প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একসময় ছিল বসতভিটা, ফসলভরা জমি আর স্বচ্ছল সংসার। এখন সেই সবই স্মৃতি। আড়িয়াল খাঁ নদীর ভয়াল ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের হোগলপাতিয়া গ্রামের মো. এনামুল আকন। তাঁর মতো শতাধিক পরিবার প্রতিদিন নদীভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের পর থেকেই নদীর গতিপথ বদলে গিয়ে ভয়াবহ ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে।
৪৮ বছর বয়সী এনামুল আকন জানান, একসময় প্রায় ১০ বিঘা আবাদি জমিতে কৃষিকাজ করে পরিবার চালাতেন। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর থেকে ধীরে ধীরে নদী তাঁদের জমি গ্রাস করতে শুরু করে। সময়ের ব্যবধানে পারিবারিক ভাগে পাওয়া শেষ দুই বিঘা জমি ও বসতভিটাও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এখন পরিবার নিয়ে স্থানীয় সাইফুল ইসলামের আট শতাংশ জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।
চোখের জল মুছতে মুছতে এনামুল বলেন, “ড্রেজার দিয়ে বালু না তুললে নদী এভাবে ভাঙত না। যারা এসব করে তারা খুবই প্রভাবশালী। প্রতিবাদ করলে হামলার ভয় থাকে। তাই মুখ খুলতেও ভয় পাই। আল্লাহ ছাড়া আমাদের দেখার কেউ নেই।”
একই গ্রামের টিটল আকনের জীবনেও নেমে এসেছে একই ট্র্যাজেডি। গোলাভরা ধান, বসতবাড়ি ও ফসলি জমি—সবই এখন নদীর তলদেশে। বাধ্য হয়ে নদীর ওপারে নিজের ছয় শতাংশ জমিতে নতুন করে ঘর তুলেছেন তিনি।
টিটল আকনের ভাষ্য, “আমাদের এলাকায় আগে কখনো নদীভাঙন ছিল না। ড্রেজার বসানোর পর থেকেই ভাঙন শুরু হয়েছে। যারা বালু তোলে, তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস কারও নেই।”
আড়িয়াল খাঁ নদী মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়ন এবং কালকিনি উপজেলার আলিনগর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। হোগলপাতিয়া, চরহোগলপাতিয়া, চর কালকিনি, সস্তাল ও কাদের আকন কান্দিসহ বিস্তীর্ণ এলাকা এখন নদীভাঙনের স্থায়ী ঝুঁকিতে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক ও হাটবাজার। যেসব ঘর এখনো নদীর কিনারায় টিকে আছে, সেসব পরিবারের প্রতিটি বর্ষা কাটে চরম উৎকণ্ঠায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বৃদ্ধ বলেন, “সংবাদ করলে আমাদেরই বিপদ হয়। কিন্তু সমস্যার কোনো সমাধান হয় না।”
নদীভাঙনের ধাক্কায় চরহোগলপাতিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও সামাজিক স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে শিক্ষা কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় শিক্ষার্থীরা জানায়, নদীভাঙনের কারণে নৌকায় চলাচল করতে ভয় লাগে। এ কারণে অনেক সময় তারা স্কুলেও যেতে পারে না।
স্থানীয় বাসিন্দা জলিল বেপারী বলেন, “রাতভর ড্রেজারের শব্দে ঘুমাতে পারি না। কিছু বলতে গেলেই ভয় দেখানো হয়।”
শাহানুর আকন, সিদ্দিকী আকন, আজম হাওলাদার ও রাজ্জাক হাওলাদারসহ একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, অবৈধ ড্রেজারে বালু উত্তোলনের পর থেকেই নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনেক পরিবার পাঁচ থেকে সাতবার পর্যন্ত ঘর সরাতে বাধ্য হয়েছে। তাঁদের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে পুরো জনপদই একসময় নদীগর্ভে বিলীন হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা বিল্লাল হোসাইন অভিযোগ করেন, অবৈধ বালু ব্যবসার সঙ্গে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট জড়িত। দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নিলে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে চলে যাবে।
ঝাউদি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম আবুল হাওলাদারের চাচাতো ভাই জাফর হাওলাদার বলেন, নদীর পাড়ে কয়েকজন মিলে বরই ও আমের বাগান করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, শামীম আকন নদীর পাড়ের মাটি ড্রেজার ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করায় তাঁর বাগান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
জাফর হাওলাদার বলেন, “আমি বাধা দিলে আমাকে লোক দিয়ে মারতে আসে। প্রশাসনের কাছে এর বিচার চাই।”
হোগলপাতিয়া ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য লোকমান বেপারী বলেন, “তারা অনেক প্রভাবশালী। আমি প্রতিবাদ করলে আমার ওপরও হামলার আশঙ্কা রয়েছে।”
আলিনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহিদ পারভেজের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঝাউদি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম আবুল হাওলাদার বলেন, নদীভাঙনের বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন। অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ তাঁকে অবহিত করেননি বলেও দাবি করেন।
মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সানাউল কাদের খান বলেন, ঝাউদি ইউনিয়নে নদীতীর সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ দলের পরিদর্শন শেষে প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে কাজ শুরু হবে।
মাদারীপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে জরিমানা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
জেলা প্রশাসক মিস মর্জিনা আক্তার বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের পৃথক ম্যাজিস্ট্রেট টিম নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এ অভিযান চলমান থাকবে।
আড়িয়াল খাঁর তীরে দাঁড়িয়ে এখন মানুষের একটাই প্রশ্ন—অবৈধ ড্রেজারের গর্জন থামবে কবে? তার আগেই কি নদী গিলে খাবে এই জনপদের শেষ আশ্রয়টুকুও?
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন