প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
তেহরানের একটি আবাসিক ভবনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলায় হামেদ মির্জায়ি তাঁর পরিবারের ১২ জন সদস্যকে হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তাঁর ২৬ বছর বয়সী স্ত্রী মুহাদ্দেসাও ছিলেন। তরুণ এই দম্পতি একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছিলেন, সন্তান নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
২০২৬ সালের ৯ মার্চের সেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলা কীভাবে তাঁর পুরো জীবন এলোমেলো করে দিল, আল জাজিরার কাছে তুলে ধরা তাঁর হৃদয়বিদারক অনুভূতির কথা তুলে ধরা হলো:
“বোমা হামলার পর সাতটি মাস কেটে গেছে। কিন্তু আজও, সচেতন হওয়ার মুহূর্তে অনেক দিন আমি নিজেকে সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির সামনেই আবিষ্কার করি—যন্ত্রণা নিয়ে এখনও খুঁজে ফিরি আমার প্রিয়জনদের।
যে বাড়িটিতে হামলা চালানো হয়েছিল, সেটি বানিয়েছিলেন আমার দাদা ও বাবার চাচা। তাঁরা তাঁদের সন্তানদের জন্য ফ্ল্যাটগুলো ভাগ করে দিয়েছিলেন। বছরখানেক আগে যখন আমার বিয়ে হয়, আমি ও আমার স্ত্রী সেই একই ভবনের একটি ফ্ল্যাটে উঠেছিলাম। আমরা কেবলই সন্তান নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমরা তরুণ ছিলাম, সামনে পুরো জীবন পড়ে ছিল। আর ঠিক তখনই নেমে এলো ওই ধ্বংসযজ্ঞ।
মার্চ মাসের ৯ তারিখ ছিল সোমবার। দুপুর ১টার দিকে আমি কাজের উদ্দেশ্যে বের হই। দুপুর আড়াইটার দিকে আমার স্ত্রী আমাকে মেসেজ করে বলে, ফেরার পথে যেন তার জন্য মাথাব্যথার কিছু ওষুধ নিয়ে আসি। সে ঠিক কোন ওষুধটি চায় তা জানতে আমি তাকে ফোন করি, কিন্তু তার নম্বর ব্যস্ত পাচ্ছিলাম। সেদিন আমাদের বাড়িতে মেহমান আসার কথা ছিল, তাই আমি মেহমানের নম্বরে ফোন করি। সেই নম্বরটিও ব্যস্ত পাই। ফোন রেখে আমি ভাবলাম, একটু পর স্ত্রীকে আবারও চেষ্টা করব।
বাড়ি পৌঁছাতে আর মাত্র মিনিট পাঁচেক বাকি, ঠিক তখনই হঠাৎ এক বিকট বাঁশির মতো শব্দ শুনতে পাই। প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটি ঠিক তখনই আঘাত হানে।
বিস্ফোরণের তীব্রতায় আমার পায়ের তলার মাটি কেঁপে ওঠে। তখনও হাতের মুঠোয় ফোন নিয়ে স্ত্রীকে বারবার কল করার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু তার ফোন ছিল নেটওয়ার্কের বাইরে। একে একে পরিবারের সবাইকে—আমার দাদা, বাবা, মা—ফোন দেওয়া শুরু করি। কারও ফোনই কাজ করছিল না।
এত কিছুর পরও আমি ভেবেছিলাম আমার বাড়িতে হয়তো আঘাত লাগেনি। মনে মনে নিজেকে বলছিলাম, কোনোভাবেই তাদের আমার বাড়ি লক্ষ্য করে হামলা করার কথা নয়। হয়তো আমাদের মহল্লার অন্য কোথাও ক্ষেপণাস্ত্রটি পড়েছে। সেই মুহূর্তে আমার একমাত্র আকুতি ছিল কোনোমতে বাড়ি পৌঁছে দেখা যে, সেটা এখনও অক্ষত দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু সেই কয়েক মিনিটের মধ্যেই আরও পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র এসে আঘাত হানে আমাদের বাড়টিতে। সেখানে পৌঁছে দেখি আশেপাশের সব মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে, কিন্তু আমার পা সরছিল না। আমার ঘর যে মাটির সাথে মিশে গেছে, তা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কিন্তু বাস্তবতা ছিল এটাই। দূর থেকেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, সেই সুবিশাল ভবনের কেবল কঙ্কালটুকুই অবশিষ্ট আছে।
আমি যখন সেখানে পৌঁছাই, চারপাশ তখন আগুনে জ্বলছে। আমার মাথায় তখন একটিই চিন্তা—যেকোনোভাবে দ্বিতীয় তলায় উঠে আমার স্ত্রীকে খুঁজে বের করা। কিন্তু দোতলায় ওঠার কোনো সিঁড়ি ছিল না। প্রথম তলার বেশ কয়েকজন প্রতিবেশী ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিলেন। রেড ক্রিসেন্টের কর্মীরা তাঁদের উদ্ধারে সাহায্য করছিলেন।
আমি ভেবেছিলাম অনুসন্ধান চালুর পর ধ্বংসস্তূপের নিচে কোথাও হয়তো আমার পরিবারের মানুষদের জীবন্ত পাওয়া যাবে। কিন্তু তাঁরা পাননি। সেই মুহূর্তে কাউকেই পাওয়া যায়নি, এমনকি তার পরবর্তী ঘণ্টাগুলোতেও না। রাত নেমে এলেও ভবনটি থেকে আর কাউকে বের করা সম্ভব হয়নি। পরিবারের বারোটি মানুষ মুহূর্তেই নিখোঁজ হয়ে গেল, অথচ আমি সেই স্থান ছেড়ে এক পা-ও নড়তে পারছিলাম না।
সেই রাত, তার পরের দিন, তার পরের দিন এবং তারও পর থেকে প্রতিটা দিন—আমি বারবার ফিরে গিয়েছি আমার সেই ধ্বংসস্তূপে। টানা ২০ দিন ধরে আমি সেই ধ্বংসস্তূপ, ক্ষেপণাস্ত্রের অবশিষ্টাংশ আর বিস্ফোরণের ছাই সরিয়ে আমার প্রিয়জনদের খুঁজেছি। কিন্তু সেখানে কিচ্ছু অবশিষ্ট ছিল না।
আমার স্ত্রী মারা গেছে। আমার শ্যালিকা—যে অতিথি হয়ে এসেছিল—সেও মারা গেছে। আমার বাবা-মা, দাদা-দাদী, আমার ফুফা ও ফুফাতো বোন, আমার চাচা, আমার বাবার চাচাতো ভাই, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের সন্তান—সবাই এক হামলায় শেষ হয়ে গেছে। আমার পরিবারের ১২ জন মানুষকে এই হামলায় হত্যা করা হয়েছে, আর মানুষ এখন আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘আমি কেমন আছি?’
আমার খুব মনে পড়ে ওদের কথা। প্রতিটি দিন যাওয়ার সাথে সাথে সেই হাহাকার আরও বাড়ে। প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়তো সময় গড়ালে শোক কিছুটা থিতিয়ে আসবে, মনে হয়তো কিছুটা শান্তি পাব। কিন্তু তা হয়নি। দিন যত যাচ্ছে, আমার নিজেকে তত বেশি নিঃস্ব ও অসুস্থ মনে হয়।
আমি মা-বাবার একমাত্র সন্তান ছিলাম। সব সময় ভাবতাম, নিজের ভাইবোন না থাকলেও আমার এক বিশাল পরিবার আছে যাদের সাথে আমি হেসেখেলে বৃদ্ধ হব। আজীবন আমাদের পুরো বড় পরিবারটি পাশাপাশি এক ছাদের নিচে বাস করেছে। অথচ আজ সেই মানুষগুলো, পরিবারের মধ্যে বইতে থাকা সব ভালোবাসা—সবকিছু এক নিমিষে বিলীন হয়ে গেল।
পুরো পরিবারে একমাত্র আমিই বেঁচে আছি। আমার পরিবারের আর কেউ নেই। আমি এখন সম্পূর্ণ একা।
যুদ্ধ যে কখনোই কোনো ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না—এর জন্য যে কেউ এখনও প্রমাণ চাইলে আমি নিজেই তার জ্যান্ত উদাহরণ। যে কেউ যদি মনে করে যুদ্ধ একটি ভালো বিষয়, তবে তাদের উচিত আমার দিকে তাকানো এবং নিজেকে প্রশ্ন করা: ‘এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কোথায় ভালো কিছু লুকিয়ে আছে?’
যে ভবনে আমার জন্ম, যে ভবনে আমার বাবার জন্ম, যে ভবনে আমি আশা করেছিলাম আমার সন্তানের জন্ম হবে—একটি সেকেন্ডের ভগ্নাংশে তার সবটুকু ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হলো। আমার ঘর আর আমার পরিবারকে এক সাথে মুছে ফেলা হলো। আর যখন আমি তাদের ভীষণ মিস করি, আমি সত্যিই জানি না আমি কার দিকে তাকাব বা কোথায় সান্ত্বনা খুঁজব।
তারা আমাদের বাড়িটি ধ্বংস করার পর সাতটি মাস কেটে গেছে। আজও প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে আমি এই ধ্বংসস্তূপের দিকে এসে দাঁড়িয়ে থাকি। কোনোভাবেই জায়গাটা ছেড়ে দূরে যেতে পারি না। মনে হয় আমার পুরো জীবনটাই এখানে মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে, আর প্রতিদিন আমি ফিরে আসি—যদি আমার জীবনের হারিয়ে যাওয়া কোনো অংশ কুড়িয়ে পাই! কিন্তু এখানে আসলে আর কিছুই বাকি নেই।
কেউ যখন আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি কী ভাবছি বা কেমন বোধ করছি, আমি কোনো উত্তর দিতে পারি না। জীবনে যা কিছু করেছি, সব করেছি পরিবারের হাসিমুখ দেখার জন্য। এখন আমার আর এমন কোনো পরিবারই নেই যাদের জন্য আমি কিছু একটা করতে পারি।
প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করি: ‘আমি কেন এখনও বেঁচে আছি?’ আমার কাছে এর কোনো জবাব নেই।
আমার নিহত পরিবারের সাথে আমার একটাই পার্থক্য—তারা সবাই ধ্বংসস্তূপের নিচে মাটিচাপা পড়ে আছে, আর আমি মৃতদেহের মতো বাইরে হেঁটে বেড়াচ্ছি। এ ছাড়া তাদের সাথে আমার আর কোনো তফাত নেই। পার্থক্য কেবল একটাই, নিহতদের তালিকায় আমার নামটা এখনও ওঠেনি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন