প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় কলেজছাত্র সুমন শেখ হত্যাকাণ্ডের ১২ দিন অতিবাহিত হলেও প্রধান আসামিসহ অন্যান্য আসামিদের গ্রেফতার করার ক্ষেত্রে পুলিশ সফলতা দেখাতে পারেনি। নিহতের পরিবার থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিন্তু পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করছে না; বরং মামলাটি তুলে নিতে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে হুমকি দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের লোকজনের বসতবাড়িতে হামলা হানার পর ভাঙচুর ও লুটপাটের পাল্টা অভিযোগও উঠেছে।
নিহত সুমন শেখ, যিনি ২৪ বছর বয়সী, আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের বড়ভাগ গ্রামের আলাউদ্দিন শেখের ছেলে হিসেবে পরিচিত। তিনি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী এম এ খালেক ডিগ্রি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। সুমন দুই ভাই এবং দুই বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিলেন।
জানা গেছে, পূর্ব শত্রুতার কারণে গত ২৬ জুন সন্ধ্যায় মোটরসাইকেলের মাধ্যমে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী যাওয়ার সময় বড়ভাগ গ্রামের উকিল শেখের বাড়ির সামনে সুমন হামলার শিকার হন। ওই এলাকার হোসাইন শেখ ও তার সহযোগীরা সুমনের গতিরোধ করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতেই তার মৃত্যু ঘটে।
এই ঘটনার পরদিন নিহত সুমনের বড় ভাই শামীম শেখ বাদী হয়ে হোসাইন শেখকে প্রধান আসামি করে ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ২০-২৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে আলফাডাঙ্গা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
নিহতের বোন সরজানা বেগম বলেন, ‘হত্যাকারী হোসাইন এলাকায় মাদকের ব্যবসা করতো। আমার ভাই তাকে মাদক ব্যবসায় বাধা দেয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে হোসাইন। আমার ভাইকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। মামলা দায়েরের পর এখন মোবাইলে হুমকি-ধামকি দেয়া হচ্ছে মামলা তুলে নিতে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’
ছেলের মৃত্যুর ১২ দিন পার হলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি বাবা আলাউদ্দিন শেখ এবং মা শেফালী বেগম। ছেলের ছবি হাতে নিয়ে দেখছেন এবং কান্না করছেন। কৃষক আলাউদ্দিন শেখ অভাব-অনটনের মধ্য দিয়েও সন্তানের লেখাপড়ার পেছনে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন। ছেলে সুমনও উচ্চশিক্ষা লাভ করে বাবার কষ্ট দূর করতে চেয়েছিলেন। সামনেই তার ডিগ্রি প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা ছিল এবং সে ফরম পূরণও করেছিল। কিন্তু পরীক্ষার হলের পরিবর্তে তাকে চিরনিদ্রায় যেতে হয়েছে।
নিহতের বাবা আলাউদ্দিন শেখ অভিযোগ করেন, ‘আমার ছেলেকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে হোসাইনসহ তার সহযোগীরা। ১২ দিন পার হলেও আমার ছেলের হত্যাকারীদের গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। আমি দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছি।’
মা শেফালী বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বুকের মানিককে ওরা আমার কাছ থেকে কেড়ে নিছে। আমার ছেলের হত্যাকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পুলিশ তাদের ধরছে না। আমার ছেলের কত স্বপ্ন ছিল আমাদের নিয়ে, সেই স্বপ্নগুলো কিংবা স্বপ্নই রয়ে গেল। আমার সুমন চলে গেছে ১২ দিন হলো, এখনও আসামিদের ধরতে পারেনি পুলিশ। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই।’
এদিকে আসামিপক্ষের লোকজনের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে স্বজনরা অভিযোগ করেছেন। গত কয়েক দিন ধরে ৯টি বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা।
আসামিপক্ষের প্রতিবাদে বলা হয়েছে, তাদের ৯টি বসতবাড়িতে হামলা এবং ভাঙচুর করা হয়েছে। দুর্বৃত্তরা ঘরের সব মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে। বাড়িতে থাকা নারীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। ঘরে থাকা নগদ টাকা, স্বর্ণালংকারসহ আসবাবপত্র লুট করে নেয়া হয়েছে। ভয়ের কারণে তারা বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে রয়েছেন।
আরেক গৃহবধূ বলেন, ‘মামলা হয়েছে, যদি আমার স্বজনরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রমাণিত হয়, তবে আদালত তাদের বিচার করবে। কিন্তু এভাবে বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে লুটপাট, এটা কী হচ্ছে! আমাদের সবকিছু নিয়ে গেছে। ঘরে অসুস্থ প্রবীণ সদস্য রয়েছেন, হামলার দিন তারা ভয়ে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। নারীদের গলা এবং কান থেকে স্বর্ণ ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। আমাদের কোথায় যেতে হবে, কোথায় অভিযোগ দেব?’
এদিকে, আসামিপক্ষের লোকজনের বাড়িতে ভাঙচুরের এবং লুটপাটের এই ঘটনাগুলো অস্বীকার করেছেন মামলার বাদী ও নিহত সুমনের বড় ভাই শামীম শেখ। তিনি বলেন, ‘আসামিপক্ষ নিজেরাই তাদের বসতবাড়ি ভাঙচুর করে মালামাল সরিয়ে নিয়ে আমাদের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। আমাদের কোনো লোকজন হামলা-ভাঙচুর-লুটপাটের সাথে জড়িত নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি এলাকায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে কিছু সুবিধাবাদী মানুষ থাকে যারা এ ধরনের লুটপাট করে। আসামিপক্ষের লোকজনই বসতবাড়ি ভাঙচুর করেছে এবং মালামাল লুটপাট করেছে। আমাদের কাছে এর ভিডিও প্রমাণ আছে।’
সহকারী পুলিশ সুপার (মধুখালী সার্কেল) মো. আজম খান জানান, তারা মামলাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন। আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে এজাহারনামীয় ৮ নম্বর আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভাঙচুর ও লুটপাট ঠেকাতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। যদি ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে তবে অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিরপরাধ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন