প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে হামলা, চিকিৎসাধীন রোগীকে মারধর, কর্তব্যরত আনসার সদস্যকে লাঞ্ছিত এবং সরকারি চিকিৎসা সরঞ্জাম ভাঙচুরের অভিযোগে দায়ের করা মামলাকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়ের করা এ মামলায় একপক্ষের লোকজনকে আসামি করার অভিযোগ তুলে হয়রানির দাবি করেছেন বিবাদীপক্ষের কয়েকজন। তাঁদের দাবি, মামলায় নাম থাকা কয়েকজন ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, উপস্থিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য ও ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করেই আসামিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
এ ঘটনায় দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. দেবাশীষ রায় বাদী হয়ে ২৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দিরাই থানায় লিখিত এজাহার দায়ের করেন। এতে সাকিতপুর গ্রামের জাকারিয়া (৪১), মাহিম (২৮), হারুন (৩২), মোজাহিদ (৩২), আশরাফুল (৩০), সোহেল (৩৭), মোজাম্মিল (২২) ও মোস্তাকিম (২০)সহ অজ্ঞাতনামা আরও ৬-৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ অক্টোবর বিকেল আনুমানিক ৩টা ৫৫ মিনিটে দিরাই থানার সাকিতপুর গ্রামে দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত কয়েকজন দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসেন। তাঁদের মধ্যে জাহাঙ্গীর আলম (৪০), জিবু মিয়া (২৭) ও রাফি সর্দার (১৮) ছিলেন।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, আহত জিবু মিয়ার চিকিৎসা চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সংঘবদ্ধ হয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় কর্তব্যরত আনসার সদস্য সৌরভ দাস বাধা দিলে তাঁকে ধাক্কা ও কিল-ঘুষি মেরে সরকারি দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া হয়। পরে জরুরি বিভাগে প্রবেশ করে চিকিৎসাধীন জিবু মিয়া ও তাঁর সঙ্গে থাকা লোকজনকে মারধর করা হয়।
এ ছাড়া জরুরি বিভাগে চিৎকার-চেঁচামেচি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে চিকিৎসাসেবায় বাধা দেওয়ার পাশাপাশি সরকারি চিকিৎসা সরঞ্জাম টানাহেঁচড়া করে মেঝেতে ফেলে ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয়েছে। এজাহারে একটি ইসিজি মেশিন, একটি সাকশন মেশিন, একটি ওজন মাপার যন্ত্র, দুটি রোগীর শয্যা ও একটি পানির কল ভাঙচুরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে সরকারি সম্পদের আনুমানিক ১ লাখ ৭২ হাজার ১৫০ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মামলার সাক্ষী হিসেবে হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. ওয়াসিম আকরাম, ডিএমএফ বেলায়েত হোসেন চৌধুরী সোহাগ, ওয়ার্ডবয় মো. দেলোয়ার হোসেন, ক্লিনার বিধান দেবনাথ ও আনসার সদস্য সৌরভ দাসের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এজাহারে আরও বলা হয়, সিসিটিভি ফুটেজ ও স্থানীয়দের মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও পর্যালোচনা করে অভিযুক্তদের পরিচয় সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত থাকায় অভিযোগ দায়েরে বিলম্ব হয়েছে।
অন্যদিকে বিবাদীপক্ষের কয়েকজনের দাবি, হাসপাতালের ঘটনার পর উভয় পক্ষের সংঘর্ষে হাসপাতালের মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দায়ের করা মামলায় শুধু একপক্ষের লোকজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, প্রকৃত ঘটনা যাচাই না করেই কয়েকজনকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মামলার ১ নম্বর আসামি জাকারিয়া সর্দার বলেন, “ঘটনার দিন ও সময়ে আমি দিরাইতেই ছিলাম। আমাকে অযথা হয়রানি করার জন্য আসামি করা হয়েছে।”
আরেক আসামি মাহিম সর্দার বলেন, “ঘটনার সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম না। ঘটনার দিন হাসপাতালের মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে থানায় জিডি করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মামলায় একপক্ষের লোকজনকেই আসামি করা হয়েছে।”
আসামি সুহেল সর্দারের দাবি, মামলাটি ক্ষতিপূরণের উদ্দেশ্যে নয়, বরং একটি গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিল ও হয়রানির উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। তিনি মামলাটিকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান জানান।
অন্য আসামি মোস্তাকিম মিয়া বলেন, “হাসপাতালের ঘটনার ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের একপক্ষীয় মামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।”
মামলার সাক্ষী হাসপাতালের ক্লিনার বিধান দেবনাথ বলেন, “ঘটনার শুরু থেকেই আমি উপস্থিত ছিলাম। হঠাৎ কয়েকজন জরুরি বিভাগে প্রবেশ করে একজনকে মারধর শুরু করেন। তখন দুই পক্ষের লোকজনের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। এ সময় হাসপাতালের বিভিন্ন জিনিসপত্র ভেঙে যায়। আমি কারও নাম জানি না, তবে সামনে দেখলে চিনতে পারব।”
তিনি আরও বলেন, মামলায় উল্লেখিত ১ নম্বর সাক্ষী ডা. ওয়াসিম আকরাম ঘটনার সময় জরুরি বিভাগে ছিলেন না। পরে চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে তিনি সেখানে আসেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শ্রীজীব বলেন, “মামলাটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তে যদি কোনো ব্যক্তির ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তাঁকে মামলা থেকে বাদ দেওয়া হবে। আর তদন্তে নতুন কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর নামও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।”
দিরাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমিনুল ইসলাম বলেন, “মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। কেউ অপরাধী হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর কেউ অপরাধী না হলে তদন্তের ভিত্তিতে তাঁকে মামলা থেকে বাদ দেওয়া হবে।”
মামলার বাদী ডা. দেবাশীষ রায় বলেন, “মামলার আসামিদের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। এ বিষয়ে আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানেন। ঘটনার সময় কারা উপস্থিত ছিলেন, তা আমি নিজে জানি না। উপস্থিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য ও ভিডিও দেখে আসামি দেওয়া হয়েছে। এমপি, মন্ত্রী ও আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কথায় আমি মামলা দায়ের করেছি। আসামি কারা, তাঁদের আমি চিনি না।”
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন বলেন, “দিরাইয়ের ঘটনার কথা শোনার পর আমি জিডি করার জন্য বলেছিলাম। পরবর্তী সময়ে মামলার কথাও বলেছি। তবে কাদের আসামি করা হয়েছে, সে বিষয়ে আমি জানি না। কাউকে অযথা আসামি করা হয়েছে কি না, সেটিও আমার জানা নেই। এ বিষয়ে দিরাই হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলতে পারবেন। আমি খোঁজ নিয়ে বিষয়টি দেখব।”
একদিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে হামলা, চিকিৎসাসেবায় বাধা ও সরকারি সম্পদ ভাঙচুরের অভিযোগ, অন্যদিকে মামলায় নির্দিষ্ট কয়েকজনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আসামি করার পাল্টা দাবি—দুই পক্ষের বক্তব্যে ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং ঘটনার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান যাচাই করা এখন গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার যেমন জরুরি, তেমনি নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাই সব পক্ষের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন বিবাদীপক্ষের লোকজন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন