প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একসময় যা ছিল বাঙালির প্রাত্যহিক খাবারের অনুষঙ্গ, সেই রুপালি ইলিশ এখন সাধারণ মানুষের জন্য রীতিমতো বিলাসী পণ্য। তবে মৎস্য গবেষকরা পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে বড় উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, যাতে মাছটি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ফিরে আসে। নদীর জলাশয়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার, প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত সংকট মোকাবিলার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে তারা আশাবাদী।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের নদী কেন্দ্রের (চাঁদপুর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তায়েফা আহমেদ জানান, দূষণ, নাব্যতা সংকট ও পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় উজানের দিকে ইলিশের বিচরণ কমেছে। বর্তমানে ইলিশের মজুত, বিচরণ ও উৎপাদন নিয়ে ‘পপুলেশন ডায়নামিকস অ্যান্ড স্টক অ্যাসেসমেন্ট অব টেনুয়ালোসা ইলিশা ইন বাংলাদেশ’ গবেষণাসহ ছয়টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। ড. তায়েফা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “নদীর জলাশয়কে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারলে ইলিশের আগের প্রাচুর্য আবারও চাঁদপুরে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”
মৎস্য গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে মোট ৫ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল, যার মধ্যে চাঁদপুরে উৎপাদন ছিল ৩৩ হাজার ৯৯২ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সারাদেশে উৎপাদন কমে ৫ লাখ মেট্রিক টনে নামলেও চাঁদপুরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ৪৭২ মেট্রিক টনে। তবে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা দিয়েছে; ইলিশের ডিম ও রেণু পোনার উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২৪ সালে সারাদেশে ৮ লাখ ৮৪ হাজার ৮০২ কেজি ডিম উৎপাদন হলেও ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৯১ হাজার ৫৬৪ কেজিতে। ফলে রেণু পোনা ও বেঁচে থাকা জাটকার সংখ্যা আনুপাতিক হারে হ্রাস পেয়েছে। এর প্রভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চাঁদপুরে ইলিশের উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৬৫৪ মেট্রিক টনে।
চাঁদপুরের জেলেরা উৎপাদন ও নদীতে মাছের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। রাজরাজেশ্বরের জেলে বাচ্চু বেপারি ও খলিল জানান, নদীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল টেনেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। উপরন্তু তেলের দাম বৃদ্ধিতে জীবিকা নির্বাহ করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
নদীতে সরবরাহ কম থাকায় চাঁদপুরের বড়স্টেশন মাছঘাটে দাম বেড়ে গেছে আকাশচুম্বী। স্থানীয় ব্যবসায়ী মেজবাহ উদ্দিন ও সম্রাট বেপারি জানান, ১ কেজি ওজনের ইলিশ ২৪০০ থেকে ২৫০০ টাকা এবং ৫০০ থেকে ৮০০ গ্রামের ইলিশ ১৭৫০ থেকে ২২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় কেজিতে ৫শত থেকে ৬শত টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। অসাধু উপায়ে প্রজনন ও জাটকা মৌসুমে নিধন এবং সাগরে ট্রলিং জালের ব্যবহারকে ইলিশের ঘাটতির প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করছেন আড়তদার ও পাইকাররা।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফকরুল ইসলাম জানান, ইলিশের দাম কমাতে উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প নেই। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিন পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত ও কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। মতলব উত্তরের ষাটনল থেকে হাইমচরের চরভৈরবী পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার নদীতে পরিচালিত হবে কঠোর অভিযান।
নিষেধাজ্ঞাকালীন চাঁদপুরের ৪২ হাজার ৭৯০ জন নিবন্ধিত জেলেকে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় ২৫ কেজি করে চাল সহায়তা দেওয়া হবে। চাঁদপুর নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজমগীর হোসাইন জানান, নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী জেল-জরিমানাসহ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গবেষকদের বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ, ডুবোচর খনন এবং প্রজনন মৌসুমে প্রশাসনিক কঠোরতা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে আবারও ইলিশের চেনা প্রাচুর্য ফিরে আসবে এবং মাছটি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে বলে প্রত্যাশা করছেন চাঁদপুরবাসী।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন