প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রণক্ষেত্রে অস্ত্রের বিবর্তন সব সময়ই যুদ্ধক্ষেত্রকে নতুন গতি দেয়। ইউক্রেন যুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকেই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার একটি বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া তাদের নতুন প্রযুক্তির ড্রোন ‘গেরান-৫’ মাঠে নামানোর পর ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এক জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এই নতুন মডেলটি পিস্টন ইঞ্জিনের পুরনো ড্রোন এবং অত্যাধুনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যবর্তী একটি অবস্থান তৈরি করেছে, যা একই সঙ্গে দ্রুতগামী এবং নির্মাণে সাশ্রয়ী।
ইরানের নকশাকৃত ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোনকে ভিত্তি করে তৈরি হলেও গেরান সিরিজে রাশিয়া বেশ কিছু বড় ধরনের মেকানিক্যাল পরিবর্তন এনেছে। মূল পিস্টন ইঞ্জিন ও প্রপেলারের জায়গায় এখানে টার্বোজেট ইঞ্জিন যুক্ত করা হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই আপগ্রেডের ফলে ড্রোনের কার্যক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি হয়েছে। পুরনো মডেলগুলোর গতি যেখানে কম ছিল, সেখানে গেরান-৫ ঘণ্টায় প্রায় ৬০০ কিলোমিটার গতিতে উড়তে সক্ষম। এটি প্রায় ৫০০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতায় চলতে পারে, যা সাধারণ বিমান-বিধ্বংসী মেশিনগানের নাগালের বাইরে। পরিস্থিতি ভেদে এটি ৪৫০ থেকে ১০০০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত হামলা চালাতে পারে। এ ছাড়া নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মাধ্যমে উড্ডয়নরত অবস্থাতেই এই ড্রোনের দিক ও উচ্চতা পরিবর্তন করা সম্ভব।
যুদ্ধের শুরুর দিকে রাশিয়া যখন প্রপেলারচালিত ড্রোন দিয়ে হামলা চালাত, তখন ইউক্রেন মোবাইল ফায়ারিং টিম, ভারী মেশিনগান ও সাশ্রয়ী ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ব্যবহার করে প্রায় ৯০ শতাংশ হামলা প্রতিহত করতে পেরেছিল। তবে গেরান-৫-এর গতি ও উচ্চতা এই সাশ্রয়ী প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলেছে।
এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ইউক্রেনীয় ইন্টারসেপ্টরগুলোর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫০ থেকে ৩০০ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে দ্বিগুণ গতির গেরান-৫-কে ধ্বংস করতে বাধ্য হয়ে ইউক্রেনকে খরচ করতে হচ্ছে অত্যন্ত দামি ও সীমিত মজুতের ‘সারফেস-টু-এয়ার’ (ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য) ক্ষেপণাস্ত্র। এটি প্রতিরক্ষাকারী দেশের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ তৈরি করছে।
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পাশাপাশি হামলার সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়াও এই কৌশলের একটি বড় অংশ। প্রতি মাসে প্রচুর সংখ্যায় এসব জেটচালিত ড্রোন তৈরি করা হচ্ছে। এককালীন কয়েক শ ড্রোনের ঝাঁক তৈরি করে হামলা চালানো হলে, সব ড্রোন চিহ্নিত ও ধ্বংস করা প্রতিরক্ষাকারী ব্যবস্থার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এই ধরনের ধারাবাহিক হামলার মূল উদ্দেশ্য মূলত তিনটি—প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মূল্যবান ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ দ্রুত শেষ করা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাস পরিকাঠামো ও সামরিক রসদে নিরবচ্ছিন্ন আঘাত হানা এবং একই সঙ্গে সামরিক বাহিনী ও সাধারণ জনগণের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউক্রেন এবং তাদের পশ্চিমা অংশীদাররা নতুন ধরনের দ্রুতগতির ইন্টারসেপ্টর তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে শুধু আকাশ থেকে ধ্বংস করাই নয়, বিশ্লেষকদের মতে এই ড্রোনের যন্ত্রাংশ সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত করা এবং উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে আঘাত হানাই হতে পারে এই সংকটের টেকসই সমাধান।
গেরান-৫ শুধু ইউক্রেন যুদ্ধের চিত্রই বদলাচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে—ভবিষ্যতের আকাশ প্রতিরক্ষানীতি এবং স্বল্প খরচের দূরপাল্লার অস্ত্রের ব্যবহার কেমন হবে, তার একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন