনো মুক্তির পরোয়ানা, আবার কখনো বিচারকের কলমের ডগা বেয়ে কারো জীবন-মৃত্যুর ফয়সালা নির্ধারণ করে।
রাষ্ট্র বা বিশ্বনেতাদের কলমের ডগা থেকে বের হওয়া এক ফোঁটা কালি কোটি কোটি মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে, আবার একটি কলমের খোঁচায় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। এটি সভ্যতার সংরক্ষণের অন্যতম হাতিয়ারও হতে পারে। কারণ কলমের কালিতে লিপিবদ্ধ হয় মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, আবিষ্কার ও সভ্যতার অগ্রযাত্রা। মানুষের স্মৃতি সীমিত এবং আয়ু ক্ষণস্থায়ী।
তবে কালিতে লেখা জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আলো ছড়াতে সক্ষম। যেমন—প্রাচীনকালের বহু গুণী লেখক পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তাঁদের কলমের কালিতে সঞ্চিত জ্ঞান আজও বেঁচে আছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের মধ্যে তাঁদের চিন্তা ও মেধার ফসল বণ্টন করে যাচ্ছে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ জ্ঞানচর্চার অন্যতম মাধ্যম কলমের কথা উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘পড়ুন, আর আপনার রব মহামহিমান্বিত। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে তা শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না।’ (সুরা : আলাক, আয়াত : ৩-৫)
সুরা আলাকের এই আয়াতগুলো মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়, জ্ঞান অর্জন আল্লাহর এক মহান নিয়ামত এবং কলম সেই জ্ঞান সংরক্ষণের অন্যতম মাধ্যম। আর কলমের অন্যতম উপাদান হলো কালি। মহান আল্লাহর সৃষ্ট এই শক্তিশালী ও অতিপ্রয়োজনীয় পদার্থের কথাও পবিত্র কোরআনে এসেছে। মহান আল্লাহ বলেন, “বলুন, ‘আমার রবের কথা লেখার জন্য সমুদ্র যদি কালি হয়ে যায় তবে সমুদ্র নিঃশেষ হয়ে যাবে আমার রবের কথা শেষ হওয়ার আগেই। যদিও এর সাহায্যার্থে অনুরূপ আরো সমুদ্র নিয়ে আসি।’ (সুরা : কাহফ, আয়াত : ২৭)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘আর জমিনে যত গাছ আছে তা যদি কলম হয়, আর সমুদ্র (হয় কালি), তার সঙ্গে কালিতে পরিণত হয় আরো সাত সমুদ্র, তবু আল্লাহর বাণীসমূহ শেষ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ২৭)
এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, কলমের কালি জ্ঞান সংরক্ষণের অন্যতম মাধ্যম।
কখনো কখনো আবার কলমের কালি হক-বাতিলে পার্থক্যকারী হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে কালির সঙ্গে ন্যায়-অন্যায় সম্পৃক্ত হয়ে যায়। যেমন—বিচারকের কলম থেকে বের হওয়া কিছু শব্দ কারো কারাবাস কিংবা মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আবার একই কালিতে লেখা হতে পারে নিরপরাধ মানুষের বেকসুর খালাসের রায়। শুধু আদালতের বিচারকের হাতে নয়, অফিস-আদালত, সংবাদমাধ্যম ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রকদের হাতে থাকা কলমের কালিও ন্যায়-অন্যায়ের মাধ্যম হয়ে থাকে। প্রতিটি দায়িত্বশীলের উচিত ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে তা ব্যবহার করা। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল, প্রত্যেকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ২৪০৯)
এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, প্রত্যেকের দায়িত্বের পরিধিতে প্রত্যেকের সৎ থাকা উচিত। হাতে দায়িত্বের কলম পেয়ে তার কালির সঙ্গে নিজের অন্তরের কালি গুলিয়ে আমানতের খিয়ানত করলে, তার জন্য পরকালে অবশ্যই জবাব দিতে হবে। কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর সামনে উত্থাপিত হওয়া তাদের আমলনামায় দেখা যাবে, আল্লাহর নিয়োজিত ফেরেশতাদের কলম তাদের বিরুদ্ধে লিখে রাখবে।
তাহলে কলমের কালি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্তরের কালির দ্বারা প্রভাবিত হওয়া যাবে না। অন্তরের কালির প্রভাবে করা অপরাধকে আইনসিদ্ধ করতে মিথ্যা অপবাদের মাধ্যমে অন্যের চরিত্রে কালি মেখে তাকে সমাজের সামনে হেয় করা যাবে না। পবিত্র কোরআনে এ ব্যাপারে সতর্ক করে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর কেউ কোনো দোষ বা পাপ করে পরে সেটা কোনো নির্দোষ ব্যক্তির প্রতি আরোপ করলে সে তো মিথ্যা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১১২)
মনে রাখতে হবে, মানুষের গায়ের রং কালো হওয়া নিন্দনীয় নয়, কিন্তু অন্তর কালো হওয়া নিন্দনীয়। উল্লিখিত আলোচনা দ্বারা বোঝা যায়, মহান আল্লাহর সৃষ্ট এই তরল পদার্থ প্রকৃত অর্থ ও রূপক অর্থের সমন্বয়ে আমাদের বহু বিষয়ে শিক্ষা দেয়। এটি কখনো তা জ্ঞানের আলো, কখনো ন্যায়বিচারের দলিল, কখনো অপবাদের অন্ধকার, আবার কখনো মানুষের দায়িত্ববোধের পরীক্ষা। একই কালি দিয়ে সত্য লেখা যায়, মিথ্যাও লেখা যায়; মানুষের সম্মান রক্ষা করা যায়, ধ্বংসও করা যায়। পার্থক্যটা কালিতে নয়, বরং কলমধারীর বিবেক ও নিয়তে। মহান আল্লাহ সবার নিয়ত বিশুদ্ধ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন