প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
শুক্রবার রংপুরের সর্বশেষ সিনেমা হল শাপলা টকিজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ছবিটি কালের কণ্ঠ থেকে। এই সিনেমা হলে প্রায় অর্ধশতাব্দীর ইতিহাস বিদ্যমান ছিল। এটি উত্তরাঞ্চলের দর্শকদের বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে রংপুরের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায় শেষ হলো।
দীর্ঘকাল ধরে চলা আর্থিক লোকসান, দর্শক সংকট, চলচ্চিত্র ব্যবসায় মন্দা এবং সাম্প্রতিক বিতর্কের কারণে গত শুক্রবার (৩১ জুলাই) সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সিনেমা হলটির কার্যক্রম বন্ধ করার। এর ফলে বিভাগীয় শহর রংপুরের বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত সর্বশেষ সিনেমা হলটিরও পর্দা নেমে গেল।
রবিবার (২ আগস্ট) সকালে শাপলা টকিজের ব্যবস্থাপক শাহাবুদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে লোকসান গুনতে হয়েছে। সিনেমা প্রদর্শন থেকে যে আয় হতো, তা দিয়ে হলভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। চলচ্চিত্র শিল্পকে টিকিয়ে রাখার আশায় ভর্তুকি দিয়েও শেষ পর্যন্ত আর চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।’
হল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৯৭৮ সালের ১৬ জুন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহে আলম শাপলা টকিজ উদ্বোধন করেন। একই বছর ‘বসুন্ধরা’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মধ্যে দিয়ে হলটি যাত্রা শুরু করে। আধুনিক অবকাঠামো, উন্নত শব্দ পদ্ধতি এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে এটি অল্প সময়েই উত্তরাঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় সিনেমা হলে পরিণত হয়।
রংপুর ছাড়াও লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী এবং দিনাজপুর থেকে দর্শকরা এখানে সিনেমা দেখতে আসতেন। হলের প্রতিষ্ঠাতা নজরুল ইসলাম মাসুমের পর তার ভাই মিন্টু মিয়া পরিচালনার দায়িত্ব নেন। পরে ব্যবসায় মন্দা দেখা দিলে হলটি ভাড়ায় পরিচালনার জন্য চলচ্চিত্র প্রযোজক কামাল হোসেনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তবে চলতি সালের ১৯ এপ্রিল হলটির তৃতীয় তলায় বিশেষভাবে নির্মিত একটি কক্ষে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে। পুলিশের অভিযানে সেখান থেকে ৩৭ জন আটক হওয়ার কারণে সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। এরপর থেকেই হলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছিল।
স্থানীয়রা অভিযোগ জানিয়েছেন, এরপর থেকে এলাকায় হলটি বন্ধের দাবিও জোরালো হয়েছে। গত সপ্তাহে সর্বশেষ ‘বলব কথা বাসর ঘরে’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পর হলটির ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। শুক্রবার সকালে হলের সামনে থাকা ব্যানার খুলে ফেলা হয় এবং ভেতরের আসবাব ও সরঞ্জাম অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।
হলের মালিকপক্ষের প্রতিনিধি সাইদুর রহমান সুমন বলেছেন, ‘ভাড়ায় পরিচালনার সময় হলে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে। এতে আমাদের পরিবারের মান-সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে। এই বিষয়ে রংপুর চেম্বারের নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করার পর হলটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা সোহাগ বলেছেন, ‘শাপলা টকিজ শুধু একটি সিনেমা হল নয়, এটি আমাদের বেড়ে ওঠার স্মৃতি। ঈদ বা নতুন সিনেমা মুক্তি পেলেই পরিবারের সাথে এখানে আসতাম। হলটি বন্ধ হওয়ায় রংপুরের সাংস্কৃতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হয়ে গেল।’
আরেক বাসিন্দা চন্দন বলেছেন, ‘এখনকার প্রজন্ম হয়তো আর বড় পর্দায় বসে সিনেমা দেখার আনন্দ অনুভব করতে পারবে না। সিনেমা হলের পরিবেশটাই ছিল আলাদা।’
সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, একটি সিনেমা হল বন্ধ হওয়া কেবল একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সমাপ্তি নয়; এটি একটি শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, পারিবারিক বিনোদন ও রূপালি পর্দাকেন্দ্রিক সামাজিক জীবনেরও অবসানের প্রতীক। তাই শাপলা টকিজের দরজায় ঝুলে থাকা তালা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের শেষ নয়, বরং রংপুরের ৪৮ বছরের চলচ্চিত্র ঐতিহ্যের শেষ আলোকরশ্মি নিভে যাওয়ার দুঃখজনক সাক্ষী।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুসারে, এক সময় রংপুরে মডার্ন হল, শাপলা টকিজ, দরদী, ওরিয়েন্টাল, লক্ষ্মী টকিজ, নূর মহল (আকাশ সিনেমা হল), চায়না টকিজ, সেনা হলসহ মোট ১০টি সিনেমা হল ছিল। সময়ের ব্যবধানে টেলিভিশন, স্যাটেলাইট চ্যানেল, ইন্টারনেট ও ওটিটি প্লাটফর্মের প্রসার, দর্শক সংকট এবং ধারাবাহিক লোকসানের কারণে একটি একে একে সব হল বন্ধ হয়ে যায়।
এখন শাপলা টকিজ বন্ধ হওয়ায় রংপুর সিনেমা হলশূন্য শহরে পরিণত হলো।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন