প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায়, যখন সরকার জনগণের প্রতিবাদকে ‘রিজিম চেঞ্জ’ বা সরকার উৎখাতের প্রচেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন তা মূলত প্রকাশ্যে নিজের নিরাপত্তাহীনতা তুলে ধরে। এটি একদিকে সমালোচকদের অবস্থানকে উঁচুতে তুলে ধরে, অন্যদিকে নিজের ক্ষমতায় থাকার বিষয়টিকে একটি ‘জাতীয় বাধ্যবাধকতা’ হিসেবে মনে করে। এর ফলে জনগণের কাছ থেকে একটি স্পষ্ট গণতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া আসা স্বাভাবিক: সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনযোগ্য।
যিনি তাঁর শাসনকে ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার জন্য ঈশ্বরপ্রদত্ত বা ‘নন-বায়োলজিক্যাল’ মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করতে অভ্যস্ত, তাঁর দলের বর্তমান ভাষা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভোটাররা হয়তো নরেন্দ্র মোদীকে প্রত্যাখ্যান করে ভারতের জন্য অন্য কোনো—সম্ভবত আরও ভালো—ভবিষ্যৎ বেছে নিতে পারেন। যুক্তিসঙ্গত রাজনৈতিক ভিন্নমতকে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করে বিজেপি মূলত সরকার পরিবর্তনের সেই বাস্তব সম্ভাবনাকে অনাবৃত করে দিয়েছে, যা প্রতিটি গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি।
বিজেপি প্রতিবেশী দেশগুলোতে জেন-জি কেন্দ্রিক রাজনৈতিক পরিবর্তনে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করছে। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপাল ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক গতিপথ অনুসরণ করলেও তাদের সাধারণ মিলটি ছিল তরুণদের ক্ষোভ, যা ক্ষমতাসীনদের মুখোমুখি দাঁড়াতে সাহায্য করেছিল। মোদী সরকার 'Gen Z' শব্দটির ব্যাপারে এতটাই সংবেদনশীল যে তাদের সরকারি বিবৃতিতে এখন 'যুব সমাজ' শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মোদীর ইনস্টাগ্রাম ভিডিওগুলো ব্যাপক জনসমক্ষে উপহাসের পাত্র হওয়ার পর আচমকা বন্ধ হয়ে গেছে।
সংবাদ টিভির বিতর্ক ও সরকারি প্রেস ব্রিফিংয়ের মধ্যেই বিজেপি নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কোনো গঠনমূলক আলোচনায় তারা যাচ্ছে না। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্বাচন কমিশন বিরোধী দল, প্রাক্তন সচিব, দিল্লির প্রাক্তন লেফটেন্যান্ট গভর্নর এবং সুশীল সমাজের নেতাদের কাছে সম্পূর্ণ অপ্রাপ্য হয়ে পড়েছে। দিল্লি পুলিশ এবং আধাসামরিক বাহিনীর চরম শক্তি প্রদর্শনই এখন নাগরিক ও বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যখন প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার অবরুদ্ধ করা হয় এবং পুলিশ সরকারের একমাত্র প্রতিনিধি হয়ে ওঠে, তখন জবাবদিহিতার বিষয়টি মোদী শাসনের অবাধ ক্ষমতা প্রদর্শনের বিরুদ্ধে একটি বড় সংঘাতের দিকে মোড় নেয়।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদীর ১৩তম বছরে জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক ক্লান্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখন আর তিনি পূর্বসূরিদের ওপর দোষ চাপিয়ে বা নিজেকে 'এস্টাবলিশমেন্ট-বিরোধী' দাবি করে পার পাচ্ছেন না। দিল্লি ও মুম্বাইয়ের বিক্ষোভকারীরা ক্রমান্বয়ে শহরের প্রাণকেন্দ্র এবং ঐতিহ্যগতভাবে বিজেপির সমর্থক পরিবার ও সামাজিক গোষ্ঠীগুলো থেকে আসছে। সরকার যখন তাদের দমনপীড়নের মুখে ফেলে, তখন তা মোদীর রাজনৈতিক ভাবমূর্তির ওপর মারাত্মক আঘাত হানে।
সংসদে আসন সংখ্যা ২৪০-এ নেমে আসার পর বিজেপি এখন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
যে ৭টি কারণে উদ্বেগে মোদী সরকার:
১. নির্ভরযোগ্য বন্ধু দলগুলোর সমর্থন প্রত্যাহার
যেসব দল রাজনৈতিক সংকটে বিজেপির পাশে থাকত, তারা এখন সিইসি (প্রধান নির্বাচন কমিশনার) জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ দাবি করছে। ওয়াইএসআর কংগ্রেস এবং বিজু জনতা দলের মতো মিত্ররা এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। জগন মোহন রেড্ডি তো এমনও বলেছেন যে, ২০২৩ সালে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত বিতর্কিত বিল সমর্থন করা তাঁর ভুল ছিল। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন এবং সিইসির অপসারণ চেয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের পরিকল্পনা করছেন।
২. তীব্র অর্থনৈতিক অসন্তোষ
শিরোনামের জিডিপি প্রবৃদ্ধি জনগণের মুখে হাসি ফোটাতে পারছে না, কারণ নিরাপদ কর্মসংস্থান ও বাস্তব আয় অধরাই রয়ে গেছে। যুব সমাজ, শহর ও গ্রামাঞ্চলে চরম বেকারত্ব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং স্থবির গ্রামীণ মজুরির কারণে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কনজিউমার কনফিডেন্স ইনডেক্স মাসের পর মাস নিম্মমুখী।
এর সাথে যোগ হয়েছে বিদেশি পুঁজির রেকর্ড পরিমাণ চলে যাওয়া, টাকার মানের রেকর্ড দরপতন এবং আমেরিকার সাথে সম্পর্কে টানাপোড়েনের কারণে তরুণদের এইচ-১বি ভিসার অনিশ্চয়তা। সাধারণ মানুষের সাথে সাথে ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সরকারের অর্থনৈতিক নীতিতে চরম ক্ষুব্ধ।
৩. আমলাতন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো
চলমান গণবিক্ষোভ ভারতের আমলাতন্ত্রের হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে। আমলারা যখন বুঝতে পারেন যে সরকার পরিবর্তন হতে পারে, তখন তাঁরা ভবিষ্যতের জবাবদিহিতার ভয়ে সতর্ক হয়ে ওঠেন। জুলাই মাসে ছাত্র আন্দোলনের ('জুলাই ক্রান্তি') পর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অপসারণ আমলাতন্ত্রের ভেতর বড় ধাক্কা দিয়েছে।
এমনকি নির্বাচন কমিশনের ভেতরের মতভেদের খবর সংবাদপত্রে ফাঁস হওয়া প্রমাণ করে যে, কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত মোদী সরকারের ওপর আমলাদের সেই ভয় আর নেই।
৪. প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে জনরোষ
বিজেপি এতদিন নির্বাচন কমিশন বা বিচার বিভাগের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে আসছিল। তবে সোশ্যাল মিডিয়া, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর কারণে সাধারণ মানুষ এখন এই 'প্রতিষ্ঠান দখলের' রাজনীতি বুঝতে পারছে। শীর্ষ আদালত বা নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এখন আর সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়, বরং রাজপথের আন্দোলনের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে।
৫. ‘এমওয়াই' (মহিলা ও যুব) ভোটব্যাংক ভাঙন
বিজেপি এতদিন 'মহিলা ও যুব' (এমওয়াই) শক্তিকে তাদের নিশ্চিত ভোটব্যাংক হিসেবে দাবি করত। কিন্তু বর্তমানে দেশে জেন-জি প্রজন্মের প্রায় ৩৮ কোটি তরুণ সরকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। চাকরির পরীক্ষা স্থগিত, প্রশ্ন ফাঁস, বেকারত্ব এবং পুলিশের লাঠিচার্জের সম্মুখীন হয়ে তরুণ ও নারী সমাজ এখন মোদী সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে এসেছে।
৬. দলিত নেতা অভিজিৎ ডিপকের উদয়
কাকরোজ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ ডিপকের দলিত পরিচয় বিজেপির জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ। তিনি কেবল জাতিগত বা সামাজিক পরিচয়ের রাজনীতি করছেন না, বরং শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতাকে এক সুতোয় গেঁথে তরুণ সমাজকে একত্রিত করছেন। দলিত অধিকারের সাথে যুব সমাজের বেকারত্বকে যুক্ত করার এই সমীকরণ বিজেপির হিন্দুত্ববাদী ও নির্বাচনী কৌশলে বড় ধরনের আঘাত এনেছে।
৭. আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা দল রাজপথের শক্তি বোঝে
বিজেপি নিজেই ৮০ ও ৯০-এর দশকে রাজপথের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার শীর্ষে উঠেছিল। তাই তারা ভালো করেই জানে যে, রাজপথের জনস্রোত কীভাবে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে পারে এবং রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিতে পারে। মোদী শাসনের ১৩তম বছরে দাঁড়িয়ে আরেকটি তরুণ-নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলন দেখে দিল্লি ও নাগপুরে (আরএসএস সদর দফতর) উদ্বেগ তৈরি হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক।
যদি মোদী সরকার দমনপীড়ন বা এড়িয়ে চলার নীতি বজায় রাখে, তবে এই আন্দোলন আরও বিস্তৃত ও বেগবান হবে। ভিন্নমতকে 'সরকার উৎখাতের চক্রান্ত' বা 'রিজিম চেঞ্জ' বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা মূলত তরুণ সমাজকে তাঁদের সম্মিলিত শক্তি আবিষ্কার করতেই বেশি উৎসাহিত করছে.
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন