প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
শিল্প অধ্যুষিত এলাকা গাজীপুর ও টঙ্গীর বিভিন্ন শিল্প কারখানার বর্জ্য টঙ্গী খাল দিয়ে তুরাগ ও বালু নদীতে পড়ছে। খালের পানি কারখানা ও বাসাবাড়ির অপরিশোধিত বর্জ্য বহন করে নদীতে যাচ্ছে। এর ফলে নদী-খালপারের মানুষ দুর্বিসহ জীবনযাপন করছে।
রবিবার (৪ অক্টোবর) পর্যন্ত গত তিন দিন ধরে তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ও টঙ্গী খালপাড় এলাকা ঘুরে সেখানকার মারাত্মক দূষণ দৃশ্যমান হয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরের গাছা থেকে সৃষ্ট টঙ্গী খাল টঙ্গীর বনমালা হয়ে তুরাগ ও বালু নদে মিশেছে। খালের দুই পারের শত শত বাসিন্দা বাধ্য হয়ে দুর্বিসহ পরিবেশে বসবাস করছেন। দুর্গন্ধময় ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের কারণে সারা বছরই তারা শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিল রোগে ভুগছেন।
খালপারের বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, দুর্গন্ধময় পরিবেশের কারণে তাদের ছোটখাটো পারিবারিক অনুষ্ঠানও অন্য কোনো এলাকায় আত্মীয়ের বাড়িতে করতে হয়। খালপারের কোনো বাসায় অনেকে বেড়াতে এমনকি দরকারি কাজেও আসতে চায় না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টঙ্গীর দুই শতাধিকসহ গাজীপুরের প্রায় সাত হাজার ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য যে খাল বা নদীতেই পড়ুক না কেন, তা ঘুরে ফিরে টঙ্গী খাল এবং তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীতেই পড়ে। ফলে নদী-খালের পানি দূষণের প্রভাব এই এলাকায় বেশি।
শিল্পাঞ্চলগুলোর পানি পরীক্ষা করে অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি মাত্রায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি দেখা গেছে। সেখানকার পানি খুবই অ্যাসিডিক। একসময় যেসব জলাশয় স্থানীয় মানুষের জীবিকার উৎস ছিল, তা এখন তাদের স্বাস্থ্য ও জীবনধারণের জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিন টঙ্গী খাল পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, ময়লা-আবর্জনায় পচে পানি কুচকুচে কালো রং ধারণ করেছে।
স্থানীয়দের মতে, ১৯৯০-এর দশক থেকে গাজীপুরজুড়ে শিল্পকারখানা সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে এই পরিস্থিতি শুরু হয়েছে। বর্তমানে দিন দিন অবস্থার অবনতি হচ্ছে।
বনমালা খালপাড়ের চা বিক্রেতা ইমাম উদ্দিন (৭৫) বলেন, ‘আগে আমরা এই খালে মাছ ধরতাম। এখন মাছ নেই, বিষাক্ত গন্ধে মাছ তো মরছেই, আমরাও অসুস্থ হয়ে যাই। তাই খালে গোসলও করতে যাই না।’
শুকুন্দিবাগের সোহেল রানা (৫৬) বলেন, ‘এই খালে একসময় ধান চাষ করতাম। কিন্তু এই পানির কারণে এখন আর আবাদ করতে পারি না। বাধ্য হয়ে জমি বিক্রি করে দিয়েছি।’
খালপারের বাসিন্দারা বলছেন, দুর্গন্ধময় পরিবেশের কারণে তারা অনেকটা একাকী হয়ে যাচ্ছেন। আগের মতো আত্মীয়-স্বজনও এখন আসে না। ছোটখাটো অনুষ্ঠান অন্য জায়গায় হয়। সব ঠিকঠাক হওয়ার পর বিয়েও ভেঙে যাচ্ছে।
খালপাড়ের বাসিন্দা মতিউর রহমান বলেন, 'আমাদের এলাকায় কেউ বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে এলেও পরে অন্য কোনো বিকল্প পেলে বিয়ে ভেঙে দেয়। অনেক সময় আমরা এই দূষণের গল্প চেপে যাওয়ার চেষ্টা করি এবং চুপচাপ বিয়ের আয়োজন করি। প্রয়োজনে অন্য জায়গায় বিয়ের অনুষ্ঠান করি।
ভয়াবহ পরিবেশ দূষণে অতিষ্ঠ জীবনের এই গল্প টঙ্গী খালপারের হাজীপাড়া, টেকপাড়া, গোজারিয়ার টেক, দিলারটেক, নিমতলী, মাজুখান, বনমালা এবং নিমতলী ও হায়দরাবাদ বিলের বাসিন্দাদের।
এদিকে, দুর্গন্ধের চেয়েও ভুক্তভোগীদের কাছে বড় সংকট বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, এই দুর্গন্ধ রাসায়নিক দূষণের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। কিছু রাসায়নিক পদার্থ পানি থেকে বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসে মেশে, যা এলাকায় বসবাসকারী মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ধাতু ও টিন ক্ষয়ে যাওয়ার পেছনেও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে।
এই গবেষক বলেন, 'ওয়াশিং প্ল্যান্টগুলোতে সেখানকার লোকজন ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করেন। এতে ক্লোরিন থাকে। এছাড়া অন্যান্য রাসায়নিকের মধ্যে সালফার থাকে। এই রাসায়নিকগুলো ধাতুতে মরচে ও ক্ষয় সৃষ্টি করতে পারে।'
নদী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মনির হোসেনের মতে, এই দূষণের বড় একটি অংশ পোশাক কারখানার ওয়াশিং প্ল্যান্ট, ওষুধ কারখানা ও রাসায়নিক শিল্পের অপরিশোধিত বা অপর্যাপ্ত পরিশোধিত বর্জ্য থেকে আসছে। ওয়াশিং প্ল্যান্টগুলোতে কস্টিক সোডা, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট, সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট এবং সালফারভিত্তিক উপাদান যেমন সোডিয়াম মেটাবাইসালফাইট ব্যবহার করা হয়।
এগুলোর মাত্রা ও পরিশোধনের ধরনের ওপর নির্ভর করে রাসায়নিকগুলো বর্জ্য পানির গুণাগুণ বদলে দেয় এবং জলজ জীবন ও মানবস্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলে।
শিল্পাঞ্চলের আশপাশের এলাকা এবং তুরাগ নদীর উপরিভাগের পানি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তাতে সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, নিকেল এবং আয়রনের মাত্রা বাংলাদেশ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ডের চেয়ে অনেক বেশি। কিছু পানির নমুনায় পিএইচ-এর মাত্রা পাওয়া গেছে ২ থেকে ৪, যা এর অতিরিক্ত অ্যাসিডিক বা অম্লীয় অবস্থার কথা জানায়।
পিএইচ স্কেল ০ থেকে ১৪ পর্যন্ত হয়ে থাকে। বিশুদ্ধ পানির পিএইচ মাত্রা ৭; আর এর নিচে হলে তা অ্যাসিডিক হিসেবে ধরা হয়।
২০২৫ সালে 'সায়েন্স ডিরেক্ট'-এ প্রকাশিত 'গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের পানির ভারী ধাতুজনিত দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন' শীর্ষক গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিজবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এ এইচ এম সেলিম বলেন, গাজীপুরের কিছু স্থানে দ্রবীভূত আয়রনের পরিমাণ নিরাপদ সীমার পাঁচ গুণ, সীসা ৩০ গুণ, ক্রোমিয়াম পাঁচ গুণ এবং নিকেল ছয় গুণ পাওয়া গেছে।
গবেষণার ফলে অনুযায়ী, এই পানি ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। নিরাপদ সীমার চেয়ে অতিরিক্ত ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতির কারণে এটি প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের জন্য ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করছে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।
এসব বিষয়ে গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আরেফিন বাদল কালের কণ্ঠকে বলেন, গাজীপুর জেলায় প্রায় সাত হাজার শিল্প কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে নিবন্ধিত ৬৮৮ কারখানায় বর্জ্য পরিশোধনে ইটিপি থাকা সত্ত্বেও তারা অপরিশোধিত তরল বর্জ্য বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এসব কারখানা তদারকির দায়িত্বে থাকা পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয়ে পরিদর্শক রয়েছেন মাত্র তিনজন। পরিদর্শকসহ মোট কর্মকর্তা-কর্মচারী পাঁচজন।
উপপরিচালক বলেন, 'এখানে যদি ৫০ জন পরিদর্শকও দেওয়া হয়, তাহলেও এতগুলো শিল্পকারখানা তদারকি করা সম্ভব নয়।' তিনি বলেন, 'শুধু শিল্প কারখানাকে এককভাবে দোষ দেওয়া যায় না, কারণ জেলার বহু বাসাবাড়ির পয়োনিষ্কাশন লাইনও সরাসরি খাল ও নদীতে যুক্ত হয়েছে।'
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড মনিটরিং উইং গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, লোকবল সংকট সত্ত্বেও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন মাসের মধ্যে তুরাগ নদী দূষণের দায়ে ৪১টি প্রতিষ্ঠানকে তিন কোটি ২৪ লাখ টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত দুই কোটি ৯ লাখ টাকা আদায় করা সম্ভব হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন