প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার পাটুলী ইউনিয়নের সুটুরিয়া ফজলুল হক খান দাখিল মাদরাসায় বর্তমানে শিক্ষক রয়েছেন ১৮ জন। অথচ, ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় এ প্রতিষ্ঠান থেকে অংশ নেওয়া ১৬ জন পরীক্ষার্থী কেউই পাস করতে পারেননি। এমন ফলাফল দেখে অভিভাবক এবং স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁরা শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা এবং প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
জানা গেছে, ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মাদরাসাটি পরবর্তীতে এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে এখানে ১৮ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় ৭ জন ছাত্র ও ৯ জন ছাত্রী অংশগ্রহণ করে, তবে তাদের মধ্যে কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। শিক্ষকরা জানিয়েছেন, আগামী ২০২৭ সালের দাখিল পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেবে।
মঙ্গলবার সরেজমিনে মাদরাসায় যাওয়ার সময় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে মোট শিক্ষার্থী প্রায় ২০০ জন। কিন্তু নবম, দশম শ্রেণি ও প্রাথমিক শাখা মিলিয়ে মাত্র ২০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত রয়েছে। শিক্ষার্থী সংকটের কারণে একটি শ্রেণীকক্ষে দুই শ্রেণির পাঠদান করতে দেখা যায়। মোট ১০টি শ্রেণিকক্ষ থাকা সত্ত্বেও বেশ কয়েকটি জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কোনো কোনো কক্ষে ভাঙাচোরা টিনের স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদান না করানোর ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের এই অবস্থা চললেও কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানোর পরও কার্যকর কোনো পরিবর্তন হয়নি।
দাখিলে অকৃতকার্য শিক্ষার্থী সিয়ামের বাবা বাচ্চু মিয়া বলেন, ‘এই মাদরাসায় কোনো শিক্ষক পড়ালেখা করান না। শিক্ষকরা গল্প করেন এবং যার যার মতো চলে যান। আমার অর্থ সংকট রয়েছে। গত বছর আমার ছেলেকে পরীক্ষা দিয়েছিলাম, দুই বিষয়ে ফেল করেছিল। এবছরও ফেল করেছে। আমরা বারবার অভিযোগ করেছি, কিন্তু তাঁরা আমাদের কথা গুরুত্ব দেননি। আমরা এর পরিবর্তন চাই। প্রায় ২০ বছর ধরে মাদরাসার এই অবস্থা।’
মাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থী তৌহিদ বলেন, ‘আমি ২০০৭ সালে এই মাদরাসা থেকে পড়াশোনা শেষ করেছি। তখন প্রতিষ্ঠানটি খুব জমজমাট ছিল। বর্তমানে রেজাল্টের দিক দিয়েও খারাপ এবং ছাত্রছাত্রীও কম। প্রতি ক্লাসে একজন বা দুজন পাওয়া যায়। শিক্ষকরা বসে থাকেন এবং আড্ডা দেন। পরিচালনা শৃঙ্খলাও নেই। ১৬ জন পরীক্ষা দিয়েছে, তাদের একজনও পাস করেনি, অথচ ১৮ জন শিক্ষক রয়েছেন।’
স্থানীয় বাসিন্দা তৌফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘একটি মাদরাসায় যদি ১৬ জনের মধ্যে ১৬ জনই ফেল করে, তাহলে সেটি লজ্জাজনক ব্যাপার। শিক্ষক ১৮ জন থাকা সত্ত্বেও ১৬ জন শিক্ষার্থী কীভাবে ফেল করে? পড়াশোনার ব্যবস্থা সঠিক নয়। তাঁদের এবার শিক্ষা হওয়া উচিত।’
তবে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, পড়ালেখার অব্যবস্থাপনা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে শিক্ষকরা পাঠদান করতে সমস্যায় পড়ছেন। তাঁরা জরাজীর্ণ ভবন সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।
মাদরাসার প্রধান শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘এই ফলাফলে আমি নিজেই হতবাক। আমার বলার মতো কোনো ভাষা নেই। যারা ফেল করেছে, কী কারণে ফেল করেছে, তাদের খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমি ভিতরে কী সমস্যা রয়েছে তা দেখব। সকল শিক্ষার্থীর একসঙ্গে এই ধস নামার কথা নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি ক্লাস কীভাবে নেব, আমার তো শ্রেণিকক্ষই ঠিক নেই। ৪০ বছরের প্রতিষ্ঠানে সরকারের কোনো ছোঁয়া নেই। দুইটা রুম দিয়ে আমার নয়টি ক্লাস চলে। সামনে বছর আমি ১০০ শতাংশ পাস করব, কথা দিলাম। এ জন্য আমি সব ধরনের চেষ্টা করছি।’
বেলাবো উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম ফারুক বলেন, ‘আমরা মাদরাসায় চিঠি পাঠাব, এই অবস্থা কেন হলো। প্রতিষ্ঠান প্রধানকে এই বিপর্যয়ের কারণ এবং কিভাবে উত্তরণ করা যাবে, তা ব্যাখ্যা করতে বলা হবে। তাঁদের বক্তব্য শুনে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
শিক্ষকদের পক্ষ থেকে পড়াশোনার পরিবেশ ভালো না থাকার বিষয়টিকে ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, ‘গাছতলায় লেখাপড়া করলেও পাঁচ থেকে সাতজন পাস করবে। ভবন সংস্কারের জন্য আমি কথা বলব। কিন্তু শতভাগ ফেল করবে, তা মানা যায় না। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী বাংলা এবং ইতিহাস বিষয়ে ফেল করেছে।’
এভাবে ১৬ পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করায় মাদরাসার শিক্ষা কার্যক্রম, পাঠদানের পরিবেশ এবং শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগামী বছরে প্রতিষ্ঠানটির ফলাফল ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন