প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী এই সপ্তাহের মধ্যেই ‘স্থায়ীভাবে টোলমুক্ত’ এবং ‘সম্পূর্ণ উন্মুক্ত’ হবে। কিন্তু ইরান একই সময়ে সংকেত দিয়েছে যে, প্রণালীটি অতিক্রমকারী বাণিজ্যিক ট্যাঙ্কারগুলোর কাছ থেকে নির্দিষ্ট কিছু সেবার বিনিময়ে ‘ফি’ আদায় করা হতে পারে।
এই ‘সেবা ফি’ বাণিজ্যিক নৌপরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয় ও জটিলতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হতে পারে এবং এটি এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পূর্বে ভাবেনি। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হচ্ছে। কিন্তু যদি তেহরান এই ফি নেওয়ার পদক্ষেপ বাস্তবায়িত করে, তবে এটি আন্তর্জাতিক নৌপথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি নতুন ও বিতর্কিত দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, তেহরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর উপর নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও অন্যান্য সামুদ্রিক সেবার সঙ্গে সম্পর্কিত ফি আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে।
এদিকে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, 'হরমুজ প্রণালী আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের স্বার্থ রক্ষায় আমরা কিছু নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছি।'
বাঘাই আরও বলেন, 'আমরা ট্রানজিট টোল আরোপ করতে চাই না। তবে যেসব সেবা প্রদান করা হবে, তার বিনিময়ে ফি নেয়া হবে।'
কিন্তু কী ধরনের সেবা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। তিনি জানান, এ প্রস্তাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আরও আলোচনা দরকার।
বিশ্লেষকদের মতে, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর নিজেদের প্রভাবকে অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে ইরানের এই নতুন উদ্যোগ।
আইনগতভাবে টোল ও সেবা ফি- এর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। টোল হচ্ছে কোনো পথ ব্যবহারের জন্য সরাসরি অর্থ প্রদান। আর সেবা ফি হচ্ছে বাস্তব কোনো সেবা প্রদানের বিনিময়ে নেয়া অর্থ, যেমন– ট্রানজিটের সময় বন্দরে বর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন নিয়ন্ত্রণকারী ইউনাইটেড নেশনস করভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সি (ইউএনসিএলওএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রণালীর সীমান্তবর্তী দেশগুলো শুধুমাত্র যাতায়াতের অনুমতির জন্য অর্থ দাবি করতে পারে না।
তবে পাইলটিং, টাগিং বা বন্দরসেবার মতো নির্দিষ্ট কিছু সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমিত ফি আরোপ করা যেতে পারে। তবে এসব ফি কোনো নির্দিষ্ট দেশের জাহাজের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলকভাবে চাপানো যাবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে ইরান ফি নিতে পারলেও, দীর্ঘদিন ধরে উন্মুক্ত থাকা একটি প্রাকৃতিক নৌপথ দিয়ে চলাচলের জন্য সরাসরি টোল আরোপ আইনসম্মত হবে না।
নেভাল ওয়ার কলেজের সামুদ্রিক কৌশল বিভাগের প্রধান জেমস আর হোমস নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, 'আন্তর্জাতিক আইনে কোনো উপকূলীয় রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক জলপথ দিয়ে যাতায়াতের জন্য মাশুল আদায়ের কোনো বিধান নেই, আপনি একে টোল বা ফি বা অন্য যা-ই বলুন না কেন।'
তিনি উদাহরণ হিসেবে মালাক্কা ও তাইওয়ান প্রণালীর কথা উল্লেখ করেন। তবে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, পানামা বা সুয়েজ খালের মতো কৃত্রিম নৌপথের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো নানা ধরনের অবকাঠামো ও সেবা দিয়ে থাকে, যার জন্য অর্থ নেওয়া হয়।
হোমসের মতে, 'হরমুজ একটি প্রাকৃতিক নৌপথ। আমার বিবেচনায়, ইরান যদি কোনো সেবার জন্য অর্থ নিতে চায়, তবে সেটি সম্ভবত জাহাজে হামলা না করার বিনিময়ে। কিন্তু শুধু হামলা না করাকে কোনো প্রকৃত সেবা হিসেবে গণ্য করা যায় না।'
হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ধারণাটি প্রথম সামনে আসে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর।
ইরান আঞ্চলিক জলসীমায় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়ার পর মার্চ মাসে ঘোষণা দেয় যে, প্রণালীটি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে অর্থ নেয়া হতে পারে।
পরবর্তীতে মে মাসে 'নিরাপদ যাতায়াত অনুমতিপত্র' ব্যবস্থাপনার জন্য পারস্য উপসাগরীয় প্রণালী কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়।
একই মাসে ইরান ও হরমুজ প্রণালীর অপর পাড়ের প্রতিবেশী দেশ ওমান জাহাজ চলাচলের জন্য সেবা-ভিত্তিক অর্থপ্রদানের একটি সম্ভাব্য ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা করে।
এদিকে হরমুজ প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজের ওপর সম্ভাব্য ফি আরোপের ধারণা বিশ্বনেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তারা আশঙ্কা করছেন যে, গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক রুট হয়তো আর কখনো যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরবে না।
সূত্র: এনডিটিভি
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন