প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
এবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দেশের মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের পথে হাঁটছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আসন্ন বাজেটে ভ্যাট নিবন্ধিত (বিআইএনধারী) প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা শিথিল করে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে, অর্থাৎ প্রতি তিন মাস পরপর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে। ভ্যাট প্রশাসনকে আরও সহজ, স্বচ্ছ এবং ব্যবসাবান্ধব করতে রিটার্ন দাখিল এবং অডিট কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেড) করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এ ধরনের সংস্কার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক ব্যয় ও সময় কমানোর পাশাপাশি কর ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন ব্যবস্থার আওতায় বছরে ১২ বার রিটার্ন দাখিলের পরিবর্তে মাত্র ৪ বার, অর্থাৎ প্রতি তিন মাসে একবার রিটার্ন জমা দিতে হবে। এতে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রশাসনিক ব্যয় ও সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে, ভ্যাট ব্যবস্থার আওতা সম্প্রসারণ করে আরও বেশি প্রতিষ্ঠানকে কর নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত করাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এর মাধ্যমে রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান মাসিক রিটার্ন ব্যবস্থা অনেক ছোট এবং মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি বড় চাপ। নিয়মিত হিসাব সংরক্ষণ, রিটার্ন প্রস্তুত এবং নির্ধারিত সময়ে জমা দেওয়ার কারণে অনেক উদ্যোক্তা ভ্যাট ব্যবস্থাকে জটিল মনে করেন। তিনি জানান, আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চালু করতে চাই, যাতে ব্যবসায়ীরা সহজে ভ্যাট কাঠামোর মধ্যে থাকতে পারেন এবং স্বেচ্ছায় নিবন্ধিত হতে আগ্রহী হন। তিনি জানান, বর্তমানে প্রতি মাসের কার্যক্রমের হিসাব পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে জমা দিতে হয়। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে, তিন মাসের তথ্য একসঙ্গে করে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে রিটার্ন দাখিল করা যাবে। ফলে ব্যবসা পরিচালনায় সময় ও খরচ দুটোই কমবে। এনবিআর মনে করছে, রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া যদি সহজ করা যায় তাহলে করদাতার সংখ্যা বাড়বে এবং স্বেচ্ছা প্রতিপালন (ভলান্টারি কমপ্লায়েন্স) আরও উন্নত হবে। একইসঙ্গে বর্তমানে ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে থাকা অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও নিবন্ধনের আওতায় আসতে উৎসাহিত হবে। নতুন ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভ্যাট প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন। এনবিআর সূত্র জানায়, ভবিষ্যতে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল সম্পূর্ণ অনলাইন এবং স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে। এতে ব্যবসায়ীদের আলাদা করে কাগজপত্র জমা দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান ইআরপি (এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং) সফটওয়্যারের মাধ্যমে তাদের ক্রয়-বিক্রয়, স্টক এবং হিসাব সংরক্ষণ করবে, তারা অডিটের ক্ষেত্রেও বিশেষ সুবিধা পাবে। ভ্যাট কর্মকর্তারা সরাসরি ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে অডিট সম্পন্ন করতে পারবেন। ফলে আগের মতো বিপুল পরিমাণ নথিপত্র জমা দেওয়া এবং দীর্ঘ ম্যানুয়াল অডিট প্রক্রিয়ার প্রয়োজন কমে যাবে। রাজস্ব প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থা একদিকে যেমন ব্যবসার খরচ কমাবে, অন্যদিকে কর ফাঁকি শনাক্ত এবং রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতাও বাড়াবে। এদিকে, এনবিআরের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৭ লাখ ৭৫ হাজার ভ্যাট নিবন্ধিত (বিআইএনধারী) প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পরিচালিত বিশেষ ভ্যাট নিবন্ধন অভিযানে ১ লাখ ৩১ হাজার নতুন প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হওয়ায় এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার। রাজস্ব বোর্ড আগামী অর্থবছরগুলোতে ভ্যাট নিবন্ধনের সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এজন্য করদাতা-বান্ধব এবং সহজতর ভ্যাট ব্যবস্থাপনা চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কর বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবিত ত্রৈমাসিক রিটার্ন ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা সহজীকরণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল অডিট এবং স্বয়ংক্রিয় রিটার্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে ভ্যাট প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং রাজস্ব আহরণ—তিন ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন