প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দীর্ঘকাল ধরে পর্যটনের সাফল্য মূলত পর্যটকের সংখ্যা, হোটেল কক্ষ ব্যবহারের হার এবং ব্যয়ের ভিত্তিতে পরিমাপ করা হয়ে আসছে। তবে বর্তমানে বিশ্বের অনেক জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র অতিরিক্ত পর্যটকের চাপের কারণে সংকটে পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বিচ্ছিন্ন বোধ করার কারণ হচ্ছে পর্যটকের চাপ বৃদ্ধি, যা অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, সংস্কৃতির বাণিজ্যিক রূপ নিচ্ছে এবং পরিবেশের ক্ষতি করছে। ফলে পর্যটন বৃদ্ধি সত্ত্বেও স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার মান হ্রাস পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটনের সাফল্য শুধুমাত্র সংখ্যা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। যদি স্থানীয় মানুষের কল্যাণ, পরিবেশের সুরক্ষা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার প্রতি গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তাহলে পর্যটন দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ভবিষ্যতে সফল পর্যটনকেন্দ্র হবে সেগুলো, যারা পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধির পরিবর্তে স্থানীয় মানুষের কল্যাণ, সংস্কৃতি এবং পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্ব দেবে। এইভাবে স্থানীয় জনগণ উপকৃত হবে, অংশীদারদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে এবং পর্যটনকেন্দ্রের নিজস্ব পরিচয় বজায় থাকবে।
পাকিস্তানের পর্যটন খাত দেখাচ্ছে যে, পরিকল্পনা ছাড়া শুধুমাত্র পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি কতটা ব্যর্থ হতে পারে। দেশটিতে পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হলেও কার্যকর পরিকল্পনা ও বাস্তব ফলাফলে তা খুব কমই রূপ নেয়। ঈদের ছুটি এবং সরকারি ছুটির সময় পাকিস্তানের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যানজট, আবর্জনা এবং প্রয়োজনীয় সেবার সংকট দেখা দেয়। এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা ভোগান্তিতে পড়েন এবং পর্যটকদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সুযোগ বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয়।
পর্যটকের ভিড় নিজে সমস্যা নয়, সমস্যা হলো তা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা। পর্যাপ্ত নির্দেশনা এবং আচরণবিধি না থাকায় অনেক পর্যটনকেন্দ্রে উচ্চস্বরে গান, বেপরোয়া আচরণ এবং বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। এর ফলে ভ্রমণের আনন্দ নষ্ট হয় এবং স্থানীয় বাসিন্দারাও ভোগান্তিতে পড়েন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবের কারণে পর্যটনের ধরন বদলে যাচ্ছে। অনেকেই কোনো স্থান ও তার সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার চেয়ে ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করতেই বেশি আগ্রহী। এর ফলে পর্যটনকেন্দ্রগুলো ছবি তোলার জায়গায় পরিণত হচ্ছে এবং হারিয়ে যাচ্ছে সেখানকার প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং স্থানীয় মানুষের প্রতি সম্মান।
পাকিস্তানে পর্যটন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান এবং বোঝাপড়ার ঘাটতি রয়েছে। কথার এবং বাস্তবতার এই ব্যবধান পর্যটনশিল্পের জন্য বিপজ্জনক। এর ফলে গন্তব্যের সুনাম নষ্ট হয়, দর্শনার্থীরা হতাশ হয়ে ফিরে যান, স্থানীয় মানুষ নিজেদের শোষিত মনে করেন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায়। ফলে কোনো স্থান তার সৌন্দর্য এবং সংস্কৃতির বদলে বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনার জন্য পরিচিত হয়ে ওঠে।
প্রকৃত পর্যটনের সাফল্য নির্ভর করে সবার জন্য সুফল নিশ্চিত করার ওপর। পর্যটকদের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ এবং খাঁটি অভিজ্ঞতা, শেখার সুযোগ এবং সম্মানজনক পরিবেশ। স্থানীয় জনগণের জন্য প্রয়োজন আয়, মর্যাদা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ এবং সংস্কৃতি ও পরিবেশের সুরক্ষা। ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, শুধুমাত্র মৌসুমি পর্যটকের ভিড়ের ওপর নির্ভরশীলতা নয়।
শুধু পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি করলেই পর্যটনশিল্প শক্তিশালী হয় না। দশ লাখ পর্যটক যদি স্থানীয় অর্থনীতিতে সামান্য অবদান রাখেন, স্থানীয় রীতিনীতি উপেক্ষা করেন এবং অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেন, তাহলে তাদের চেয়ে কমসংখ্যক সেই পর্যটকেরাই বেশি মূল্যবান, যারা দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন, দায়িত্বশীলভাবে অর্থ ব্যয় করেন এবং স্থানীয় জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে অর্থপূর্ণভাবে যুক্ত হন।
পাকিস্তানের জন্য এর অর্থ হলো, শুধুমাত্র স্লোগান দিয়ে নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে পর্যটনশিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এর জন্য পর্যটনকেন্দ্রের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষিত পেশাজীবী এবং স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ করতে হবে। ছুটির দিনের বিশৃঙ্খলা সামলানোর পরিবর্তে সারা বছরের জন্য পরিকল্পনা করতে হবে। পাশাপাশি, শুধুমাত্র ছবি তোলার উপযোগী স্থান তৈরি নয়, স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে পর্যটন পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন করতে হবে।
পাকিস্তানের অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় সমৃদ্ধ করতে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দায়িত্বশীল পরিকল্পনা ছাড়া এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব নয়। বেশি পর্যটক মানেই বেশি লাভ নয়। দায়িত্ববোধহীন পর্যটন স্থানীয় জনগণের শোষণের কারণ হতে পারে। অন্যদিকে সঠিক পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পর্যটন অর্থনীতি, সমাজ এবং সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তাই অর্থবহ এবং দায়িত্বশীল পর্যটন গড়ে তোলার সময় এখনই।
পর্যটনের সাফল্য পরিমাপের ধারণা নতুন করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। শুধুমাত্র পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে, পর্যটক, স্থানীয় জনগণ এবং ব্যবসায়ীদের জন্য প্রকৃত সুফল নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবেশের সুরক্ষা, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয় এবং স্থানীয় মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পাকিস্তানের পর্যটনশিল্পকে এগিয়ে নিতে প্রচলিত চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। পর্যটকদের জন্য প্রকৃত এবং অর্থবহ অভিজ্ঞতা তৈরি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে পর্যটন উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি দক্ষ পর্যটনকর্মী তৈরির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে পাকিস্তানের পর্যটনশিল্প টেকসইভাবে বিকশিত হতে পারে এবং দেশটির পর্যটনকেন্দ্রগুলো দায়িত্বশীল পর্যটনের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। পর্যটনকে নতুনভাবে দেখার এবং এর সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার সময় এসেছে।
মূল লেখাটির লেখক ড. শাব্বির আব্বাস নাকভি প্যালিওঅ্যানথ্রোপোলজিতে পিএইচডি করেছেন। তার গবেষণার প্রধান বিষয় ছিল সিন্ধু নদীর বিবর্তন। এ ছাড়া পর্যটন এবং আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনা বিষয়েও তার পিএইচডি রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন