প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চার বছর আগে জার্মান ফুটবলের চতুর্থ স্তরে অবস্থান করছিল এলভার্সবার্গ। বর্তমানে তারা বুন্দেসলিগায় অভিষেকের প্রথম দুই ম্যাচেই জয়লাভ করে রোববার ৩৫ বারের জার্মান চ্যাম্পিয়ন বায়ার্ন মিউনিখের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
চার বছর পূর্বে এলভার্সবার্গ আঞ্চলিক লিগে খেলে আসছিল। সেই দলটি এখন বুন্দেসলিগায় অভিষেক মৌসুমে দুই ম্যাচে জয়লাভ করে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। রোববার, ছোট শহরের ক্লাবটি জার্মানির সবচেয়ে সফল দল বায়ার্ন মিউনিখের বিরুদ্ধে খেলতে নামবে। এলভার্সবার্গের এই উত্থানের কাহিনী ইতোমধ্যে একটি রূপকথায় পরিণত হয়েছে।
চার বছর আগে, এলভার্সবার্গ দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের আঞ্চলিক লিগের চতুর্থ স্তরে শীর্ষে উঠে আসে। ২০২২-২৩ মৌসুমে তারা দ্বিতীয়বারের মতো বুন্দেসলিগা-২-এ উন্নীত হয়। ২০২৪-২৫ মৌসুমে হাইডেনহাইমের কাছে প্লে-অফে ৪-৩ গোলে পরাজিত হয়ে বুন্দেসলিগায় ওঠার সুযোগ হাতছাড়া করে। তবে এক বছর পরে শালকের পেছনে রানার্সআপ হয়ে সরাসরি শীর্ষ স্তরে চলে আসে তারা।
বুন্দেসলিগায় অভিষেক ম্যাচে এলভার্সবার্গের প্রতিপক্ষ ছিল বায়ার লেভারকুসেন। তারা ভয় না পেয়ে প্রথম নয় মিনিটের মধ্যে ২-০ গোলে এগিয়ে যায়। গোল করেন লুকাস পেটকভ ও কোল ক্যাম্পবেল। বিরতির পর ডেভিড মোকওয়া তৃতীয় গোল করলে তাদের রূপকথার শুরু আরও জমে ওঠে। পরে পাত্রিক শিক ও যোগ করা সময়ে ক্রিস্তিয়ান কোফানে গোল করলেও নবাগতরা জয় ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
দ্বিতীয় ম্যাচে নাটকীয়তা আরও বৃদ্ধি পায়। বরুসিয়া মোনশেংগ্লাডবাখের মাঠে ৫৬ মিনিট পর্যন্ত এলভার্সবার্গ ১-৩ গোলে পিছিয়ে ছিল। তবে মরিস ক্রাটেনমাখার ও ফেলিক্স কেইডেলের গোলে তারা সমতা ফেরায়। যোগ করা সময়ে ক্রাটেনমাখারই জয়সূচক গোল করেন। ফলে বুন্দেসলিগায় প্রথম দুই ম্যাচেই জয়লাভ করে এলভার্সবার্গ ইতিহাস গড়ে।
উদ্বোধনী ১৯৬৩-৬৪ মৌসুম বাদ দিলে, বুন্দেসলিগার ইতিহাসে তারা মাত্র ষষ্ঠ দল হিসেবে প্রথম দুই ম্যাচে জয় লাভের নজির স্থাপন করেছে। একবিংশ শতাব্দীতে এমন কীর্তি মাত্র দ্বিতীয়বার ঘটেছে। দুই ম্যাচে শতভাগ জয় পাওয়া চার দলের মধ্যে এলভার্সবার্গও রয়েছে। এমনকি গত সপ্তাহে শালকের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করা বায়ার্নের চেয়ে তারা এখন পয়েন্ট তালিকায় উপরে অবস্থান করছে।
বিশ্বব্যাপী ১৩ হাজারের বেশি পুরুষ ফুটবল দলের শক্তিমত্তা অনুযায়ী সাজানো অপ্টা পাওয়ার র্যাঙ্কিংয়ে এলভার্সবার্গের উত্থান লক্ষণীয়। ২০২২-২৩ মৌসুমের শুরুতে তারা ছিল বিশ্বের শীর্ষ দুই হাজারের বাইরে। মোনশেংগ্লাডবাখকে হারানোর পর বর্তমানে তারা ১২৭তম স্থানে উঠে এসেছে। তাদের নিচে রয়েছে আন্দেরলেখট ও ফিওরেন্তিনা। রোববার বায়ার্নকে পরাজিত করতে পারলে তারা আরও উপরে উঠবে।
এলভার্সবার্গের উত্থানের পেছনে তরুণ প্রতিভা খুঁজে বের করার কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। নিক ভল্টেমাডে ২০২২-২৩ মৌসুমে ভের্ডার ব্রেমেন থেকে ধারে এলভার্সবার্গে খেলেছেন। ফিসনিক আসলানি ২০২৪-২৫ মৌসুমে ধারে এসে পরে হফেনহাইমে আলো ছড়ান। ইউনেস এবনুতালিব গত মৌসুমের প্রথমার্ধে এলভার্সবার্গের হয়ে ১৭ লিগ ম্যাচে ১২ গোল করে জানুয়ারিতে আইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্টে চলে যান। তাঁর বিদায়ের পরও এলভার্সবার্গের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে।
গত মৌসুমে বুন্দেসলিগা-২-এ এলভার্সবার্গ ৬৪ গোল করে সর্বাধিক গোলদাতা দল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তাদের প্রত্যাশিত গোল ছিল ৬৪.৮, যা তাদের পারফরম্যান্সের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। ৩৯ গোল হজম করে তারা ছিল দ্বিতীয় সর্বনিম্ন গোল খাওয়া দল; বিপক্ষের প্রত্যাশিত গোলও ছিল ৩৯.৫। তাই তাদের উন্নীত হওয়াকে নিছক ভাগ্যের ফল বলার সুযোগ নেই।
তাদের খেলার ধরন আক্রমণাত্মক, তবে অতি সরাসরি নয়। গত মৌসুমে বুন্দেসলিগা-২-এ তারা সবচেয়ে কম লম্বা পাস খেলেছে—১ হাজার ৫৩৭টি। তবে বল সামনে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা কার্যকর ছিল। ৯৭৯টি প্রগ্রেসিভ পাস দিয়ে তারা লিগে দ্বিতীয়, আর সফল থ্রু বলের সংখ্যা ছিল সর্বাধিক—২৯টি। সেট-পিসেও তারা বিপজ্জনক; কর্নার থেকে গত মৌসুমে ১০ গোল করেছে তারা।
এ সাহসী ফুটবলের কারিগর কোচ ভিনসেন্ট ভাগনার। ২০২৫ সালের জুনে দায়িত্ব গ্রহণকারী ভাগনার প্রথম মৌসুমেই দলকে বুন্দেসলিগায় উন্নীত করেন। তবে রোববার বায়ার্নের বিপক্ষে তিনি ডাগআউটে থাকতে পারবেন না। মোনশেংগ্লাডবাখের বিপক্ষে জয়ের ম্যাচে দুটি হলুদ কার্ড দেখায় নিষেধাজ্ঞায় রয়েছেন তিনি।
ভাগনারের দর্শন তাঁর দলের খেলার সঙ্গে মেলে। তিনি বলেছেন, "পিছিয়ে থেকে রক্ষণাত্মক হয়ে ১-০ গোলে হারার চেয়ে সাহস করে ৪-০ গোলে হারানো তাঁর কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য।" তাঁর বিশ্বাস, ফুটবল উপভোগের বিষয় এবং সাহসী, আনন্দময় ফুটবলই খেলোয়াড়দের উন্নতিতে বেশি সহায়তা করে।
ঝুঁকিপূর্ণ এই দর্শনের কারণে এলভার্সবার্গ গোলও হজম করেছে। দুই ম্যাচে তারা পাঁচ গোল খেয়েছে। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে নিজেদের শেষ ১৪ অ্যাওয়ে লিগ ম্যাচের কোনোটিতেই ক্লিন শিট রাখতে পারেনি। তবে অন্য প্রান্তে গোল করার ক্ষমতাও স্পষ্ট। প্রথম দুই ম্যাচে সাত গোল করে তারা বুন্দেসলিগায় কোনো নবাগত দলের মৌসুম শুরুর প্রথম দুই ম্যাচে সর্বাধিক গোলের নতুন রেকর্ড গড়েছে।
তরুণদের ওপর জোর থাকলেও দলটি পুরোপুরি তারুণ্যনির্ভর নয়। বুন্দেসলিগা ও জার্মান কাপ মিলিয়ে চলতি মৌসুমে মাঠে নামা খেলোয়াড়দের গড় বয়স ২৫ বছর ২৪৮ দিন। ক্যাম্পবেল, মোকওয়া ও ফ্রান্সিস ওনিয়েকার মতো তরুণদের সঙ্গে অভিজ্ঞ ম্যাক্সিমিলিয়ান রোর, ইয়ান গ্যামারাহ ও লুকা শ্নেলবাখারও রয়েছেন। শ্নেলবাখার ও গোলরক্ষক নিকোলাস ক্রিস্তফ তো আঞ্চলিক লিগ থেকেই ক্লাবটির সঙ্গে যুক্ত আছেন।
এলভার্সবার্গের আরেকটি শক্তি হলো গোলের ভার একজনের ওপর না থাকা। গত মৌসুমে বুন্দেসলিগা-২-এর সর্বোচ্চ গোলদাতা দল হলেও ব্যক্তিগতভাবে সেরা নয়জন গোলদাতার তালিকায় তাদের কেউ ছিলেন না। দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা লুকাস পেটকভ করেছিলেন ১৩ গোল। অর্থাৎ দলটির আক্রমণভাগের শক্তি মূলত সম্মিলিত।
রোববার এলভার্সবার্গের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন হতে যাচ্ছে। চার বছর আগে যারা জার্মান ফুটবলের চতুর্থ স্তরে খেলছিল, তারা এখন মাঠে নামবে ৩৫ বারের জার্মান চ্যাম্পিয়ন ও ছয়বারের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন বায়ার্ন মিউনিখের বিরুদ্ধে। দুই ম্যাচে দুই জয় পাওয়া এলভার্সবার্গের রূপকথা এবার কোথায় গিয়ে থামে, সেটাই দেখার।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন