প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বালুচরে হঠাৎ ১২টি দানব আকৃতির ‘বর্জ্যদানব’ উপস্থিত হয়েছে। কিছু দানবের শরীরে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বর্জ্য রয়েছে, আবার কিছুতে পরিত্যক্ত প্লাস্টিক ও বৈদ্যুতিক পণ্যের বর্জ্য দেখা যাচ্ছে। এই বর্জ্য দিয়ে তৈরি দানব যেন মানবজাতিকে সতর্ক করে দিচ্ছে, যে যদি সমুদ্রের মধ্যে বর্জ্য ফেলা হয় তবে একদিন সেই বর্জ্য মানুষের জীবনে ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
সমুদ্রদূষণ রোধে জনসচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে একটি ব্যতিক্রমী র্যালির আয়োজন করা হয়। এই র্যালিতে বর্জ্য দিয়ে তৈরি ১২টি দানবাকৃতির শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা হয়। এরপর সৈকতের তিন কিলোমিটার এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়।
কক্সবাজারের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক ভিড় করেন। তাদের মধ্যে অনেকেই অসচেতনভাবে সৈকতে প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ফেলে দেন। এই বর্জ্য সমুদ্রের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আয়োজকেরা বর্জ্য দিয়ে তৈরি দানবের মাধ্যমে সেই দূষণের ভয়াবহতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
সৈকতে প্রদর্শিত দানবাকৃতির শিল্পকর্মগুলোতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, পরিত্যক্ত প্লাস্টিক ও বৈদ্যুতিক পণ্যের বর্জ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এই শিল্পকর্মের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, মানুষের ফেলে দেওয়া বর্জ্য একসময় পরিবেশের জন্য দানব হয়ে উঠতে পারে।
আয়োজকদের বক্তব্য, মানুষ যদি যত্রতত্র বর্জ্য ফেলতে থাকে, তবে দূষণের এই দানব ক্রমেই বড় হয়ে উঠবে। এক পর্যায়ে তা সমুদ্র, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
সৈকতে ঘুরতে আসা পর্যটক আবদুল হালিম মন্তব্য করেন, "যদি সবাই সচেতন হন এবং সমুদ্রসৈকত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন, তবে পরিবেশদূষণ অনেকটাই কমানো সম্ভব।" তিনি আরও বলেন, "আমরা যারা এখানে ঘুরতে আসি, তাদের অনেকেই অসচেতনভাবে যত্রতত্র প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলি। অথচ বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত আমাদের অমূল্য সম্পদ। আমাদের পর্যটনশিল্পের বিকাশ ও পরিবেশের সৌন্দর্য রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। যেখানে-সেখানে প্লাস্টিক না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলা উচিত। সৈকত পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব শুধু কর্তৃপক্ষের নয়, সবার।"
কর্মসূচির আয়োজক বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন জানায়, প্লাস্টিক বর্জ্যের ভয়াবহতা তুলে ধরে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং পরিবেশ রক্ষার কাজে মানুষকে সম্পৃক্ত করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের বোর্ড সদস্য জামাল উদ্দিন বলেন, "প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে কক্সবাজারে আসেন। কিন্তু অসচেতনতার কারণে তাদের অনেকে বুঝতে পারেন না, ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকসামগ্রী সমুদ্র, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের কতটা ক্ষতি করছে।"
তিনি আরও বলেন, "পরিবেশদূষণ রোধে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা সরকারি প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর একার পক্ষে কঠিন। এই সমস্যা মোকাবিলায় জনসচেতনতা ও জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।"
জামাল উদ্দিন জানান, তাদের প্লাস্টিক এক্সচেঞ্জ স্টোরের মাধ্যমে পর্যটকদের কাছ থেকে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সংগ্রহের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা তৈরির চেষ্টা চলছে। এছাড়া সমুদ্রসৈকত থেকে সংগৃহীত বর্জ্য দিয়ে বিভিন্ন ধরনের দানবাকৃতির শিল্পকর্ম তৈরি করা হচ্ছে। ফেলে দেওয়া বর্জ্য একসময় ভয়ঙ্কর দানবে পরিণত হচ্ছে। এই দূষণ ও বর্জ্যের দানব ক্রমেই বড় হবে এবং একসময় আমাদের পৃথিবীকে গ্রাস করে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে। সেই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে কেউই রেহাই পাবেন না।
জামাল উদ্দিনের মতে, পরিবেশদূষণের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে সম্পৃক্ত করাই এই আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য। এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে সারা বছর পরিবেশদূষণ রোধে জনসচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে চাই।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, "কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত দেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। কিন্তু মানুষের অসচেতনতার কারণে এখানে প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ফেলে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি করা হচ্ছে। এখানে প্রদর্শিত বর্জ্যগুলোও সমুদ্র সৈকত থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, আমাদের অসচেতনতার কারণে কী বিপুল পরিমাণ বর্জ্য এই অপরূপ প্রাকৃতিক সম্পদকে দূষিত করছে।"
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, "জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সৈকত পরিচ্ছন্ন রাখাও সবার দায়িত্ব। জেলা প্রশাসন, বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সম্মিলিতভাবে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।"
পর্যটন মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের জন্য কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ করে দিতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের তিন কিলোমিটার এলাকায় বর্জ্য অপসারণ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়। আয়োজকেরা আশা করছেন, বর্জ্য দিয়ে তৈরি দানবের মাধ্যমে প্রদত্ত বার্তা পর্যটকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করবে এবং সৈকত পরিচ্ছন্ন রাখতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ করবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন