০১:৫৬ পি.এম
পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার মাজপাড়া ইউনিয়নের হাতীগাড়াগ্রামের কৃষক সাজ্জাদুল ইসলাম রুবেল মাচা পদ্ধতিতে লাউ চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এই সবজিখ্যাত উপজেলায় মাচা পদ্ধতিতে লাউয়ের আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও লাউ শীতকালীন সবজি, তবে উপজেলার চাষিরা সারা বছরই লাউয়ের আবাদ করছেন।
মাচা পদ্ধতিতে লাউ চাষের ফলে পোকামাকড়ের আক্রমণ কমে গেছে। কীটনাশক প্রয়োগ না করে লাউয়ের আবাদ করায়, এই উপজেলার উৎপাদিত লাউয়ের চাহিদা এখন দেশজুড়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।
কৃষক সাজ্জাদুল ইসলাম রুবেলের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে আরও অনেক কৃষক লাউ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। উপজেলার মধ্যে লাউয়ের চাষাবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অল্প খরচে বেশি মুনাফা হওয়ায় লাউ চাষের প্রসার ঘটবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
আরও পড়ুন: কৃষিমন্ত্রী: নিয়মবহির্ভূত সবকিছুই পরিচ্ছন্নতার আওতায় আসবে
তিনি প্রতি বছরের মতো এবারো কৃষি অধিদপ্তরের পরামর্শে ১ বিঘা জমিতে লাকী লাউয়ের চারা রোপণ করেছেন। নিজের পৈতৃক জমিতে লাকী জাতের লাউয়ের চারা রোপণ করার পর, তার এই ১ বিঘা জমিতে লাউ ধরা পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২০-২৫ হাজার টাকা। চলতি মৌসুমে তিনি এখন পর্যন্ত প্রায় লাখ টাকার লাউ বিক্রয় করেছেন।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, লাউ চাষে গোবর, ছাই, কচুরিপানা এবং পানিই প্রধান উপাদান। রাসায়নিক সারের ব্যবহার খুব একটা নেই বললেই চলে। তাই এক বিঘা জমিতে লাউ চাষে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার বেশি খরচ হয় না।
অন্য ফসলের তুলনায় লাউ চাষে শ্রমের পরিমাণও তুলনামূলক কম। শীতকালীন সবজি হিসেবে ভোক্তাদের কাছে লাউয়ের চাহিদা প্রচুর এবং বাজার দরও ভালো থাকায় প্রতি বিঘা জমির লাউ ১ লাখ ১০ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করা সম্ভব।
এছাড়া লাউয়ের ডগা বিক্রি করে কৃষকরা ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করেন। তুলনামূলকভাবে শ্রম ও ব্যয় কম হওয়ায় মাচা পদ্ধতিতে লাউ চাষ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বেশি ফলন ও ভালো দাম পাওয়ায় খুশি লাউ চাষিরা। লাউসহ নতুন নতুন সবজি চাষে কৃষকদের আগ্রহী করে তুলতে পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন কৃষি বিভাগ।
আরও পড়ুন: কমলগঞ্জে ৬ একর জমিতে টমেটো চাষ, ৩৫ লাখ টাকার বিক্রির আশা ছাদেক হোসাইনের
লাউ চাষি সাজ্জাদুল রহমান রুবেল বলেন, "অন্যান্য ফসলের যে টাকা খরচ করেছিলাম তার অর্ধেক টাকাও ঘরে তুলতে পারিনি। ধানের আবাদেও সার, বিষ ও সেচ খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ।"
তিনি আরও বলেন, "এ বছর মাচা পদ্ধতিতে লাকী জাতের লাউয়ের আবাদ করেছি। লাউ আবাদে সেচ ও শ্রমিক খরচ কম। পোকামাকড়ের আক্রমণ তেমন নেই। ফলে কীটনাশক ব্যবহার না হওয়ায় মানুষ বিষমুক্ত সবজি পাচ্ছে।"
কাকমারি এলাকার কৃষকেরা জানান, এক বিঘা জমিতে মাচা পদ্ধতিতে মার্টিনা জাতের লাউয়ের আবাদে খরচ পড়েছে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। লাউয়ের উৎপাদন অনেক ভালো হয়েছে এবং দামও মোটামুটি ভালো। আমি এক বিঘা জমিতে লাকী জাতের গোলাকার দেশীয়, জাতের লাউয়ের চাষ করেছি।
লম্বা জাতের লাউয়ের চাহিদা কিছুটা কম। গোলাকার দেশীয় জাতের লাউয়ের চাহিদা অনেক ভালো। দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকার ব্যবসায়ীরা আমাদের জমি থেকে লাউ কিনে নিয়ে যাচ্ছে। আশা করি লাভবান হবো।
আরও পড়ুন: পীরগঞ্জে কৃষি উৎপাদিত ফসল গ্রামীণ সড়কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছে
আটঘরিয়া পৌরসভা, চাঁদভা, মাজপাড়া, খিদিরপুর, পারখিদিনপুর, সড়াবাড়িয়া, দেবোত্তর, একদন্ত, লক্ষীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বেশকিছু মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, উর্বর ফসলি জমিতে পরিকল্পিতভাবে কৃষক মাচায় লাউ চাষ করেছেন। উন্নত জাতের লাউ চাষ করায় প্রতিটি মাচায় ডগায় ডগায় ঝুলে আছে লাউ। বর্তমানে বাজারে একটি লাউ প্রকার ভেদে ৩০ টাকা হতে ৩৫-৪০ টাকায় পাইকারি বিক্রি হচ্ছে। বাজারে দাম ভালো পেয়ে খুশি কৃষক।
দেবোত্তর বাজারের ব্যবসায়ী সিরাজ, কামালসহ দশ থেকে পনেরো জন বলেন, "প্রতিদিনই কৃষকরা আমাদের আড়তে লাউ বিক্রি করছেন। আবার অনেকেই পাইকারি কিনে ঢাকা, সিলেট, বরিশাল, চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহরে বিক্রি করে।"
"আমাদের উপজেলার উৎপাদিত লাউ দেখতে অনেক সুন্দর, মসৃণ ও সুস্বাদু হওয়ায় চাহিদা ভালো। একদিকে কৃষকরা যেমন উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছেন, তেমনি বিক্রি করেও আমরা লাভবান হচ্ছি। তাছাড়া যে সকল এলাকায় সবজি আবাদ হয় না, সে এলাকার মানুষের সবজির চাহিদা পূরণ হচ্ছে।"
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদা মোতমাইন্না জানান, লাউ সাধারণত শীতকালীন সবজি হলেও বর্তমানে শীতের আগে আগাম সবজি হিসেবে লাউ চাষের কদর বেড়েছে। লাউয়ের বেশ কয়েকটি জাত রয়েছে, তার মধ্যে ডায়না, জিরান, মার্টিনা, শীতালাউ, লাকী ও মার্শাল জাতের লাউ আবাদ হয়ে থাকে। তিনি বলেন, "আমরা কৃষকদের মাঠ দিবসের মাধ্যমে মাচা পদ্ধতিতে লাউ চাষের পরামর্শ দিলে কৃষকরা বর্ষার শেষ এবং শীতের শুরুতে কয়েকবছর মাচা পদ্ধতিতে লাউয়ের আবাদ করে বেশ লাভবান হচ্ছেন।"
আরও পড়ুন: রাজিবপুরে বাদামের বাম্পার ফলনের আশা, ৮৬৭ হেক্টর চাষের পরিকল্পনা
উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা পৌরসভা ব্লক জাহিদল হক বলেন, "এলাকার কৃষকরা আগাম লাউ চাষ করে বেশ লাভবান হওয়ার পাশাপাশি সবজির ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।"
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন