প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভারতের মহারাষ্ট্রের পুনের লোহাগড় দুর্গ থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়াল হত্যার ঘটনায় পুলিশ ৫ হাজার ৫৩ পৃষ্ঠার চার্জশিট জমা দিয়েছে। চার্জশিটটি শনিবার ওড়গাঁও মাভাল আদালতে জমা দেওয়া হয়। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাগদত্তা সিয়া গোয়েল এবং তার প্রেমিক চেতন চৌধুরি সুপরিকল্পিতভাবে কেতন আগরওয়ালকে হত্যা করে। এ হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে চেতন চৌধুরীর বন্ধু রিতেশ হাঙ্গেও অবগত ছিল। পুলিশ অভিযুক্ত তিনজনকেই গ্রেপ্তার করেছে।
পুনে গ্রামীণ পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আদালতে জমা দেওয়া এই চার্জশিটে ৫ জন প্রত্যক্ষদর্শীসহ ১০০ জনেরও বেশি মানুষের জবানবন্দি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রমাণ হিসেবে মোবাইল ফোনের ডেটা, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট, ছবি, কল রেকর্ড এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। চার্জশিটে ১৮ জুন লোহাগড় দুর্গে ২৬ বছর বয়সী কেতনের মৃত্যুর পেছনের ষড়যন্ত্রের বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়ালের সাথে সিয়া গোয়েলের বাগ্দান হয়। তাদের বিয়ের আয়োজন আগামী নভেম্বরে জয়পুরে হওয়ার কথা ছিল। যদিও পারিবারিক কারণে বাগ্দানে সম্মতি দেওয়া হয়েছিল, বিয়েতে সিয়ার মত ছিল না। এই কারণেই প্রেমিক চেতন চৌধুরীর সঙ্গে মিলে কেতনকে হত্যার পরিকল্পনা করে সিয়া।
চার্জশিট অনুযায়ী, অভিযুক্তরা প্রথমে আগরওয়ালকে মারাত্মকভাবে জখম করার বিষয়ে আলোচনা করেছিল এবং এই হামলা চালানোর জন্য মহারাষ্ট্রের বাইরে থেকে কাউকে ভাড়া করার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখেছিল। তবে পুলিশের দাবি, পরবর্তীতে এই পরিকল্পনাটি বাদ দেওয়া হয়। কারণ তাঁদের ভয় ছিল যে, ভাড়াটে ব্যক্তিটি এই চক্রান্ত ফাঁস করে দিতে পারে অথবা তাঁদের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, পরিকল্পনা চলাকালীন যে ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল, তিনি বর্তমানে এই মামলার একজন সাক্ষী হয়েছেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, এরপর তাঁরা নিজেদের দ্বারা আগরওয়ালকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং এই উদ্দেশ্যে খুনের ওপর তৈরি বিভিন্ন সিনেমা দেখে ও চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে। নিজেদের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে, পুলিশ থেকে কীভাবে রেহাই পাওয়া যায় সেই বিষয়ে বিভিন্ন পডকাস্টও শুনতো তাঁরা। চার্জশিটে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা মেঘালয়ের রাজা রঘুবংশী হত্যা মামলাটি পর্যালোচনার জন্যও অনলাইনে বেশ কয়েকবার অনুসন্ধান চালিয়েছিল। গত বছরের মে মাসে মেঘালয়ে হানিমুনের সময় ইন্দোরের বাসিন্দা রাজা রঘুবংশী খুন হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী সোনমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
চার্জশিটে পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তরা লোহাগড় দুর্গটি চূড়ান্ত করার আগে লোনাভলার আশেপাশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে রেকি করেছিল। চার্জশিট অনুযায়ী, সিয়া গোয়েল এবং চেতন চৌধুরি একটি নির্জন জায়গার খোঁজে টাইগার পয়েন্ট এবং অন্যান্য স্থানগুলো পরিদর্শন করেছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, গত বছরের মার্চ মাসে লোহাগড় দুর্গে দুর্ঘটনায় এক নারী মারা গিয়েছিলেন। কেতনের হত্যাকেও দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দিতেই লোহাগড়কে বেছে নেয়া হয়। চার্জশিটে বলা হয়েছে, ১৮ জুন কেতনকে হত্যা করতে পারলেও এর আগে ১৪ জুনও সিয়া কেতনকে হত্যার চেষ্টা করেছিল। সেদিন সিয়া কেতনকে পাহাড়ের চূড়া থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তবে কেতন কোনোমতে একটি গাছ আঁকড়ে ধরে বেঁচে যান। সিয়া তখন ‘সাপ, সাপ’ বলে চিৎকার করে কেতনকে জানায়, সাপ থেকে বাঁচাতেই সে তাকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল।
চার্জশিট অনুসারে, সিয়া ৪ জুনও দুর্গে যাওয়ার জন্য জোরাজুরি করেছিল। কারণ অভিযুক্তরা বালিতে একটি পরিকল্পিত ভ্রমণের আগেই এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটাতে চেয়েছিল। ৬ জুন তাদের প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের জন্য বালি যাওয়ার কথা ছিল। বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে সিয়া একটি ক্যাফের ওয়াশরুমে কেতনের পাসপোর্টটি ছিঁড়ে ফেলে দেন, যার ফলে তাঁদের বালির সেই ভ্রমণটি বাতিল হয়ে যায়।
চার্জশিটে বলা হয়েছে, কেতনকে লোহাগড় দুর্গ নিতে সিয়া পরিচিত এক নারীর ছবি ব্যবহার করে 'মাহি' নামে একটি ভুয়া ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট বানিয়েছিল। ওই অ্যাকাউন্ট থেকে কেতন আগরওয়ালকে বার্তা পাঠিয়ে সিয়া গোয়েলের জন্মদিনে সারপ্রাইজ বার্থডে প্ল্যানের অংশ হিসেবে ১৮ জুন লোহাগড় দুর্গে আসার জন্য উৎসাহিত করা হয়। চার্জশিট অনুযায়ী, কেতনকে দুর্গে ডেকে আনার জন্য রিতেশ হাঙ্গের তৈরি করা একটি চক্রান্তের অংশ ছিল এই ভুয়া অ্যাকাউন্টটি। ঘটনার পরপরই অ্যাকাউন্টটি মুছে ফেলা হয়।
১৮ জুন চেতন চৌধুরি বের হওয়ার পথ দিয়ে লোহাগড় দুর্গে পৌঁছায় এবং পরবর্তীতে সিয়ারের কাছ থেকে সিগন্যাল পাওয়ার পর তাঁর সাথে যোগ দেয়। যখন কেতনের মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরানো ছিল, তখন সিয়া পেছন থেকে তাঁকে ধাক্কা দেয়। এরপর চেতন চৌধুরি কেতনকে লাথি মারে, যার ফলে তিনি দুর্গ থেকে নিচে পড়ে যান।
পুলিশ জানিয়েছে, সিয়া ও চেতন প্রাথমিকভাবে কেতনের হাত-পা ভেঙে মারাত্মকভাবে জখম করা এবং পরবর্তীতে তাঁকে হত্যা করার পরিকল্পনা সম্পর্কে চেতনের বন্ধু রিতেশ জানতেন। ১৮ জুন লোহাগড় দুর্গে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানোর পর চেতন রিতেশের সাথে যোগাযোগ করেন এবং তাঁকে বিষয়টি জানান।
পরিকল্পনা অনুযায়ী সিয়া প্রাথমিকভাবে এটিকে সেলফি তুলতে গিয়ে অসাবধানতায় পড়ে যাওয়া হিসেবে অভিহিত করেন। প্রাথমিকভাবে পুলিশ এটিকে একটি দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছিল। তবে, কেতনের শেষকৃত্যের পরও তাঁর বোন এই দুর্ঘটনার গল্পটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকেন এবং তা খতিয়ে দেখতে চান। ঘটনার চার দিন পর সিয়া গোয়েল আগরওয়াল পরিবারের বাড়িতে সমবেদনা জানাতে যায়। তখন কেতনের বোন লোহাগড়ে ঠিক কী ঘটেছিল সে সম্পর্কে সিয়াকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সিয়া গোয়েলের উত্তরের অসংগতি এবং কিছু বিষয় এড়ানোর প্রবণতা কেতনের বোনের সন্দেহকে আরও গভীর করে তোলে।
এরপর তিনি তাঁর এই সন্দেহের কথা পরিবারের সাথে শেয়ার করেন। এর পর তাঁরা পুলিশের দ্বারস্থ হন এবং নতুন করে তদন্তের দাবি জানান। প্রাথমিক তদন্ত শেষে গত ২৩ জুন পুলিশ সিয়া ও চেতনকে গ্রেপ্তার করে। সিয়া এবং চেতন বিগত তিন বছর ধরে প্রেমের সম্পর্কে জড়িত ছিলেন। গত জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যেই তাঁদের মধ্যে ২ হাজার বারেরও বেশি কথা হয়েছে, যার মোট সময়কাল ছিল ২৩৮ ঘণ্টা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন