প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নরসিংদী, ৫ নভেম্বর, ২০২৬ : ওয়ারী-বটেশ্বর, নরসিংদী জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ভাণ্ডার, যেখানে প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। এখানে মাটির নিচে প্রাচীন নগর-বসতির প্রমাণ এবং মূল্যবান প্রত্নবস্তু রয়েছে, যা প্রাক-বাংলার ইতিহাস, বাণিজ্য, কারুশিল্প ও সংস্কৃতির ওপর পরিষ্কার ধারণা প্রদান করে।
এই অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদগুলো সংরক্ষণ এবং দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে, ওই এলাকায় ‘গঙ্গা ঋদ্ধি’ নামে একটি তিনতলা বিশিষ্ট জাদুঘর নির্মাণ করা হচ্ছে।
ওয়ারী ও বটেশ্বর গ্রাম এবং শিবপুর উপজেলার পার্শ্ববর্তী এলাকা নিয়ে বিস্তৃত এই প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলটি নরসিংদী জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এখানে একটি সমৃদ্ধ দুর্গ-নগরী ও জনবসতি গড়ে উঠেছিল। তবে কিছু গবেষণার ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, এই অঞ্চলে মানব বসতির ইতিহাস ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার বছর পুরনো হতে পারে।
১৯৩০-এর দশকে স্থানীয় স্কুল শিক্ষক হানিফ পাঠান সংবাদপত্রে নিবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে ওয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের দিকে প্রথম সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তার মৃত্যুর পর, তার ছেলে ও প্রত্নতত্ত্ব অনুরাগী হাবিবুল্লাহ পাঠান বিভিন্ন প্রত্নবস্তু সংগ্রহ ও গবেষণার মাধ্যমে তার বাবার কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। তাদের পারিবারিক সংগ্রহশালা ও লাইব্রেরিতেও অনেক প্রাচীন নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে।
১৯৮৯ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক দিলীপ কুমার চক্রবর্তী ওয়ারী-বটেশ্বর পরিদর্শন করেন এবং এটি একটি প্রাচীন সভ্যতার স্থান হিসেবে এর সম্ভাবনা তুলে ধরেন। পরবর্তীতে, ২০০০ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা সংস্থা ‘ঐতিহ্য অন্বেষণ’-এর উদ্যোগে এখানে সুশৃঙ্খলভাবে খননকাজ শুরু হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে গত দুই দশক ধরে পর্যায়ক্রমে খনন কাজ পরিচালিত হয়েছে। এর ফলে অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। অধ্যাপক ড. এম সুফি মোস্তাফিজুর রহমান এই সংস্থার নির্বাহী পরিচালক।
প্রায় ৫০টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে খননকার্য চালিয়ে প্রাচীন রৌপ্য মুদ্রা, ওজন পরিমাপের বাটখারা, লোহার কুঠার, বর্শা, হাতুড়ি, পোড়ামাটির শিল্পকর্ম, পাথর ও কাঁচের পুঁতি, ‘নর্দার্ন ব্ল্যাক পলিশড ওয়্যার’ এবং ‘রুলেটেড ওয়্যার’-এর মতো মূল্যবান নিদর্শন উদ্ধার করা হয়েছে।
গবেষকরা প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো ইটের তৈরি রাস্তা, চুন-সুরকির গাঁথুনি, সুরক্ষা প্রাচীর এবং প্রাচীন বসতির স্থাপত্যিক অবশিষ্টাংশও খুঁজে পেয়েছেন।
টঙ্গীরটেক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে খনন করে একটি সুনিপুণ কারুকার্যময় বৌদ্ধ মন্দির, গর্ভগৃহ, সীমানা প্রাচীর, প্রবেশ পথ এবং তিনটি স্তূপের সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এই কাঠামোটি প্রায় ১২শ’ বছরের পুরনো। এছাড়া সেখানে একটি বৌদ্ধ বিহার, একটি পদ্ম মন্দির এবং ‘বৌদ্ধ কুণ্ড’ বা ‘পুকুনিয়া’ নামে পরিচিত ইটের তৈরি একটি বিশেষ কাঠামোর প্রমাণও পাওয়া গেছে।
তবে খননকার্য শেষ হওয়ার পর প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অনেক স্থানই পুনরায় মাটি দিয়ে ঢেকে ফেলতে হয়েছে। গবেষণার জন্য উদ্ধারকৃত নিদর্শনগুলো গবেষণাগারে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরবর্তীতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে জমা দেয়া হয়। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা প্রায়শই এই প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদগুলো দেখার সুযোগ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যান।
এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে, স্থানীয় সরকারের অর্থায়নে ২০১৯ সালে ‘গঙ্গা ঋদ্ধি জাদুঘর’ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। নরসিংদী জেলা পরিষদের বাস্তবায়নাধীন তিনতলা এই জাদুঘরটির নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
জাদুঘরটি চালু হলে, ওয়ারী-বটেশ্বর ও এর পার্শ্ববর্তী প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো থেকে আবিষ্কৃত গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলো সেখানে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করার সুযোগ তৈরি হবে।
জেলা পরিষদ সূত্র বাসস’কে জানিয়েছে, জাদুঘরটির নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং পুরো প্রকল্পটি আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে, ‘ঐতিহ্য অন্বেষণ’ ওয়ারী-বটেশ্বর দুর্গ নগরীতে দর্শনার্থীদের জন্য একটি উন্মুক্ত জাদুঘর গড়ে তুলেছে। এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের পাশাপাশি বিভিন্ন মডেল, রেপ্লিকা, আলোকচিত্র, বিবরণ ও বিশ্লেষণ প্রদর্শিত হচ্ছে।
প্রাচীনকালের গর্ত-বসতির (পিট ডুয়েলিং) মডেলের মাধ্যমে দর্শনার্থীরা হাজার হাজার বছর আগের মানুষের জীবনযাপন ও বসতি স্থাপনের ধরন সম্পর্কে জানতে পারেন। শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগও পায়। প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে ওয়ারী-বটেশ্বরকে কেন্দ্র করে নির্মিত তথ্যচিত্র ও প্রত্নতাত্ত্বিক নাটকও দেখানো হয়।
স্থানীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রাহক হাবিবুল্লাহ পাঠান বাসস’কে জানান, ওয়ারী-বটেশ্বর ছিল ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত আড়াই হাজার বছরের পুরনো একটি গুরুত্বপূর্ণ জনবসতি, রাজধানী ও দুর্গ নগরী।
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৫০টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে খননকার্য চালিয়ে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন উদ্ধার করা হয়েছে’।
অধ্যাপক ড. এম সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বাসস’কে জানিয়েছেন, ওয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব দেশ ও বিদেশে তুলে ধরার লক্ষ্যে একটি উন্মুক্ত জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘এই উদ্যোগের মাধ্যমে দর্শনার্থীরা প্রাচীন বাসিন্দাদের জীবনধারা, বসতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সরাসরি ধারণা পাচ্ছেন। ‘গঙ্গা ঋদ্ধি জাদুঘর চালু হওয়ার ফলে প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দারা কর্তৃপক্ষের কাছে জাদুঘরটির নির্মাণ কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে তা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ, পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে ওয়ারী-বটেশ্বরকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। তারা আশা করেন, সঠিক উদ্যোগ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে ওয়ারী-বটেশ্বরের আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা যাবে এবং এই স্থানটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন