প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারণে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলারের জরুরি সহায়তা চেয়ে জাতিসংঘ বুধবার আবেদন করেছে।
এদিকে, এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৮০০-এরও বেশি হয়ে গেছে।
ল্যাটিন আমেরিকার ইতিহাসে এটি অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্প, যার ফলে হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।
এছাড়া, ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে আরও হাজারো মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরায় বহু পরিবার এখনও ধ্বংসস্তূপ থেকে স্বজনদের লাশ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
ভেনেজুয়েলা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানাচ্ছে।
দুর্যোগের বিষয়ে এক বৈঠকে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার বলেন, ‘অনেক দাতা দেশ ইতোমধ্যেই সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। তাদের প্রতি আমি শ্রদ্ধা ও ধন্যবাদ জানাই।’
তিনি আরও বলেন, আগামী ছয় মাসে ১৩ লাখ মানুষের জন্য জরুরি সহায়তার জন্য ২৯ কোটি ৬০ লাখ ডলারের প্রয়োজন। এই লক্ষ্যেই তহবিলের আবেদন করা হয়েছে।
এদিকে, পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের জন্য অর্থ জোগাড়ের উদ্দেশ্যে জব্দ করা রাষ্ট্রীয় সম্পদ মুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে কারাকাস।
জাতিসংঘের বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল বলেন, ‘যেসব দেশ ভেনেজুয়েলার সম্পদ আটকে রেখেছে, তাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি যাতে তারা এ সব সম্পদ দেশটির পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য ছাড় দেয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘অবৈধ নিষেধাজ্ঞার ফলস্বরূপ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ভেনেজুয়েলা রাষ্ট্রের মালিকানাধীন একাধিক হিসাব জব্দ রয়েছে।’
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেজ জানান, যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার আওতায় জব্দ থাকা ভেনেজুয়েলার প্রায় ৩০ টন স্বর্ণ ছাড়ানোর জন্য তিনি রাজা তৃতীয় চার্লসকে চিঠি দিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তিনি বলেছেন, ‘আমি ইংল্যান্ডের রাজার কাছে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যাতে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে রাখা স্বর্ণ ছাড় করা হয়। এই স্বর্ণ আমাদের জনগণের এবং ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আমাদের এই স্বর্ণের প্রয়োজন।’
ত্রাণ কার্যক্রম সহজে পরিচালনার জন্য, যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যেই চার মাসের জন্য ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত কয়েকটি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে।
২০১৯ সাল থেকে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। দেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর চিন্তাধারার সরকারকে অবৈধ বিবেচনা করে তার ওপর চাপ সৃষ্টি করাই ছিল সেই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনী মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর কারাকাসের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক উন্নতি হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন ডেলসি রড্রিগেজকে সমর্থন জানিয়েছে। পাশাপাশি, বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদ উন্নয়নের সুবিধার্থে ধীরে ধীরে নিষেধাজ্ঞাও শিথিল করেছে।
২৪ জুনের ভূমিকম্পের আগেই দীর্ঘ কয়েক দশকের অর্থনৈতিক সংকটে ভেনেজুয়েলার অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পে ৬৭০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। এটি দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ছয় শতাংশের সমান।
ভূমিকম্পের ফলে কারাকাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে এখনো বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু হয়নি।
৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুই দফা ভূমিকম্পের দুই সপ্তাহ পরে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার অভিযান প্রায় শেষ হয়ে গেছে। তবে স্বজনরা এখনও ধ্বংসস্তূপে তাদের প্রিয়জনদের লাশের খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
সরকার বুধবার মৃতের সংখ্যা হালনাগাদ করেছে এবং তা ৩ হাজার ৮১১ জনের কথা জানিয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় ১৭ হাজার মানুষ।
ভূমিকম্পের কারণে লা গুয়াইরার বহু আবাসিক ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। এতে প্রায় ১৮ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।
লা গুয়াইরার কারাবালেদা এলাকায়, বুধবার তিনটি পরিবার একটি মোড়ে বসে ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করছিল। এর আগে তারা আশেপাশে খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী খুঁজেছে।
তারা কিছু ডায়াপার, বোতলজাত পানি, টয়লেট পেপার এবং কিছু খাবার সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন।
সমুদ্র সৈকতে আগে নারকেলের মিষ্টি বিক্রি করা ২৬ বছর বয়সী স্টেফানি গারাতে জানান, ‘আমি জানি না, আর কতদিন এভাবে কাটাতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অন্তত আজ আমাদের কিছু চাল, স্প্যাগেটি এবং সারডিন দেওয়া হয়েছে।’
৩৪ বছর বয়সী হেয়ারড্রেসার জেনেসিস রামিরেজ একটি ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তার দুই ভাতিজার খোঁজ করছিলেন।
তিনি বলেন, ‘যখন এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে একটি ভবন থেকে, তখন আমি কীভাবে আশা ছেড়ে দিই? কীভাবে বিশ্বাস হারাই?’
তিনি আরও জানান, ‘তাদের লাশ না দেখা পর্যন্ত আশা হারানো যায় না।’
ওপিপি আবাসন কমপ্লেক্সে, যেখান থেকে কয়েকটি টাওয়ার পুরোপুরি ধসে পড়েছে, সেখানে প্রায় একডজন খননযন্ত্র ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালাচ্ছে।
সেখানে কিছু মানুষ এখনও তাদের স্বজনদের লাশ উদ্ধারের আশায় অপেক্ষা করছেন।
চারপাশে পচনধরা লাশের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। একটি কালো লাশ বহনের ব্যাগের পাশে দাঁড়িয়ে এক নারী কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সেখানে দায়িত্ব পালনরত একজন সেনাসদস্য বলেন, ‘এখন আমাদের সামনে শুধু লাশ উদ্ধারের কাজই বাকি।’
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন