প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
টানা কয়েক দিনের ভারি বর্ষণ, জোয়ারের পানি এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার ফলে নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়াতে কৃষি খাতে একটি বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। এ সময় উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে, যার ফলে আউশ ধান, বীজতলা, মৌসুমি সবজি, ফল, মরিচ ও পানের বরজসহ প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে প্রায় ৮০ হাজার কৃষক আর্থিক সংকটে পড়েছেন। কৃষি বিভাগ প্রাথমিকভাবে ২০ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতির আশঙ্কা করছে।
উপজেলার চরকিং চরকৈলাশ গ্রামের কৃষক কামাল উদ্দিন (৫৫) জানান, তিনি জাহাজমারা–নলচিরা প্রধান সড়কের পাশে কৃষি কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন। কাছে গিয়ে প্রশ্ন করার পর কামাল জানান, গত ১০ দিন আগে ৩০ ডিসিমিল জমিতে ৬০ কেজি আমনের বীজ বপন করেন। কিন্তু টানা বর্ষণের কারণে তাঁর বীজতলাটি পানির নিচে তলিয়ে যায়। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে তিনি চারপাশে উঁচু আড়ী বেঁধে চেষ্টা করেছেন। তবে এর ফলে কোন লাভ হয়নি। পানি শুকানোর সাথে সাথে তাঁর বীজতলার ছোট ছোট ধানের চারা নুয়ে পড়ছে। তিনি এখন পুনরায় বীজ বোপনের কথা ভাবছেন, কিন্তু এজন্য তাঁকে অনেক টাকা ব্যয় করতে হবে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, গত কয়েকদিন ধরে স্যালো মেশিন দিয়ে বীজতলার পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেছেন। নিজেদের শ্রমিক নিয়োগ করে পানির নিষ্কাশনের চেষ্টা করেছেন। তবে দেখা যাচ্ছে, চারা গুলো হলুদ থেকে লাল হয়ে যাচ্ছে। তিনি উপ- সহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে জানিয়েছিলেন, তিনি পুনরায় বীজতলা তৈরি করতে বলেছেন। গাছগুলো দিয়ে ধান রোপণ করা সম্ভব হবে না বলে পরামর্শ দিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তা।
শুধু কামাল উদ্দিনের এ অবস্থা নয়, উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভার সব এলাকাতেই একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চরকিং ও চরঈশ্বর ইউনিয়নে সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু ভারি বর্ষণের সময়ে এই দুই ইউনিয়নের অধিকাংশ সবজি খেত তলিয়ে গেছে এবং এখন পানি চলে যাওয়ার পর সবজি গাছগুলো গোড়ায় পচা যাচ্ছে। অনেক কৃষক নিজেরা ঋণ নিয়ে এই সবজি চাষ শুরু করেছেন এবং এখন তাঁরা ক্ষেতে বসে মাথায় হাত নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন।
চরঈশ্বর ইউনিয়নের পূর্ব গামছাখালী গ্রামে কৃষকদের মধ্যে একজন, মোতাহের হোসেন, জানান, তিনি প্রায় এক একর জমিতে ঝিংগা চাষ করেছেন। কিন্তু টানা বর্ষণে গাছের গোড়া পচে গেছে এবং এখন গাছ লাল হয়ে যাচ্ছে। অনেক গাছ এখনো সতেজ মনে হলেও অধিকাংশ গাছ মরে যাচ্ছ। তিনি এখন নতুন করে সবজি চাষের চেষ্টা করছেন। মোতাহের উদাহরণ থেকে বুঝা যাচ্ছে, এনজিও থেকে টাকা নিয়ে তিনি এই সবজি ক্ষেত তৈরি করেছেন। এতে প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
গামছাখালী গ্রামের প্রবীন কৃষক নাজিম উদ্দিন বলছেন, কৃষকরা অতি বৃষ্টির কথা চিন্তা করে সবজি ক্ষেতে উঁচু আড়া বেঁধে চাষ করেছেন। কিন্তু অতিরিক্ত বৃষ্টিতে তাও পানিতে তলিয়ে গেছে। হাতিয়ার প্রতিটি ইউনিয়নে সবজি চাষের অবস্থা এখন অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকারিভাবে বীজ, সার ও কীটনাশক দেওয়া হয় বিভিন্ন সময়, কিন্তু এবার নগদ অর্থ না দেওয়া হলে কৃষকরা উঠে দাঁড়াতে পারবেন না। কারণ অনেকেই নিজেদের সহায় ও মূলধন খরচ করেছেন এই চাষে। দিয়ে সরকারের সহায়তা ছাড়া নতুন করে সবজি চাষ সম্ভব হবে না।
নাজিম আরও জানান, গত ১০ বছরে হাতিয়াতে এমন বৃষ্টি হয়নি। কৃষকরা এ জন্য আগাম প্রস্তুতি নিতে পারেননি, তাই ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, টানা বর্ষণে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রায় ২১ হাজার ৫২০ হেক্টর আউশ ধান, ১ হাজার ৯২০ হেক্টর আমন বীজতলা, ৯৫০ হেক্টর মৌসুমি শাকসবজি, ৫৮ হেক্টর বিভিন্ন ফলের বাগান, ৪ হেক্টর মরিচ, এবং ১০ হেক্টর পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ৮০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আনুমানিক ক্ষতির পরিমাণ ২০ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল বাছেদ সবুজ জানান, প্রতিটি ইউনিয়নে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন। তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে গিয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন। টানা বৃষ্টিতে হাতিয়াতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি কৃষকের হয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা একটি প্রতিবেদন জেলা অফিসে পাঠিয়েছি, তাতে ইউনিয়নভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য বরাদ্ধ দেওয়া হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন