প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সরকারি নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলার মেঘনা নদীতে মা ইলিশ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে একাধিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নির্বিচারে ইলিশ শিকার করা হচ্ছে। এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিকেলে সরেজমিনে রামগতি ও কমলনগরের কয়েকটি মাছঘাট পরিদর্শন করে মা ইলিশ শিকারের চিত্র দেখা গেছে। রামগতির বিবিরহাট, ওছখালী, ব্রিজঘাট, আসলপাড়া, টাঙ্কিরঘাট, আলেকজান্ডার, বালুরচর ও বাংলাবাজার এবং কমলনগরের মতিরহাট, নবীগঞ্জ, নাজিরগঞ্জ, মাতাব্বরহাট, লুধুয়া ও পাটারিরহাট এলাকায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকারের অভিযোগ রয়েছে।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর রামগতি বাজার মাছঘাটসংলগ্ন মান্তাপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মাছ কেনার জন্য অনেক ব্যবসায়ী অপেক্ষা করছেন। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে কয়েকজন ব্যবসায়ী মোটরসাইকেল নিয়ে চলে যান। স্থানীয় জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, বিকেলে আট থেকে ১০টি নৌকা মাছ শিকারের জন্য নদীতে যায়। সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে সেগুলো মাছ নিয়ে ঘাটে ফেরে। এ সময় মাছ কেনার জন্য ব্যবসায়ীরা অপেক্ষা করেন। রাতভর আরো ১২ থেকে ১৫টি নৌকা মাছ শিকার করে ভোরে ঘাটে আসে। তখন সেখানে মানুষের ভিড় আরো বাড়ে।
এছাড়া, নৌকা পরিচালনার বিষয়ে প্রশ্ন করলে উপস্থিত তিনজন মাছ ব্যবসায়ী লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম, বিএনপির কর্মী ডলার নোমান ও হালিম মাঝির নাম উল্লেখ করেন। তাদের দাবি, ওই ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে নৌকাগুলো পরিচালিত হচ্ছে।
কমলনগরের মতিরহাট মাছঘাটে চরকালকিনি ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি হুমায়ুন কবির ও ফারুক হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ থেকে সাতটি নৌকায় মা ইলিশ শিকার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই মেঘনায় মা ইলিশ শিকার শুরু হয়, যা চলে সারা রাত। নদীতে মাছ ধরতে নামা জেলেদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে জাহাঙ্গীর আলম, ডলার নোমান ও হালিম মাঝির সিন্ডিকেট তাদের মাছ শিকারে সহায়তা করছে। প্রতিদিন গড়ে ছোট-বড় ও মাঝারি আকারের প্রায় ৩০টি নৌকা এভাবে মাছ শিকার করে বলে তাদের দাবি।
মান্তাপাড়া এলাকায় জাহাঙ্গীর আলমের পরিচালিত কথিত সিন্ডিকেটের সঙ্গে চরগাজী ও বড়খেরী ইউনিয়ন ছাত্রদল ও যুবদলের কয়েকজন নেতাও জড়িত বলে দাবি করেছেন ওই এলাকার দুই বিএনপি নেতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের একজন বলেন, এসব বিষয়ে কথা বললে সমস্যায় পড়তে হয়। দলের কিছু নেতাকর্মী এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন যে কারও কথা শুনতে চান না। মৎস্য বিভাগ ও নৌ-পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ না করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালানো সম্ভব নয় বলেও দাবি করেন তারা।
মাছ কিনতে আসা সিরাজ উদ্দিন ও রফিক মাঝি বলেন, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তারা প্রায়ই ওই স্থান থেকে মাছ কেনেন। তাদের দাবি, তাদের মতো প্রায় ২০০ ব্যবসায়ী নিয়মিত সেখানে মাছ কেনেন। ঋণ ও জীবিকার তাগিদে জেলেরা নদীতে নামতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানান তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষকে সামলানোর দায়িত্বে রয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম, ডলার নোমান ও হালিম মাঝি।
রামগতি বাজারের ব্যবসায়ী ফজল করিম ও আবির হোসেন বলেন, এ বছর মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রশাসনের তৎপরতা আগের বছরগুলোর তুলনায় কম। তাদের অভিযোগ, এ সুযোগে নির্বিচারে ইলিশ শিকার চলছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদল নেতা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রাজনীতি করার কারণে তার পক্ষে-বিপক্ষে শত্রু রয়েছে। তারা হয়তো এমন অভিযোগ করতে পারেন। তবে তিনি এ কাজের সঙ্গে জড়িত নন।
রামগতি উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক শিবলী নোমান বলেন, সরকারের আইন অনুযায়ী ২২ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ। এ সময় কেউ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে মাছ শিকারে সহায়তা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। এতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। অপরাধীর পরিচয় অপরাধী।
রামগতির বড়খেরী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোহাম্মদ আলী বলেন, জনবল সংকটসহ নানা কারণে বিশাল নদী পাহারা দেওয়া কঠিন। তবু নৌ-পুলিশের সদস্যরা সাধ্য অনুযায়ী অভিযান চালাচ্ছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রামগতি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সৌরভ-উজ-জামান বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নাম তিনিও শুনেছেন। গত দুই দিনে ওই এলাকায় কয়েকবার গেছেন এবং জাহাঙ্গীর আলমকে টেলিফোনে সতর্ক করেছেন। কিছু জাল ও নৌকা আটক করা হয়েছে। শুক্রবার থেকে অভিযান আরো জোরদার করা হবে।
লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি তারাও শুনেছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, ইলিশের প্রজনন ও সংরক্ষণের লক্ষ্যে গত ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চাঁদপুরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত মেঘনা নদীর ১০০ কিলোমিটার এলাকাসহ দেশের নির্ধারিত এলাকায় ইলিশ আহরণ, পরিবহন ও বিপণন নিষিদ্ধ করেছে সরকার।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন