প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপের আসর ইতালিতে বসেছিল। তখন ফ্যাসিস্ট মুসোলিনি ইতালির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছিল। সেই বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়া জাতীয় দলও অংশগ্রহণ করেছিল। তাদের পরিচিতি ছিল ‘ওয়ান্ডারটিম’ হিসেবে। কোচ হুগো মেইসলের নেতৃত্বে ফুটবলে বিপ্লব ঘটানো সেই দলটি দর্শকদের সামনে অসাধারণ ফুটবল উপহার দিয়েছিল। অনেকেই সেই বছরের জুলে রিমে ট্রফির (বর্তমান বিশ্বকাপ ফুটবল) গুরুত্বপূর্ণ দাবিদার হিসেবে তাদেরকে দেখেছিল। তবে, ফ্যাসিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির ভাবনা ভিন্ন ছিল।
অনেক প্রত্যাশা নিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু হলেও সুইডিশ রেফারি ইভান একলিন্ডের বিতর্কিত রেফারিং এবং আর্জেন্টাইন-ইতালীয় ফুটবলার এনরিকো গুইতির বিতর্কিত গোলে অস্ট্রিয়ার যাত্রা থেমে যায় স্বাগতিকদের কাছে। মিলানে অনুষ্ঠিত সেই সেমিফাইনালে ইতালি ১-০ ব্যবধানে জয় লাভ করে এবং অস্ট্রিয়ার জন্য বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। সেই ম্যাচে একলিন্ড রেফারি হিসেবে যা করেছিলেন তা তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত চরিত্র হিসেবে চিত্রায়িত করেছে। অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করেন, অস্ট্রিয়ান গোলরক্ষকের ওপর ফাউল হওয়ায় গুইতার গোলটি বাতিল হওয়া উচিত ছিল। আজও অস্ট্রিয়ানরা বিশ্বাস করে, তাঁদের দলটি ট্রফি জয়ের যোগ্য ছিল এবং মুসোলিনির ‘অদৃশ্য হাত’ তাদেরকে বঞ্চিত করেছিল।
‘ওয়ান্ডারটিম’ এর সূচনা ঘটে ১৯১২ সালে, যখন সাবেক ফুটবলার হুগো মেইসল মাত্র ৩১ বছর বয়সে ইউরোপীয় দলটির ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি শুরু থেকেই দলকে এমন একটি দর্শনে দীক্ষা দেন, যেখানে বল দখল ও পাসিং-ভিত্তিক খেলাই মূল শক্তি ছিল। প্রতিপক্ষের গোলের দিকে ধীরে ধীরে আক্রমণ গড়ে তোলাই ছিল লক্ষ্য। তিনি স্কটিশ স্টাইলকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করলেন, যা পরে তার গুরু জিমি হোগান আরো উন্নত করেছিলেন। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, এটির প্রভাব পরবর্তীতে পেপ গার্দিওলার ফুটবল দর্শনের মধ্যে পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে।
মেইসলের উত্তরাধিকার এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, তাকে আধুনিক ফুটবলের পাসিং-ভিত্তিক স্টাইলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেকের মতে, ১৯৩৪ সালের সেই অস্ট্রিয়ান দলই পরবর্তীতে ১৯৭০ সালের ব্রাজিল, ১৯৭৪ সালের নেদারল্যান্ডসের ‘টোটাল ফুটবল’ এবং ২০১০ সালের স্পেনের মতো দলগুলোর জন্য পথের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের পতন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নানা পরিবর্তনের ফলস্বরূপ ১৯১৯ সালে অস্ট্রিয়া প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সেই প্রেক্ষাপটে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও ফুটবল মানুষের জন্য একটি আশ্রয়স্থল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। এই সময়ে অসাধারণ কিছু খেলোয়াড় উঠে আসে, যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন ম্যাথিয়াস সিন্ডেলার।
‘মোজার্ট অফ ফুটবল’ নামে পরিচিত সিন্ডেলার ৫ নম্বর জার্সি ও অসাধারণ খেলার জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। ১৯২৬ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর তিনি শুধু অস্ট্রিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ই হননি, বরং নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী চরিত্র হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৩৮ সালে অস্ট্রিয়া তখন ইতিমধ্যেই জার্মান শাসনের অধীনে চলে গেছে। ওই পরিস্থিতিতে, তিনি জার্মানদের হয়ে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে খেলতে অস্বীকৃতি জানান, কারণ তিনি থার্ড রাইখের নীতির প্রতি ঘোর বিরোধী ছিলেন। এর mashul তাকে নির্মমভাবে দিতে হয়েছে। প্রায় এক বছর পর, তাকে তার প্রেমিকার সঙ্গে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
আনুষ্ঠানিক ময়নাতদন্তে বলা হয়, এটি একটি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু। স্টোভ (চুলা) বিকল হয়ে কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়ায় তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে বলা হয়। তবে এই ঘটনার আশেপাশের সন্দেহ ও বিতর্ক আজও সমাধান হয়নি।
‘ওয়ান্ডারটিম’ এর বিশ্বকাপ স্বপ্নভঙ্গ:
অস্ট্রিয়া সেই টুর্নামেন্টে গিয়েছিল অসাধারণ প্রত্যাশার সঙ্গে। জার্মানির বিরুদ্ধে ৬-০ ও ৫-০, হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে ৮-২, সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৮-১, ইতালির বিরুদ্ধে ৪-০, বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ৬-১, স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৫-০; এইসব ম্যাচের বড় জয় তাদেরকে শিরোপার সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার করে তোলে এবং পুরো দেশকে উচ্ছ্বাসে ভরিয়ে দেয়।
তুরিনের বেনিতো মুসোলিনির স্টেডিয়ামে অস্ট্রিয়া প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হয় ফ্রান্সের। ম্যাচজুড়ে আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও, মেইসলের দল অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ ব্যবধানে জয় পায়। চার দিন পর কোয়ার্টার ফাইনালে তারা তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হাঙ্গেরিকে ২-১ ব্যবধানে হারানোর কৃতিত্ব দেখায়। যেখানে সিন্ডেলার তার অসাধারণ পারফর্মেন্স প্রদর্শন করেন। সেমিফাইনালে তারা মুখোমুখি হয় স্বাগতিক ইতালির, যারা এর আগে স্পেনকে হারিয়ে এসেছে।
বিতর্কিত সেমিফাইনাল: ইতালি ১-০ অস্ট্রিয়া
যদিও এর কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ নেই, তৎকালীন একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, সেমিফাইনালের সুইডিশ রেফারি ইভান একলিন্ডকে ম্যাচের আগের রাতে মুসোলিনি নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে যে ভিটোরিও পোজ্জোর ইতালি দল পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে একাধিক বিতর্কিত রেফারিং সিদ্ধান্তের সুবিধা পেয়েছিল।
সত্যিই এটি হুমকি ছিল কি না, প্রলোভন ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ম্যাচে ইতালীয়রা কর্দমাক্ত মাঠে কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং আক্রমণাত্মক খেলতে থাকে। সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় ম্যাচের ১৯তম মিনিটে। অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক পিটার প্লাটজারের ওপর ইতালীয় ফরোয়ার্ড জুসেপে মিয়াজ্জার স্পষ্ট ফাউল সুইডিশ রেফারি একলিন্ড উপেক্ষা করেন। মিয়াজ্জা গোলরক্ষকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বল ফেলে দেন, এবং সেই সুযোগে এনরিকো গুইতা একমাত্র গোলটি করেন।
এছাড়া, ম্যাচজুড়ে সিন্ডেলারকে বারবার লাথি মারার ঘটনাও ঘটে। অস্ট্রিয়ানরা আরেক আর্জেন্টাইন-ইতালীয় সেন্টার হাফ লুইস মন্টির বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট পেনাল্টির দাবি তুলেছিল। রেফারি একলিন্ড সেই ঘটনাও উপেক্ষা করেন। উল্লেখ্য, এই টুর্নামেন্টে ইতালির হয়ে খেলা মন্টি ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড় যিনি দুইটি ভিন্ন জাতীয় দলের হয়ে দুটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছেন (১৯৩০ সালে আর্জেন্টিনা, ১৯৩৪ সালে ইতালি)।
স্প্যানিশ সংবাদপত্র লা ভ্যানগার্ডিয়া দুই দলের পারফরম্যান্সের তুলনা করে লিখেছিল, ‘যেখানে ইতালীয়রা রিবাউন্ড, পাস এবং দূরত্ব ভুল করছিল (বিশেষ করে প্রথমার্ধে), অস্ট্রিয়ানরা বলকে মাটিতে পড়তে দিত না এবং সেটিকে দিয়ে যা খুশি তাই করছিল।’
অস্ট্রিয়ার ফরোয়ার্ড জোসেফ বিকান, যিনি ফুটবলের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা (৮০৫ গোল, শুধুমাত্র মেসি ও রোনালদোর পেছনে), সরাসরি রেফারিকে দোষারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা জানতাম রেফারি ঘুষ নিয়েছে এবং ইতালির পক্ষেই সিদ্ধান্ত নেবে। সে এমনকি তাদের সঙ্গে খেলছিল। আমি যখন ডানদিকে পাস দিতাম, আমার সতীর্থ জিসেক দৌড়ে যেত, তবে রেফারি বলটা আবার ইতালির হাতে দিয়ে দিত। এটা ছিল লজ্জাজনক।’
ম্যাচ শেষে অস্ট্রিয়ার কোচ মেইসল বলেন, ‘আমরা যা আশা করেছিলাম, সেটাই হয়েছে। যে পরিবেশ ইতালি তৈরি করেছিল, সেখানে তাদের হারানো অসম্ভব। আমাদের এটা মেনে নিতে হবে এবং ‘ব্লুজ’দের শিরোপা জিততে দিতে হবে। তবে এটা আমাদের বলতে বাধা দেবে না যে তাদের ফুটবলই সেরা ছিল না, এবং তারা বিশ্বকাপটা ন্যায্যভাবে জেতেনি।’
শেষ পর্যন্ত শিরোপা ইতালির দখলে যায়। এক সপ্তাহ পরে তারা চেকোস্লোভাকিয়াকে ফাইনালে ২–১ গোলে হারায়। অন্যদিকে অস্ট্রিয়াকে চতুর্থ স্থানে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। নেপলসে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে তাদের জার্মানির কাছে ৩–২ গোলে পরাজিত হতে হয়।
‘ওয়ান্ডারটিমের’-এর উত্তরাধিকার
দুই বছর পর অস্ট্রিয়া বার্লিন অলিম্পিকে রৌপ্য পদক জিতেছিল। আবারও ইতালি তাদেরকে পরাজিত করে। ১৯৩৭ সালে তাদের কোচ মেইসলের মৃত্যু ঘটে। ১৯৩৯ সালের জানুয়ারিতে তারকা খেলোয়াড় সিন্ডেলারের রহস্যজনক মৃত্যু, এবং ১৯৩৮ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে অ্যাডলফ হিটলারের শাসনে অস্ট্রিয়ার সম্পূর্ণ সংযুক্তি, সব ঘটনাই সেই স্বপ্নের দলের সমাপ্তি টেনে দেয়।
ওয়ান্ডারটিমের শেষ ম্যাচ ছিল ১৯৩৮ সালের এপ্রিল মাসে ভিয়েনায় বাভারিয়ান দলের বিরুদ্ধে, যা ছিল বিখ্যাত এক লড়াই। সবাই সেখানে নাৎসি জার্মানির সহজ জয় আশা করছিল, কিন্তু সিন্ডেলার ও তার সতীর্থরা সেই পরিকল্পনা ভেস্তে দেন। অস্ট্রিয়া ২–০ গোলে জয় পায় এবং তাদের তারকা খেলোয়াড় সিন্ডেলার গোল করার পর উদযাপন করতে গিয়ে নাৎসি সরকারের কর্মকর্তাদের দিকে এগিয়ে যান, যা পরবর্তীতে ঘটতে যাওয়া ঘটনার এক ধরনের পূর্বাভাস ছিল।
যদিও ‘ওয়ান্ডারটিম’ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, তবে সেই অস্ট্রিয়ান দলটি ফুটবল ইতিহাসে প্রথম কিংবদন্তি দলগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। ৯২ বছর পর, রালফ র্যাংনিকের আজকের দল ডালাসে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অঘটন ঘটানোর স্বপ্ন দেখছে। লক্ষ্য পূরণ হলে নিশ্চিতভাবে সেই কিংবদন্তি ‘ওয়ান্ডারটিম’কে ছোট একটি শ্রদ্ধা জানাবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন