প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভারতে বাংলাদেশি পর্যটকদের আগমন রেকর্ড পরিমাণে কমে গেছে। এর ফলে কলকাতার হাসপাতাল ও পর্যটন ব্যবসায় চরম ধস নেমেছে। কলকাতার ব্যবসায়ীদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এক সময় চিকিৎসা, কেনাকাটা কিংবা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন হাজার হাজার বাংলাদেশি কলকাতা আসতেন। দিল্লি, চেন্নাই বা বেঙ্গালুরুতেও অনেকেই ভিড় জমাতেন। কলকাতার হাসপাতাল ও মার্কেটগুলোয় বাংলাদেশিদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। কিন্তু বর্তমানে সেই পরিচিত চিত্রে নজিরবিহীন পতন ঘটেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ভারতে বাংলাদেশি পর্যটকদের আগমন প্রায় ৭৩ শতাংশ কমেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সাড়ে ১৭ লাখ বাংলাদেশি পর্যটক ভারতে এসেছিলেন। ২০২৫-২৬ সালে সেই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে ৪ লাখ ৬৬ হাজারে এসে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। গত ১৮ আগস্ট কলকাতার নিউমার্কেট থানা এলাকার ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের হোটেল ‘শিখা ইন’-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশিসহ ৯ জনের মৃত্যুর পর পর্যটকদের আগমনে ব্যাপক ধস নেমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভাবনীয় পতনের পেছনে একাধিক বড় কারণ কাজ করছে। নিরাপত্তা অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ‘শিখা ইন’-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের আতঙ্ক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি পর্যটকরা। ভিসা সংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা, দীর্ঘ অপেক্ষা, সীমিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বহু আবেদনকারীর ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ডলার সংকট এবং ভ্রমণের অতিরিক্ত ব্যয়বৃদ্ধি বহু মানুষকে বিদেশ সফর থেকে বিরত রেখেছে। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতিও একটি বড় কারণ। বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সরাসরি প্রভাব পড়েছে সীমান্ত পারাপার ও ভ্রমণ খাতে। এই পরিস্থিতির পাশাপাশি বিকল্প পর্যটন গন্তব্যের উত্থান ঘটেছে। বর্তমানে বহু বাংলাদেশি পর্যটক ভারত ভ্রমণের বিকল্প হিসেবে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা তুরস্কের মতো দেশ বেছে নিচ্ছেন। সহজ ভিসা প্রক্রিয়া এবং সাশ্রয়ী ট্যুর প্যাকেজ তাদের এই দেশগুলোর দিকে আগ্রহী করে তুলছে।
অন্যদিকে, কলকাতার হাসপাতালগুলোয় বাংলাদেশি রোগীদের নিয়ে ব্যবসা শুরু হওয়ায় অনেকেই অসন্তুষ্ট। কলকাতার মুকুন্দপুর এলাকার এক হাসপাতালে পায়ের চিকিৎসার জন্য গিয়ে ৫০-৬০ হাজার টাকার বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দেওয়া হয়। বাংলাদেশি আবু বক্কর জানান, চিকিৎসকরা তাকে ওষুধ না দিয়ে প্রথমেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার নির্দেশ দেন। তিনি জানান, প্রয়োজনে থাইল্যান্ড বা অন্য দেশে গিয়ে চিকিৎসা করাবেন, তবে ভারতে নয়। ক্ষুব্ধ হয়ে সেদিনই ঢাকায় ফিরে যান তিনি।
বাংলাদেশি পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কলকাতার হোটেল, সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, শপিং মার্কেট এবং ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর ওপর। তাদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বহু বছর ধরেই ভারতের মেডিকেল ট্যুরিজমের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল বাংলাদেশ, যেখানে প্রতি বছর হাজার হাজার রোগী চিকিৎসার জন্য আসতেন।
কলকাতা মার্কুইস স্ট্রিট ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ওয়েলফেয়ার সোসাইটির হায়দার আলী বলেন, ভিসা জটিলতার কারণে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই কলকাতায় বাংলাদেশি পর্যটক আসা ব্যাপক হারে কমেছে। এরপর ‘শিখা ইন’ হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের পর আরো ধস নামে। দুই দেশের সম্পর্ক অনেকটা স্বাভাবিক হওয়ায় বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে।
অন্যদিকে, ভারতীয়দের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র ফুটে উঠেছে। বিদেশে ছুটি কাটানোর প্রতি ভারতীয় পর্যটকদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩ কোটি ২৭ লাখেরও বেশি ভারতীয় পর্যটক বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেশি। ভারতীয়দের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালদ্বীপ ও নেপাল। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বৃদ্ধি, সহজ ভিসা পলিসি এবং বাজেট প্যাকেজের কারণে ভারতীয়দের বিদেশযাত্রায় এই উল্লম্ফন ঘটেছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যেই মেডিকেল ও ট্যুরিস্ট ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, ভিসা ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে সংস্কৃতি, চিকিৎসা ও কেনাকাটার টানে আবারও বাংলাদেশিরা ভারতে ফিরবেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন