প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ, চাঁদাবাজি, সরকারি বরাদ্দের অর্থে অনিয়ম এবং শিক্ষকদের ফাইল আটকে অর্থ দাবির অভিযোগ উঠেছে।
এবিষয় উপজেলার একাধিক
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সংবাদ কর্মীদের বক্তব্য দিয়েছেন। একটি কথিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন অজুহাতে শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হচ্ছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আটকে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন বিল ও ফাইল।
অভিযোগ ও সরেজমিনে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চরফ্যাশন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে সরকারি বিভিন্ন খাতের বরাদ্দ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। আন্তঃইউনিয়ন ফুটবল টুর্নামেন্ট, প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতা, নির্বাচনী কেন্দ্র সংস্কার, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ডিভাইস, এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি, ক্ষুদ্র মেরামত, প্রাক-প্রাথমিকসহ বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের অর্থ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪২টি ভোটকেন্দ্রের সংস্কারের জন্য প্রতিটিতে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই বরাদ্দ থেকে প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ৯ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের প্রায় চার মাস পর অর্থ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ওই টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া আন্তঃইউনিয়ন ফুটবল টুর্নামেন্ট ও প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ইউনিয়ন পর্যায়ে যথাযথভাবে না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। প্রতিবন্ধী শিশুদের ডিভাইস কেনার জন্য বরাদ্দ ৯০ হাজার টাকা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা।
এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি বরাদ্দ নিয়েও অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চরফ্যাশনের ১২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটিতে এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি খাতে ৩ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরের অর্থবছরে আরও ৮টি বিদ্যালয়ে ৩ লাখ টাকা করে এবং একটি বিদ্যালয়ে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
শিক্ষকদের অভিযোগ, এসব বরাদ্দের বিপরীতে দৃশ্যমান কাজ না করেই অর্থের একটি অংশ ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় বিদ্যালয়কে বাদ দিয়ে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে বারবার বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে ১৮৬ নম্বর দক্ষিণ চর আইচা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি খাতে ৩ লাখ টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মেরামত ও সংস্কার খাতে ২ লাখ টাকা পায়। একই অর্থবছরে আবার এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি খাতে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
পূর্ব নুরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ক্ষুদ্র মেরামত খাতে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি খাতে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, বিভিন্ন বিল ও সরকারি বরাদ্দের অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে ঘুষ দাবি করা হয়। দাবিকৃত অর্থ না দিলে ফাইলে স্বাক্ষর করা হয় না বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষক।
হাজিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনির হোসেন অভিযোগ করেন, এরিয়ার বিলের জন্য উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তার কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। পরে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার বিল দেখে অফিসের ‘সাত্তারের’ কথা বলে আরও ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় বিলে স্বাক্ষর করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
মিয়াজানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নাছির উদ্দিনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নির্বাচনী কেন্দ্র সংস্কারের বরাদ্দ থেকে টাকা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন।
মধ্য উত্তর মাদ্রাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হাই খান বলেন, আন্তঃস্কুল ফুটবল টুর্নামেন্টে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের অধিকাংশ বরাদ্দ তারা পাননি।
মধ্য উত্তর ফ্যাশন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হাই হাওলাদার বলেন, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের তালিকা নেওয়া হলেও তারা কোনো ডিভাইস পাননি।
আসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনও ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের ফুটবল টুর্নামেন্টের বরাদ্দ না পাওয়ার কথা জানান।
এদিকে কয়েকজন শিক্ষক জানান, প্রাক-প্রাথমিকের জন্য বিদ্যালয়প্রতি বরাদ্দ ৭ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে ওয়াই-ফাই সংযোগ না থাকা বা ইন্টারনেট সচল না থাকার পরও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের প্রত্যয়ন ছাড়াই একটি কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশে ১৮ লাখ ১৫ হাজার ২০০ টাকা উত্তোলনের অভিযোগও করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের কনটিনজেন্সি, বই পরিবহন, টিএ, বিভিন্ন দিবস পালন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯৬ শিক্ষকের বিনোদন ভাতার বিল ছাড়ের ক্ষেত্রেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তবে চরফ্যাশন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, অভিযোগগুলোর বিপক্ষে তার কাছে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের কথাও জানান।
শিক্ষকদের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত এবং সরকারি বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহারের বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এব্যাপারে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আমিনুল ইসলাম আমার দেশকে জানান, আমি এই প্রথম আপনার কাছে তার বিষয়ে এত অভিযোগের কথা শুনলাম। আমার কাছে মিজানুর রহমানের বিষয়ে কোনো অভিযোগ আসে নাই। যে দপ্তরে অভিযোগ করা হয়েছে তারা অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে দেখবেন। আমার কাছে অভিযোগ আসলে আমিও তদন্তও সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিব।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন