প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলা ভূমি অফিসে নাজির-কাম-ক্যাশিয়ার মো. আব্দুর রহিমকে ঘিরে ঘুষ, হয়রানি, ফাইল আটকে রাখা এবং সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অনৈতিক অর্থ দাবির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘সদু রহিম’ নামে পরিচিত বলে অভিযোগকারীদের দাবি। ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে নানা অজুহাতে হয়রানি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কাঠালিয়া উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মচারী তালিকায় ‘আঃ রহিম’ নামের একজনকে নাজির-কাম-ক্যাশিয়ার পদে দেখানো হয়েছে। একই তালিকায় তার একটি মোবাইল নম্বরও প্রকাশ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নামজারি (মিউটেশন), রেকর্ড সংশোধন, খতিয়ান-সংক্রান্ত কাজসহ ভূমি অফিসের বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে তারা নির্ধারিত সরকারি ফি দেওয়ার পরও অতিরিক্ত অর্থের দাবির মুখোমুখি হচ্ছেন। কেউ অতিরিক্ত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার ফাইলে নানা ধরনের ত্রুটি দেখিয়ে কাজ বিলম্বিত করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
‘টাকা না দিলে ফাইল আটকে থাকে’-অভিযোগ: ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কোনো সেবাগ্রহীতা নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করে সরকারি ফি পরিশোধ করলেও ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি না করে বিভিন্ন অজুহাতে দিনের পর দিন আটকে রাখা হয়। কখনো কাগজপত্রে ত্রুটি, কখনো জমি নিয়ে বিরোধ কিংবা অন্য কোনো জটিলতার কথা বলে সেবাগ্রহীতাকে ঘুরানো হয় বলে অভিযোগ। অভিযোগকারীদের দাবি, অতিরিক্ত অর্থ দিতে রাজি হলে একই ধরনের ফাইল দ্রুত এগিয়ে যায়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
দালালনির্ভর সেবা ব্যবস্থার অভিযোগ: স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, ভূমি অফিসে সরাসরি সেবা নিতে গেলে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়। এ সুযোগে কিছু মধ্যস্বত্বভোগী বা কথিত দালালের মাধ্যমে কাজ করানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দালালের মাধ্যমে গেলে কাজ দ্রুত করার আশ্বাস দেওয়া হলেও সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের চাপ নিতে হয়। তবে নাজির-কাম-ক্যাশিয়ার আব্দুর রহিমের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট দালালচক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়েও তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বেনামি অভিযোগ তৈরি করে হয়রানির অভিযোগ: অভিযোগকারীদের আরও দাবি, কোনো কোনো জমির মালিককে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে বেনামি বা ভুয়া অভিযোগ তৈরির ঘটনাও ঘটছে। পরে ওই অভিযোগ বা বিরোধ নিষ্পত্তির নামে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের অভিযোগ গুরুতর হওয়ায় সংশ্লিষ্ট নথি, অভিযোগপত্র, ফাইলের গতিবিধি এবং অফিসের কার্যক্রম যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
আগেও কাঠালিয়া ভূমি অফিস নিয়ে সংবাদ প্রকাশ: কাঠালিয়া ভূমি অফিসের কার্যক্রম নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে কাঠালিয়া উপজেলা সদর ৪ নম্বর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুষ, হয়রানি ও দালালের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে তৎকালীন পেশকার আসাদুজ্জামান শুভোসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। এরও আগে ২০২১ সালে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে কাঠালিয়া উপজেলা ভূমি অফিসের তৎকালীন নাজির মাঈনুলকে ঘিরে একটি কথিত সিন্ডিকেটের অভিযোগ এবং সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির বিষয় উঠে আসে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুমিত সাহা যোগদানের পর কথিত সিন্ডিকেট ভাঙার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অর্থাৎ, কাঠালিয়া ভূমি অফিসে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, ঘুষ ও দালালনির্ভরতার অভিযোগ নতুন নয়—তবে অতীতের প্রতিবেদনের অভিযোগ এবং বর্তমানে আব্দুর রহিমকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ একই ঘটনা বা একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগ নয়। বিষয়গুলো আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি সেবার লক্ষ্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: কাঠালিয়া উপজেলা ভূমি অফিসের সরকারি ওয়েবসাইটে অফিসটির ভিশন হিসেবে দক্ষ, স্বচ্ছ, জবাবদিহি এবং জনবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ রয়েছে। মিশনেও আধুনিক ও টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভূমি-সংক্রান্ত সেবা ও অভিযোগ জানানোর জন্য অনলাইন ব্যবস্থা রয়েছে এবং জাতীয় ভূমি সেবা হটলাইন ১৬১২২-এর কথাও কাঠালিয়া উপজেলা ভূমি অফিসের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তের দাবি: অভিযোগকারীদের দাবি, কাঠালিয়া ভূমি অফিসের গত কয়েক মাসের নামজারি, খতিয়ান সংশোধন, রেকর্ড-সংক্রান্ত ফাইলসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি যাচাই করা হলে অনিয়মের কোনো চিত্র থাকলে তা বেরিয়ে আসতে পারে। তারা ঝালকাঠির জেলা প্রশাসন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছে অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অর্থ নিয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। বর্তমানে কাঠালিয়া উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে সুমি রানী বল দায়িত্ব পালন করছেন; সরকারি কর্মকর্তা তালিকা অনুযায়ী তিনি ১৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে যোগদান করেন।
অভিযোগের বিষয়ে আব্দুর রহিমের বক্তব্য প্রয়োজন: নাজির-কাম-ক্যাশিয়ার মো. আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য জানা এবং তা প্রকাশ করা সংবাদটির ভারসাম্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সংস্করণে সংযোজন করা হবে।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগের সত্যতা না থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এতে একদিকে সাধারণ মানুষ হয়রানি থেকে সুরক্ষা পাবেন, অন্যদিকে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ থাকলেও তার নিষ্পত্তি হবে। তাই কাঠালিয়া ভূমি অফিসের কার্যক্রম, ফাইল নিষ্পত্তির সময়, সরকারি ফি আদায় এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা। চলবে.........
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন